‘গাল্লিবয়’—বলিউডি মেনস্ট্রিমের বিরুদ্ধে একটি বিস্ফোরণ

জ়োয়া-র দ্বিতীয় সিনেমা ‘জিন্দেগি না মিলে দোবারা’-র দর্শনকে আমার মনে হয়েছিল একধরনের পলায়নবাদ। যাবতীয় বাস্তবতা থেকে, ক্লেদ থেকে, জীবনযন্ত্রণা থেকে, দুর্নীতিগ্রস্ত ভারতীয় রাজনীতির পাওয়ার স্ট্রাকচারগুলোর থেকে মুখ ফিরিয়ে পালিয়ে-বাঁচার এক ভিন্নতর দর্শন ছিল ‘জিন্দেগি না মিলেগি দোবারা’য়। এবার ‘গাল্লিবয়’তে জ়োয়া কিন্তু ফিরে এলেন জীবনের কেন্দ্রে। মুম্বাইয়ের অচেনা-অজানা বস্তি, গলির খোপে খোপে মাথা গুঁজে থাকা মুসলিম জনজীবন-- যাঁদেরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বিধর্মী শত্রু, পাকিস্তানি সমর্থক বলে দেগে দেয়, যাঁদের ভিতর থেকে বলিউডি প্লটে কেবলই তৈরি হয়েছে মাফিয়ারাজ ও জঙ্গি, জ়োয়া সেই বস্তি-গলি থেকেই শিকড়শুদ্ধু তুলে আনেন কলেজ পড়ুয়া মুরাদকে। মুরাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার আব্বা তাকে বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে হলেও পড়াশোনা শেখায়, যাতে গলির ওই পঙ্কিল নোংরা জীবন থেকে তার ছেলের সাদা-কলারের সম্মানের জীবনে উত্তরণ ঘটে। অন্যদিকে মুরাদের ডায়রি ভরে উঠতে থাকে ব্যক্তিগত অজস্র প্রতিবন্ধকতা থেকে বস্তি-গলির জীবনছন্দে। হেডফোন কানে লাগিয়ে সে র্যাপ সং শোনে, সেই র্যাপের ভাষা আর ছন্দে সে তার বস্তি-গলির ছেঁড়া-ফাটা কুত্তার জীবন, নোংরা পঙ্কিল ভাষা, ঘাম-রক্ত ঝরানো শ্রমিকের জীবন-সংগ্রামকে ধরতে পারে।
আরো পড়ুন
মৃণালে জড়িয়ে থাকা মহাপৃথিবীর সন্ধানে
জ়োয়া-র এ গল্প কোনো ঔপন্যাসিক বা গল্পকারের থেকে রেডিমেড ধার করা কাহিনি নয়। যেন বহুবছর ধরে অলি-গলি খুঁজে, তিল-তিল করে খুঁটে-খুঁটে এ গল্পের প্লট সাজিয়েছেন তিনি। যেন এই গল্পের মুরাদরা তাঁর বহুকালের পরিচিত। বহুকাল ধরে গাড়ি পাচার আর গাঁজার কারবার করা মোরাদের সঙ্গীসাথিরা মুম্বাইয়ের অন্য অসংখ্য চেনা মুখের মতোই। এতদিন শুধু বলিউড চিনতে পারেনি তাঁদের, অথবা তাঁদের জীবন থেকে সেটুকুই নিয়েছিল বলিউড, যে-টুকু হলে মুম্বাই মাফিয়ারাজের গল্প থেকে আন্তর্জাতিক বাজার ধরা যায়। যেটুকু হলে ‘ট্রাফিক সিগন্যাল’-এ ফুটপাতবাসীদের থেকে রাজনীতির কারবারিদের লিঙ্ক করা যায়। যেটুকু হলে স্লামডগদের মধ্যে থেকে একটা মিলিওনেয়ার বার করা যায়। যেন সেই প্রতিভাবান স্লামডগদের খুঁজে বের করাটাই উচ্চবিত্ত কোটিপতিদের প্রধান কাজ।
এ-লেখা পড়তে পড়তে পাঠকের মনে পড়তে পারে আমাদের বাংলায় এমন এক গলির ছেলের রাজপথে উঠে আসার রূপকথাময় কাহিনি। মিঠুন চক্রবর্তী। আটের দশকে মিঠুনের কলকাতার গলিপথ থেকে মুম্বাইয়ের বলিউডি হিরো হয়ে ওঠার গল্প আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত দর্শকের কাছে প্রায় রূপকথাই ছিল। অবশ্য মিঠুনের উত্থান সে অর্থে সামাজিকভাবে উচ্চবিত্তের বিরুদ্ধে সাব-অলটার্ন অথবা পিছড়েবর্গের সংগ্রাম ছিল না, বরং সেটা ছিল সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবকের নায়ক হয়ে ওঠার গল্প। হয়তো সে গল্প আমাদের রিয়েল লাইফে অনেকই ঘটে থাকে, ঘটছেও। কিন্তু, রিয়াল লাইফ থেকে রিল-লাইফে তাকে রূপ দেওয়ার জন্য যে গবেষণা, যে পরিশ্রম, সর্বোপরি যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন, আমাদের সিনেমাওলাদের তা হয়তো নেই।
‘গাল্লিবয়’ সেদিক থেকে বলিউড ফিল্ডে একটা ডিজ়াস্টার। কেন না জ়োয়া-র গাল্লিবয় হয়ে ওঠে মল-বিলাসী রোমান্টিক মধ্যবিত্ত ও বার-বিলাসী উচ্চবিত্তের বিরুদ্ধে একরকম বিস্ফোরণ। র্যাপ গানের যে আদলটিকে আমরা শিকড়হীন বোহেমিয়ান মধ্যবিত্ত-যুবকদের উন্মাদ উন্মত্ততা হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত--- অডিও ও ভিজ়্যুয়াল--- দুই বিচারের, সেখানেই জ়োয়া বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন, মুরাদের গানে এনেছেন বস্তি-গলির শিকড়ের ছন্দ, প্রতিবাদের ভাষা, সংগ্রামের ভাষা। যা ছিল মধ্যবিত্ত যুবকদের শিকড়হীন উন্মত্ততার ভাষা, মুরাদের র্যাপের ভাষায় ও ছন্দে তাকেই যেন কাউন্টার-অ্যাটাক করলেন জ়োয়া।
এর আগে বাংলাদেশের রামপাল-এর একদল যুবকের কণ্ঠে সুন্দরবন বাঁচাও আন্দোলনের অঙ্গ হিসেবে সূক্ষ্ম-জাতীয়তাবাদ-সহ ‘কই সব বাঘের বাচ্চারা’ র্যাপ শুনেছি আমরা। সে গান আর ভিডিওতে ছিল প্রতিবাদের আর একরকম ভাষা। তাকে সুগঠিত সংহত প্রতিবাদ বলতে পারি, কিন্তু ‘গল্লিবয়'-এর মতো শিকড়ের, ঘাম-রক্তের প্যাশান তাতে ছিল না। অন্যদিকে ‘গাল্লিবয়’তে সেই অর্থে কোনো রাজনৈতিক অ্যাঙ্গেল নেই, ক্ষমতাতন্ত্রের মারপ্যাঁচে আমজনতার বঞ্চনার গল্প নেই। মুরাদকে পেশাদারিত্ব অর্থে বড়ো কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়নি। যেন কত সহজেই যে ঠিকঠাক মানুষগুলিকে পেয়ে যায়, যারা তাকে সহায়তা করে, তার ভিতরের আগুনটাকে উস্কে দেয়, পিছন থেকে কেউ ছুরি মারে না, ল্যাং মারে না। কিন্তু ভেবে দেখলে বোঝা যায়, রাজনীতির অঙ্ক থেকে গলির এ জীবনকে জ়োয়া ইচ্ছে করেই দূরে রেখেছেন, যাতে গল্প কোনো মতেই কেন্দ্রচ্যূত না হয়। সে গল্পের স্টোরিলাইন যে কতখানি আলাদা, অনুরাগ কশ্যপ-এর কাজ দেখলে তা বোঝা যায়। জ়োয়া সে পথে পা বাড়াননি। বরং র্যাপ স্টার হতে চাওয়া এম সি শের-এর বাড়ির একটুকরো দৃশ্য তুলে এনে জ়োয়া দেখিয়ে দেন, শের-এর মদ্যপ লুম্পেন বাবার সঙ্গে মুরাদের অশিক্ষিত অনৈতিক পিতৃতান্ত্রিক আব্বার মূলগত কোনো তফাত নেই। দুটো পরিবার আসলে একই সমতলে দাঁড়িয়ে আছে। ফলে শের এবং মুরাদের স্বপ্নও কার্যত এক। তাই তাদের বন্ধুত্বে পেশাগত সাফল্য-ব্যর্থতা কোনো ঈর্ষার বা শত্রুতার জন্ম দিতে পারে না।
এই সিনেমাকে আমি তাই নিছক একটা বলিউডি বিনোদন হিসেবে দেখতে রাজি নই। ‘গাল্লিবয়’ মেইনস্ট্রিম বলিউডি বিনোদন ফিলমের বিরুদ্ধে একটা কাউন্টার বলতে পারি। শ্রমজীবী গলি-বস্তির নোংরা পঙ্কিল জীবনের ঘাম-রক্তের ভাষায় ও ছন্দে তৈরি র্যাপ গান দিয়ে উচ্চ-মধ্যবিত্তের রোমান্টিক বোহেমিয়ানার বিরুদ্ধে এমন যে কাউন্টার-থিসিস হতে পারে, তা জ়োয়াই প্রথম দেখালেন। এবং সেটা কোনো নিম্নবিত্ত অথবা সাব-অলটার্ন হিন্দু পরিবারের কাহিনি নয়, তথাকথিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদীর চোখে নিছক বিশ্বাসঘাতক, জঙ্গি-মুজাহিদদের আঁতুড়ঘর-- মুসলমান বস্তির এক যুবকের আত্মসংগ্রামের ভিতর থেকে তুলে ধরলেন তিনি। এরই একরকম জাগরণের বার্তা এই সিনেমায় পাই। বস্তির অন্ধ কুয়ো থেকে উঠে আসা মুরাদের ভিতরকার আগুন একদিন বারুদের সংস্পর্শে জ্বলে ওঠবার অপেক্ষায় --- ‘আপনা টাইম আয়েগা’। ভারতীয় সংস্কৃতিতে সেই ঘাম-রক্ত আর আগুনের সম্ভাব্য বিস্ফোরণই হল ‘গাল্লিবয়’।
রণবীর সিং-এর অভিনয়-দক্ষতার অন্যতম বৈশিষ্ট্যই হল, তিনি নিজের যা-কিছু খামতি তাকে ঢেকে দিতে পারেন আবেগের প্রচণ্ডতা দিয়ে। এমন অনবচ্ছিন্ন তীব্র, এমন চূড়ান্ত প্যাশনেটলি অভিনয় করতে পারাটা খুব সহজ কথা নয়। ইতিহাসের রোমান্টিক ধূসর পৃষ্ঠা থেকে যেভাবে তিনি ইতিহাসের নায়ককে জীবন্ত করে তোলেন, তেমনই মুম্বাইয়ের বস্তি-গলির এক অচেনা-লাজুক ছেলে তাঁর অনায়াস অভিনয়-দক্ষতায় হয়ে ওঠে গাল্লিবয়। তিনি একবারের জন্যেও ভুলে যাননি চরিত্রটির অন্তর্মুখী লাজুক, স্বভাবত রোমান্টিক, ভীতু অথচ বেপরোয়া অন্তর্গত একরোখা রূপটিকে। যেন মনের ভিতরে জ্বলতে থাকা গনগনে আগুনের আঁচে সে পুড়িয়ে ফেলতে পারে সবকিছু। অদ্ভুত শীতলতায় সে আগুনকে সযত্নে লালন করে সে, বিস্ফোরণ ঘটাবে বলেই। তেমনি প্রতিভাশালী আলিয়া আরও একবার প্রমাণ করলেন, যে-কোনো চরিত্রে তিনি অনায়াস-স্বাচ্ছন্দ্য। স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত মুসলমান পরিবারের হাজারো বিধিনিষেধের বেড়া-ভাঙা সাফিনার চরিত্রে তিনি অনবদ্য। দুর্দান্ত সব চরিত্র-অভিনেতাদের মাঝে আর দুজনের কথা আলাদা করে বলতেই হবে, বিজয় বর্মা ও সিদ্ধান্ত চতুর্বেদী। র্যাপার এম সি শের-এর চরিত্রে সিদ্ধান্ত বলিউডের নতুন আবিষ্কার হতে পারেন। আর, মইন চরিত্রে রূপদানকারী বিজয় বর্মার শরীর থেকে যেন বস্তি-গলির আপাতনির্বোধ কিন্তু পাক্কা অপরাধীর গন্ধ বের হয়। সাউন্ড আর মিউজিকে এ ছবি বলিউডের নতুন প্রজন্মের কাছে একটা বিপ্লব। তেমনি অনবদ্য এর ক্যামেরা ও এডিটিং-এর কাজ, প্রতিটি দৃশ্য দৃশ্যান্তরের মুহূর্ত, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ডিটেলিং আলাদা করে চোখ টানে। আসলে পরিচালক জ়োয়া একা নন, আখতার-পরিবারসহ এই কাজের পিছনে আছে গোটা একটা টিম, তাঁদের চিন্তা ও মনন, বিপুল পরিশ্রম, বোঝাপড়ার দুর্দান্ত টিমওয়ার্ক।
আর উল্টোদিকে, মধ্যবিত্তের প্রেম, রোমান্টিকতা, বিদ্বেষ, ঈর্ষা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, হতাশা, বিদ্রোহ কিন্তু আসলে ক্ষমতার পায়ে আত্মসমর্পণের নিশ্চয়তা--- এর বাইরে বাংলা সিনেমা পা ফেলতে পারছে না। বলিউডকে একতরফা নকল করবার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছি আমরা। বলিউড যেন আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা ক্রমশ মেনে নিচ্ছি, আমাদের কোনো ‘গাল্লিবয়’ নেই, এসব জীবন আমাদের কাছে অলীক। যেন কলকাতার আশপাশে আমাদের কোনো গলি নেই, বস্তি নেই। গ্রাম-টাম বাদ দিন, ওসব অনেক আগেই ঝেড়ে ফেলেছি আমরা। এখন এমনকী মফস্সল বলে কোনো জীবনের অস্তিত্ব নেই আমাদের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির কাছে।