শতবর্ষে হেমন্ত যাপন, কালজয়ী গানে আবার বাইক ছোটাবেন উত্তম-সুচিত্রা

সে যুগে উত্তম-সুচিত্রা মানেই তাঁদের কণ্ঠে থাকবেন হেমন্ত-সন্ধ্যা জুটি৷ এই চারজন একসঙ্গে থাকাই ছিল বাংলার সিনেমার বক্সঅফিস সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে পরিচালক অজয় কর বানালেন 'সপ্তপদী' (১৯৬১)। কৃষ্ণেন্দু আর রিনার প্রেম তখন বাংলার ঘরে ঘরে ধ্বনিত হচ্ছে৷ উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেন অভিনীত এই ছবিতে সুরকার হিসেবে কাজ করেছিলেন কিংবদন্তি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ২০২০ সালে তাঁর শতবর্ষ পার করে এসেছি। তাঁকেই শ্রদ্ধা জানাতে ২৬তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হচ্ছে 'সপ্তপদী'।
আমরা জানি, শুধুমাত্র বাংলা ছবির সুরকার-গায়ক হিসেবেই নয়, রবীন্দ্রসংগীত এবং হিন্দি গানেও হেমন্তবাবুর ভূমিকার কথা৷ 'আনন্দধারা' বইয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় লিখছেন, "সারা পৃথিবীর গানের সুরকে আয়ত্ত করে নতুন সুর সৃষ্টি করলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই সুরের আলপনাকে বাংলা গানে ছিটিয়ে দিলেন। হয়ে গেল এক অপূর্ব সৃষ্টি। সর্বযুগের, সর্বকালের সৃষ্টি। এত বড়ো সুরকার আজও জন্মায়নি কোনো দেশে। এই বুড়ো পৃথিবীকে ইচ্ছে হয় জিজ্ঞাসা করি, বয়েস তো অনেক হল। রবীন্দ্রনাথের মতো এমন সর্বতোমুখী প্রতিভা আর দেখেছে একটা!"
রবীন্দ্রনাথ তাঁকে শিখিয়েছেন সংগীতের যাপন। তাই তো বক্সঅফিসে হেমন্তবাবুর গানের একের পর এক সাফল্য৷ শুধুমাত্র উত্তম-সুচিত্রা নন, হেমন্ত-সন্ধ্যারও মাইলস্টোন হয়ে থেকে যাবে সপ্তপদীর সেই কালজয়ী গান – "এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত তুমি বলো তো"। বাইকে যেতে যেতে সেই গানের মূর্চ্ছনা বাংলা চলচ্চিত্রকে প্রাণ দিয়েছিল ষাটের দশকে। আরও একটি দৃশ্য, ‘সপ্তপদী’-তে কৃষ্ণেন্দু যখন ধর্মান্তরিত হয়, আর রিনা তাকে ভুল বোঝে, আবহে ভেসে আসে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি— মিশে যায় গির্জার ‘বেল’-এর শব্দে।
‘সপ্তপদী’র সেই ঐতিহাসিক ডুয়েট গাইবার জন্যে রেকর্ডিংয়ের দিনেই সন্ধ্যাকে ডেকে নিয়েছিলেন হেমন্ত। এমনটি আগে কখনও ঘটেনি। স্টুডিও-য় গিয়ে অবাক সন্ধ্যা। সব মিউজিশিয়ান তৈরি রেকর্ডিংয়ের জন্যে। ওই ঐতিহাসিক ডুয়েটে সন্ধ্যার কণ্ঠে শুধুই ডায়ালগ। কিন্তু তারও তো প্রস্তুতি দরকার। এমনিতেই ‘টেনশন’ একটু বেশিই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের। সেই টেনশন-কে পাত্তা না দিয়ে ‘সপ্তপদী’র ঐতিহাসিক ডুয়েট রেকর্ড হয়ে গেল সেই দিনই। এই সংলাপ সুচিত্রা সেনের, না, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের, তা নিয়ে শ্রোতাদের, দর্শকদের সংশয় যেন আজও কাটেনি। আর, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’— সপ্তপদীর সেই গানের মতোই, হেমন্ত-সন্ধ্যা জুটির গভীর রসায়ন আজও শেষ হয়নি শ্রোতাদের কাছে। এই জুটি-পথ কখনও শেষ হবে না বাংলা গানে।
১৯৬১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবিটিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তরুণকুমার, ছবি বিশ্বাস প্রমুখ। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের শতবর্ষ উপলক্ষে ছবিটি বড়োপর্দায় দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি। আগামী ১৩ জানুয়ারি বুধবার বেলা ১২টা থেকে, রবীন্দ্র সদন প্রেক্ষাগৃহে।