হিন্দু কলেজের ছাত্রদের সুযোগ পেলেই ভাগিয়ে নিয়ে যেত হিন্দু মেট্রোপলিটানের পড়ুয়ারা!

অবস্থা কি আজও কিছু বদলেছে? মনে হয় না। বরং যুগের নিরিখে বেশ খানিকটা পিছনেই হেঁটে চলেছি সবাই। প্রায় দুশো বছর আগের ঘটনা। হিন্দু কলেজের গৌরবময় অতীতের কথা আমরা পড়ি ঠিকই। সেখানে কিন্তু এই গল্পগুলোও একেবারেই ফেলে দেওয়ার নয়।
ঘটনাটা ১৮৫৩ সালের। ১৮২৬ সালে হিন্দু কলেজ গোলদিঘির পারে তার পাকাপাকি অবস্থান পেয়েছে। ডিরোজিওর ঢেউয়ে উত্তাল হয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণ। তারপর এই ঘটনা৷ হীরা বুলবুল নামের এক অবাঙালি বারাঙ্গনার পুত্র কলেজে ভরতি হয় শিক্ষালাভের আশায়। সাহস কত বড়ো! আর কলেজও ভরতি নিয়েছিল তাকে, এতো আরো আশ্চর্যের! যাই হোক, খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয় না। বায়ের আগে বার্তা ছোটে। ১৮৫৩-র ১১ই ফেব্রুয়ারি সংবাদ প্রভাকরের সম্পাদকীয়তে সমালোচনা বের হয় ফলাও করে “কী আক্ষেপ! যবন ও খ্রিস্টান এই দুই দোষ ছিল, এইক্ষণে বেশ্যাপুত্র আসিয়া ত্রিদোষ প্রাপ্ত করাইল....”।
হৈহৈ রৈরৈ- শুরু হয়ে যায় কলকাতা শহরের সর্বত্র। লেখালেখি থেকে মামলা-মোকদ্দমা অবধি ব্যাপার গড়াতে থাকে। মান্যগণ্য হিন্দু পরিবার, বিশেষ করে, যাদের ছেলেরা হিন্দু কলেজের ছাত্র – প্রতিবাদে আগুন হয়ে ওঠেন। জাত গেল জাত গেল। সঙ্গে বোধহয় আরো অনেক কিছুই গেল গেল। হিন্দু কলেজেরই অধ্যাপক ডি এল রিচার্ডসন আবার বেশ ধুয়ো ধরলেন এই জাত গেল-র সুরে। শেক্সপিয়ার-বিষয়ে তাঁর বিশেষ দখল ছিল। মধুসূদন দত্তের অন্যতম প্রিয় শিক্ষকও তিনি। হতেই পারে, ব্যক্তিগত কোনো ইগোর ব্যাপার। তবে ধুয়ো বেশ ভালোই দিলেন। এমনকি হিন্দু সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলেপুলে, বাপ-মাকে উসকালেন, কলেজ ছাড়ার জন্যে।
চাপ ক্রমে বাড়তে লাগল। শিক্ষাসচিব এডুকেশন কাউন্সিলের সেক্রেটারি ডক্টর ময়েটকে চিঠি লেখেন। শহরের সমস্ত হিন্দু ছেলেরা টিসি নিয়ে চলে যাচ্ছে। অনেকদিন এডুকেশন কাউন্সিল এই বিষয়ে তেমন গা করেনি। কিন্তু অবশেষে চাপে পড়ে নতিস্বীকার এবং বেশ্যাপুত্রের বিদ্যালয় থেকে নির্বাসন। এডুকেশন কাউন্সিল নাকি সেসময় জানিয়েছিল, ছাত্রের পরিচয় সম্পর্কে তারা একেবারেই অবগত ছিল না। জানা মাত্রই পত্রপাঠ বিদায়।
তবে হ্যাঁ, একটা কাজ এডুকেশন কাউন্সিল এরপর করেছিল। ছাত্রটিকে বিদায় জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা বিদায় জানিয়েছিল ডি এল রিচার্ডসনকেও। এডুকেশন কাউন্সিলের সভাপতি ছিলেন মহামান্য বেথুন। রিচার্ডসন ঘটনায় অভিভাবকদের উস্কানি দিচ্ছিলেন ক্রমাগত। এই আচরণ বেথুন মেনে নিতে পারেননি। মতান্তর আগেই ছিল। এক্ষেত্রে তা আরো গভীরভাবে দেখা দেয়। অন্যদিকে এডুকেশন কাউন্সিলের একমাত্র বাঙালি সদস্য ছিলেন রামগোপাল বাবু। তিনি বেশ্যাপুত্রের অনুপ্রবেশ নিয়ে সুর চড়াননি বলে, কাগজপত্রে তার তুলোধোনা হয় প্রায়।
কলেজ নিয়ে বিরোধিতা এভাবে তুঙ্গে পৌঁছায়। ওয়েলিংটন স্কোয়ারের বিখ্যাত দত্ত পরিবারের রাজেন্দ্র দত্ত প্রায় নেতৃত্ব দিয়ে হিন্দু কলেজ থেকে ছাত্রদের বের করে আনতে থাকেন। ১৮৫৪ সালে হিন্দু মেট্রোপলিটান কলেজ নামে একটি কলেজও স্থাপন করেন তিনি। সিঁদুরিয়াপট্টিতে গোপাল মল্লিকের বিশাল প্রাসাদে কলেজটি তৈরি হয়। ধনী হিন্দু পরিবার থেকে বিপুল সাহায্যও আসে। শোনা যায়, রানি রাসমণি একাই দিয়েছিলেন দশ হাজার টাকা। হিন্দু কলেজ থেকে বেরিয়ে এই কলেজের অধ্যক্ষ পদ গ্রহণ করেছিলেন ডি এল রিচার্ডসন।
এসময় হিন্দু কলেজ ছাত্রসংখ্যা নিয়ে খানিক সমস্যাতেই পড়ে। বিশাল পরিমাণ ছাত্র চলে যায় হিন্দু মেট্রোপলিটানে। ছাত্র আটকাতে অভিনব ব্যবস্থা নিয়েছিল হিন্দু কলেজ কর্তৃপক্ষ। ক্লাস চলাকালীন কলেজের গেটে বন্ধ থাকত, আর গেটে বসত কড়া পাহারা। সুযোগ পেলেই নাকি মেট্রোপলিটান থেকে ছাত্র এসে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের ভাগিয়ে নিত আরকি। কোনোভাবেই এই সময় ‘বহিরাগত’ প্রবেশ করতে পারত না।
পুরোনো গল্প বটে। তবে আজও যেভাবে জাতপাত, ধর্ম বা অন্যান্য পরিচয়ে কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা কোণঠাসা হয়, তাতে এই গল্প অবশ্য ‘চিরন্তন’তার তকমা পেতে পারে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়েও আমরা আমাদের পুরাতনী ভণ্ডামিগুলিকে বিদায় জানাতে পারিনি। মুখোশ পরে আর কদিনই বা চালানো যায়...!
ঋণঃ ‘রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ’- শিবনাথ শাস্ত্রী
‘অন্য কলকাতা’ - বিশ্বনাথ জোয়ারদার
ছবিসূত্রঃ উনিশ শতকের মধ্যভাগে ফ্রান্সিস ফ্রিথের তোলা প্রেসিডেন্সি কলেজের ছবি