No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    হিন্দু-মুসলমানে একত্রে মানত করে, রেঁধে-বেড়ে খায় সত্যপির-তলায়

    হিন্দু-মুসলমানে একত্রে মানত করে, রেঁধে-বেড়ে খায় সত্যপির-তলায়

    Story image

    সিঙ্গুর স্টেশন থেকে পশ্চিমে ৫ মিনিট হাঁটা পথে পড়ে বুড়িগ্রাম। কথিত, এই গ্রামে ব্রিটিশ আমলে অসহায় বৃদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া হতো। তা থেকেই নাকি গ্রামের নাম বুড়িগ্রাম। বুড়িগ্রামের শেষ প্রান্তে মাঠের মধ্যিখানে অবস্থিত সত্যপিরের মন্দির। মন্দিরকে চাইলে অবশ্য মসজিদও বলতে পারেন। বলতে পারেন মাজার।রসভঙ্গ হবে না মোটেই। স্থানীয়রা ডাকেন সত্যপির-তলা বলে।

    এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। আশি পেরনো শ্যাম দাদু বলেন, তিনি তাঁর দাদুর কাঁধে চড়ে আসতেন এই সত্যপির-তলায়। আন্দাজ করা যায়, এই মসজিদ তথা মন্দিরের বয়স কয়েকশো বছর। সত্যপিরের সঙ্গে কীভাবে যেন জড়িয়ে গেছেন সত্যনারায়ণ। সে তো আজো ঘরে-ঘরে সত্যনারায়ণের পুজোয় সিন্নি খাওয়ার চল। এই সিন্নি আসলে ‘শিরনি’। পিরও সত্য, নারয়ায়ণও সত্য। গ্রাম বাংলার মানুষদের কাছে তাই এ দু’য়ের মধ্যে কোনো বাঁধ নেই। যে নারায়ণ ভজে, সে অনায়াসে আসতে পারে পিরের কাছেও। মানত করতে পারে নির্দ্বিধায়। পির তার কাছে ঠাকুর বৈ তো নয়। এই ঠাকুরকে উপাসনা করার অধিকার হিন্দু-মুসলমানের সমান।

    এই পিরকে কেন্দ্র করেই গোটা এলাকায় তৈরি হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের অদ্ভুত ভ্রাতৃত্ববোধ। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা কিন্তু মোটে পিরকে নিজেদের সাম্প্রদায়িক সম্পত্তি বলে মনে করে না। বরং, গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহ থেকে বাঁচতে দুই ধর্মের মানুষজনই ভিড় জমায় গাছ-গাছালি দিয়ে ঘেরা সত্যপিরের বেদিতে। চলে গামছায় বাঁধা মুড়ি আর সদ্য জমি থেকে তোলা শশার ভাগাভাগি। জলপান চলে সত্যপিরের পুকুরে। আসলে এইখানে বসে বাইরের জল খাওয়া বারণ। শুধু মানুষ নয়, পড়ন্ত বিকালের দলছুট গরুর দলও জল খায় এই পুকুরটি থেকেই।

    প্রতিমাসের একটি বৃহস্পতিবার হল বাবার বার। এইদিন হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে জমা হয় সত্যপির-তলায়। কেউ পুজো করে, কেউ পড়ে নামাজ। সবাই বলে, সত্যপির কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। তাই গ্রামের কেউ চাকরি পেলেই সত্যপির তলায় চলে ভোজ। মেনু ভাত, ডাল, তরকারি, আলুভাজা পায়েস। প্রবেশ অবাধ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ধনী, দরিদ্র  নির্বিশেষে। 

    সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল ‘রেঁধে খাওয়া’ অনুষ্ঠান। ফাল্গুন মাসের একটি বৃহস্পতিবার সত্যপির-তলায় হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে মাটির উনানে রান্না করে। ভাত, বাঁধাকপির ডালনা, পায়েস, বেগুন-ভাজা আর স্পেশাল কুলের চাটনি। তখন কে যে কার রান্না করা ভাত খায় বোঝা মুশকিল। যেন ধর্মের অদৃশ্য বেড়াটাকে এক্কেবারে নাকচ করার জন্যই এই আয়োজন। কিংবদন্তী, লোকবিশ্বাস, উপাচার—সবই সমাপতিত মিলেমিশে থাকার এই ঐকান্তিক ইচ্ছেটার ভিতরে।

    আপনি হঠাৎ এই ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করলে থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকবেন ঘণ্টাখানেক। চারপাশে মেরুকরণ তীব্রতর হবে হয়তো, আমার-আপনার চেনা বাংলার সমীকরণও বদলাতে থাকবে। কিন্তু, তারপরেও বাংলার আবহমান সম্মিলনের গল্পগুলো কথা বলেই যাবে সত্যপির-তলার ছায়াঘেরা এই চাতালে। ধর্মীয় মৌলবাদ এখানে কিছুতেই থাবা বসাতে পারবে না। এত বছর ধরে হিন্দু-মুসলমানের বাস এই অঞ্চলে, অথচ একটা দাঙ্গারও খোঁজ মিলবে না। কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, সত্যপিরকে ঘিরে তৈরি হওয়া একসঙ্গে যাপনের যে ইতিহাস, মিলনের যে সংস্কৃতি—তাই যেন ঘিরে রাখবে এই অঞ্চলের মানুষকে। 

    বদলাতে থাকা বাংলায় ছায়া সুনিবিড় স্বর্গের খোঁজ যদি করতে চান কেউ, তাহলে কোনো এক বৃহস্পতিবার আসুন না সত্যপির-তলায়।  

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @