No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    হেমন্ত, স্মৃতির অরণ্যে...

    হেমন্ত, স্মৃতির অরণ্যে...

    Story image

    আমাদের ক্লাসে দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর রমাকৃষ্ণ মৈত্র। শাঁখারিপাড়ার এক লাইব্রেরি ছিল ' কল্যাণ সঙ্ঘ'। তার সাহিত্য শাখার সম্পাদক ছিল হেমন্ত। রমা ছিল ওদের হাতে লেখা পত্রিকার সম্পাদক।

    হেমন্ত আর রমা দুজনেই লিখত গল্প।

    ক্লাস টেনে পড়ার সময় আমরা যারা টিফিনে নীচে নামতাম না, আমরা বেঞ্চিতে মুখোমুখি বসে রাজাউজির মারতাম। এক সময়ে সে আড্ডা কিভাবে যে গানের আসরে দাঁড়িয়ে গেল এখন আর ঠিক মনে পড়ে না।

    এই আসরেই হেমন্তকে গায়ক হিসেবে আমরা আবিস্কার করি।

    ও তখন ও হারমোনিয়াম বাজাতে জানত না।

    গানের চেয়ে সাহিত্যেই ছিল ওর বেশী ঝোঁক। কদিনের মধ্যেই আমাদের গানের আসর বেশ জমে উঠল। পরে তবলা বাজানোয় বেশ নাম করেছিল আমাদের আরেক সহপাঠী পরিমল সেনগুপ্ত। এই আসরে টেবিল চাপড়ে পরিমল সঙ্গত করত।

    এর ফলে, এমন বাড়াবাড়ি হয়ে যায় যে, একদিন হেডমাস্টারমশাই ছুটে আসেন এবং ঠিক সেই সময় হেমন্ত গলা ছেড়ে গান গাইছিল।
    হেডমাস্টারমশাই রেগে আগুন হয়ে হেমন্তকে ইস্কুল থেকে তাড়াবার মতলব করেন। যাই হোক, অনেক চেষ্টা করে শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিরস্ত করা হয়।

    আর বেছে বেছে ঠিক সেই দিনটাতেই আমি ইস্কুলে গরহাজির ছিলাম।

    ইস্কুলে গান গাওয়া উঠে গেল বটে। কিন্তু বন্ধুবান্ধব্দের বাড়িতে গান গাওয়ার জন্যে হেমন্তের ঘন ঘন ডাক পড়তে লাগল। আমার দাদা- কাকারা গান পাগল হওয়ায় আমাদের বাড়িটা হয়ে উঠল ওর একটা বড় ঘাঁটি।

    কিন্তু ওকে তখন একধাপ ওপরে ওঠানোর চিন্তা আমাদের মাথায় এসছে।

    ওর উচিত রেডিওতে গাওয়া।

    রেডিওতে তবলা বাজাতেন তখন কালোদা। পরে সিনেমায় যিনি অসিতবরণ হিসেবে নাম খুব নাম করেন। ওঁর বাবাকে আমি আমার মামার বাড়ির সূত্রে চিনতাম। একদিন ওঁদের বাড়িতে গিয়ে কালোদাকে ধরলাম। হেমন্তর অডিসান হবে ঠিক হল। গারস্টিন প্লেসে হেমন্তর সঙ্গে গেলাম। আমার তো ভয়ে হাঁটু কাঁপছে।

    হেমন্ত দিব্যি বীরদর্পে গটগট করে হেঁটে গান গাইতে বসে গেল।

    তার ফলাফল যে কী হল, তা নিয়ে আর আমরা পরে কোনও খোঁজখবরই নিইনি।

    গান থেকে ততদিনে হেমন্ত আবার তার সাহিত্যের রাজ্যে ফিরে গেছে।

    তখন আমাদের পরীক্ষা চলছে। খুব সম্ভবত টেস্ট পরীক্ষা। তার মধ্যে উত্তেজিত হয়ে হেমন্ত জানাল, রেডিও থেকে ও প্রোগ্রাম পেয়েছে। কিন্তু অন্যের গান গাওয়া চলবে না। গাইতে হবে নতুন গান।

    ঠিক হল, আমার দাদার কাছ থেকে ও এমন একটা ভাটিয়ালি শিখে নেবে, যেটা খুব প্রচলিত নয়। দ্বিতীয় গানের জন্যে ও একটা মতলব বার করল।

    সুর ঠিক রেখে ওর জানা একটা গানের কথাগুলো আমাকে পাল্টে দিতে হবে। পরীক্ষা চলা অবস্থাতেই আমি সে কাজ হাসিল করে ফেললাম। কথা বদলে গান হয়ে দাঁড়াল- 'আমার গানেতে এলে, চিরন্তনী।' আমার যা স্মৃতিশক্তি, তাতে দু একটা শব্দের এদিক ওদিকও হতে পারে।

    সে সময় বাড়িতে বাড়িতে রেডিও ছিল না। যেদিন রেডিওতে হেমন্তর গান গাওয়ার কথা, সেদিন সর্দার শঙ্কর রোডের এক চেনা বাড়িতে চলে গেলাম। চা- বাগানের মালিক ঘটকদের বাড়িতে।

    পাছে গান শোনা ফসকে যায়, তাই গিয়ে হাজির হয়েছি এক ঘণ্টা আগে।

    সে - বাড়িতে তখন জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন মুখচেনা এক ভদ্রলোক।

    সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল, উনি পাহাড়ী সান্যাল না হয়ে যান না।

    এতবার ছবির পর্দায় দেখেছি যে, কিছুতেই ভুল হবার নয়।

    আমি যে আমার এক বন্ধুর গান শোনার জন্যে বসে আছি, এটা নিশ্চয়ই কেউ ওঁর কানে তুলেছিল।

    হেমন্তর গান শুরু হল। আমার কী ভয়। গাইতে গাইতে যদি গলা ভেঙে যায়? যদি বেসুরো হয়? যদি কথা ভুলে যায়? কিন্তু কিচ্ছুই হচ্ছিল না। খুব সপ্রতিভভাবেই ও গান শেষ করল। আমারও ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।

    গান শেষ হতেই পাহাড়ী সান্যাল বলে উঠলেন, ‘তোমার বন্ধুটি তো দারুণ গায়, হে’।

    তারপর হেমন্তর কাছে আস্তে আস্তে শুনতে পেলাম অন্য সব বড় গায়করা, ওর গান শুনে কে কী বলেছেন। পঙ্কজ মল্লিক নাকি বলেছিলেন, ‘এ ছেলেটি তো আমাদের ভাত মারবে’। ও সেই সময় পঙ্কজ মল্লিকের গান হুবহু পঙ্কজ মল্লিকের মতো আর শচীন দেববর্মনের গান হুবহু ওঁর মতো করে গাইতে পারত। কিন্তু হেমন্তর গানে তার নিজস্ব ছাপ ফুটে উঠেছিল আরও বেশ খানিকটা পরে। তখন আর সে দু- নৌকোয় পা দিয়ে নেই  লেখা ছেড়ে গানের জগৎকেই একান্তভাবে বেছে নিয়েছে।

    (সুভাষ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘টানাপোড়েনের মাঝখানে’ গ্রন্থের ‘যখন স্কুলে পড়তাম’ অধ্যায় থেকে নির্বাচিত অংশ)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @