১৮৯৭ সালে সিলেট এলাকায় ভয়াবহ ভূমিকম্প, ভেঙে গেল হাসন রাজার প্রিয় কুঁড়েঘর

সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রী পরগনার তেঘরিয়া গ্রাম। মরমিয়া কবি হাসন রাজার জন্ম এখানেই। ৭ পৌষ ১২৬১ সন। দেওয়ান আলি রাজা চৌধুরী এবং মোসাম্মৎ হুরমত জান বিবির ঘর আলোকিত করে জন্ম হয় হাসনের। হুরমত বিবি ছিলেন আলি রাজার খালাতো ভাই আমির বখ্শ চৌধুরীর নিঃসন্তান বিধবা। পরবর্তীতে হাসন রাজার পিতা আলি রাজা তাঁকে পরিণত বয়সে বিয়ে করেন। হাসন রাজা ছিলেন তাঁর দ্বিতীয় পুত্র।
হাসনের পূর্বপুরুষের অধিবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের অয্যোধ্যায়। অতঃপর তাঁরা দক্ষিণবঙ্গের যশোর জেলা হয়ে সিলেটে এসে থিতু হলেন। দাদা বীরেন্দ্রচন্দ্র সিংহদেব মতান্তরে বাবু রায় চৌধুরী সিলেটে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তার আগে পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন হিন্দু। উল্লেখ্য যে, হাসনের অনেক কবিতা ও গানে পরবর্তীতে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন পাওয়া যায়। হাসনের দাদার মৃত্যুর পর তাঁর বাবা মাতৃ এবং পিতৃবংশীয় সকল সম্পদের মালিক হন। ১৮৬৯ সালে বাবা আলি রেজার মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর বড়ো ভাই ওবায়দুর রেজা মারা যান। ভাগ্যের এমন বিড়ম্বনার স্বীকার হয়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে হাসন জমিদারীতে অভিষিক্ত হন।
হাসন ছিলেন স্বশিক্ষিত। সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান এবং পংক্তি রচনা করেছেন। এছাড়াও আরবি ও ফার্সি ভাষায় ছিল বিশেষ দক্ষতা। তখন সিলেটে ঘরে ঘরে আরবি ও ফার্সির প্রবল চর্চা চলত। হাসন যৌবনে ছিলেন ভোগবিলাসী এবং শৌখিন। প্রতি বছর, বিশেষ করে বর্ষাকালে, নৃত্য-গীতের ব্যবস্থাসহ নৌকাবিহারে চলে যেতেন এবং বেশ কিছুকাল ভোগ-বিলাসের মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে দিতেন। এই ভোগবিলাসের মাঝেও হাসন প্রচুর গান রচনা করেছেন। বাইজি নৃত্য এবং বাদ্যযন্ত্রসহ এসব গান গাওয়া হত। সেই গানের মাঝেও অন্তর্নিহিত রয়েছে নশ্বর জীবন, স্রষ্টা এবং নিজের কৃতকর্মের প্রতি অপরাধবোধের কথা। কে জানতো সেই অত্যাচারী, ভোগবিলাসী জমিদারই হবেন পরবর্তীকালের সবচেয়ে প্রজাদরদী এবং দরবেশ জমিদার!
ভালোবাসতেন পশু-পাখি। ‘কুড়া’ ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পাখি। ঘোড়াও পুষতেন। প্রিয় দুটি ঘোড়ার একটি জং বাহাদুর, আরেকটি চান্দমুশকি। এরকম আরো ৭৭টি ঘোড়ার নাম পাওয়া গেছে পরবর্তীতে। হাসন রাজার আর এক মজার শখ ছিল ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের জড়ো করে রুপোর টাকা ছড়িয়ে দেওয়া। বাচ্চারা যখন হুটোপুটি করে কুড়িয়ে নিত, তা দেখে তিনি খুব মজা পেতেন। পশু-পাখির যত্ন ও লালন পালনের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে হাসনের পশু প্রেম কতটা তীব্র।
১৮৯৭ সালের ১২ জুন আসাম এবং সিলেট এলাকায় ৮.৮ রিখটার স্কেলের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে মানুষসহ অনেক পশু-পাখি প্রাণ হারায়। হাসনের নিজের কুঁড়েঘরটিও ভেঙে যায়। পরে এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখলেন তাঁর অনেক নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছে। খাদ্যের অভাবে হাসনের প্রাণপ্রিয় অনেক পশু-পাখির মৃত্যু তাঁর মনে জীবন সম্পর্কে কঠিন বৈরাগ্যের সূচনা করে।
হাসন রাজার এই কালো অধ্যায়ের ইতি ঘটে বেশ অলৌকিক ভাবেই। লোক মুখে শোনা যায়- একদিন তিনি একটি আধ্যাত্নিক স্বপ্ন দেখলেন এবং এরপরই তিনি নিজেকে পরিবর্তন করা শুরু করলেন। বৈরাগ্যের বেশ ধারণ করলেন। জীবনযাত্রায় আনলেন বিপুল পরিবর্তন। নিয়মিত প্রজাদের খোঁজ খবর রাখা থেকে শুরু করে এলাকায় বিদ্যালয়, মসজিদ এবং আখড়া স্থাপন করলেন। সেই সঙ্গে চলতে লাগল গান রচনা।
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর রচিত ২০৬টি নিয়ে গানের একটি সংকলন প্রকাশিত হয়— ‘হাসন উদাস’। এর বাইরে আর কিছু গান ‘হাসন রাজার তিনপুরুষ’ এবং ‘আল ইসলাহ্’-সহ বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তাঁর অনেক গান এখনও সিলেট-সুনামগঞ্জের লোকের মুখে মুখে আছে এবং বহু গান বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পদ্যছন্দে রচিত হাসনের অপর গ্রন্থ ‘সৌখিন বাহার’-এর আলোচ্য বিষয় ছিল- স্ত্রীলোক, ঘোড়া ও কুড়া পাখির আকৃতি দেখে প্রকৃতি বিচার। এ পর্যন্ত পাওয়া গানের সংখ্যা ৫৫৩টি। অনেকে অনুমান করেন হাসন রাজার গানের সংখ্যা হাজারেরও বেশি।
‘হাসন বাহার’ নামে তাঁর আর একটি গ্রন্থ কিছুকাল আগে আবিষ্কৃত হয়েছে। আরও কিছু হিন্দি গানের সন্ধান পাওয়া যায়। হাসন তাঁর গানের মধ্যে গভীর জীবন দর্শন ও আত্মোপলব্ধি প্রকাশ করেছেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। যখন তিনি ভোগ বিলাস ছেড়ে দিলেন, তখনকার রচিত একটি গানের অংশবিশেষ,
“গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতের ডুরি।
হাছন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।।
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
জনেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।”
আরেকটি লেখায় দেখা যায়, হাসন গৌতম বুদ্ধের মতোই বলেন,
“স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল”
সিলেটের জিন্দাবাজারে হাসন রাজা জাদুঘর। ছবিঃ সংগৃহীত।
জাগতিক দুই চোখ দিয়ে বাস্তব জগত দেখা যায়। তৃতীয় নয়ন বা মানশ্চক্ষ দিয়ে মানুষ জীবন জগত এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে পারে। যেমনটা দেখা যায় হাসনের আরেকটি কবিতায়-
“আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে।
আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।”
হাসন মুসলিম ছিলেন, কিন্তু তাঁর গানের পূর্বপুরুষের ধর্ম, হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রেমও লক্ষণীয়। যেমন –
“আমি যাইমুরে যাইমু, আল্লার সঙ্গে,
হাসন রাজায় আল্লা বিনে কিছু নাহি মাঙ্গে”
আবার পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় –
“আমার হৃদয়েতে শ্রীহরি,
আমি কি তোর যমকে ভয় করি।
শত যমকে তেড়ে দিব, সহায় শিবশঙ্করী।”
হাসন দর্শন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯ ডিসেম্বর ১৯২৫ সালে Indian Philosophical Congress-এ বলেছিলেন, “পূর্ব বাংলার এই গ্রাম্য কবির মাঝে এমন একটি গভীর তত্ত্ব খুঁজে পাই, ব্যক্তি স্বরূপের সাথে সম্মন্ধ সূত্রে বিশ্ব সত্য।” এছাড়াও ১৯৩০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে `হিবার্ট লেকচারে` রবীন্দ্রনাথ `The Religion of Man` নামে যে বক্তৃতা দেন, তাতেও তিনি হাসন রাজার দর্শন ও সংগীতের উল্লেখ করেন।
১৯২২ সালে সুনামগঞ্জের লক্ষণশ্রীতে তাঁর মায়ের কবরের পাশেই হাসনের কবর দেওয়া হয়। আর এই কবরখানা তিনি মৃত্যুর আগেই নিজের হাতে প্রস্তুত করেছিলেন। আহা! সার্থক কবি-জীবন।
তথ্যসূত্রঃ রোরমিডিয়া (বাংলাদেশ)