স্যারের ডাকে সাড়া দিয়ে শহুরে মাটি বীজে ভরিয়ে দিল ছাত্ররা

‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’ মেঘকে দূত করে প্রিয়ার কাছে পাঠিয়েছিল কালিদাসের কাব্যের নির্বাসিত যক্ষ। সেই সময় পৃথিবীটা অনেক সবুজ ছিল। মেঘ ভাসতে ভাসতে নিচে দেখেছিল বনের পর বন। তারপর ক্রমে সবুজের পোশাক খুলতে শুরু করল এই গ্রহ। সে কি আর নিজে খুলছে, খুলে নিচ্ছে মানুষ। বন কমতে কমতে ফুসফুস ভরে গেল ধোঁয়ায়। গ্রিন হাউস গ্যাসে ভরে উঠে পৃথিবীটা এখন যেন ফুটন্ত উনুন। গাছ নেই, ছায়া নেই, অক্সিজেন নেই। কলকাতা শহরেও হুহু করে কমছে গাছ। তারই মধ্যে একচিলতে মরূদ্যান গড়ে তোলার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন মিলে। আষাঢ়ের প্রথম দিবসেই তাঁরা একরাশ বীজ নিয়ে জড়ো হয়েছিলেন চেতলার কাছে। উদ্দেশ্য, গাছে ফের ভরিয়ে দেওয়া এই শহরকে। তারই শুরু বীজবপনে। সে যেন এক রূপকথার গল্প।
আসল গল্পের শুরুটা প্রায় দশ বছর আগে। উকিল মন্টু হাইত ঠিক করেছিলেন গাছ লাগাবেন মাঝেরহাট আর নিউ আলিপুর স্টেশনের মধ্যবর্তী ফাঁকা জমিতে। জমিটি আইনত কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের। সেখানে অন্য কেউ গাছ লাগালে সেও এক অর্থে আইন ভাঙা। মন্টু হাইত তাই ঠিক করলেন গাছ লাগাবেন গেরিলা কায়দায়। নানা জায়গা থেকে জোগাড় হল বীজ। অশোক, কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, কাঁঠাল, আম, তেঁতুল, পেয়ারা ও আরো কত কী। সেইসবই তিনি ছড়িয়ে দিলেন শুকনো জমিতে। প্রয়োজনে বুনতে লাগলেন চারাও। ধীরে ধীরে সবুজে ভরে উঠল গোটা অঞ্চল। এক কিমি জুড়ে প্রায় ২০,০০০ গাছে এ যেন এক নতুন অরণ্য। সেই গাছ-গাছালিতে বাসা বাঁধল ৬০-এরও বেশি প্রজাতির পাখি ও অন্যান্য প্রাণী। শহরের বুকে একটুকরো মরূদ্যান হয়ে উঠল এই অঞ্চল। কেউ বলতেন ‘মন্টুর বাগান’, কেউ বা বলতে লাগলেন ‘চেতলার বন’।
কিন্তু, তারপরই হঠাৎ চুপিচুপি শুরু হল গাছ কাটা। কে বা কারা গাছ কাটল, উত্তর নেই। কিন্তু এই সবুজ ফুসফুসের অনেকটাই হালকা হয়ে এল। মন্টু হাইত ঠিক করলেন, ফের বীজ বুনবেন কাটা গাছের জায়গায়। ফের ভরে তুলবেন সবুজ। তার ডাকে সাড়া দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন অনেকেই। আর সেই পাশে থাকার মধ্যেই কখন জড়িয়ে গেল এক অলীক গল্প।
বারুইপুর রোডে আমতলা থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে পীরতলা হাইস্কুল। সেখানেই শিক্ষকতা করেন পিনাকী গুহ খাসনবিশ। মন্টু হাইতের এই চেষ্টার পাশে দাঁড়াতে চাইলেন তিনিও। আর তাঁর সঙ্গী হল পীরতলা হাইস্কুলেরই ক্লাস টেনের দুই ছাত্র সরফরাজ শেখ আর মহম্মদ আকিদ হুসেন। স্যারের মুখে তারা শুনেছিল এই বন গড়ে তোলার গল্প। রমজান মাস জুড়ে যত ফল খেয়েছিল, সেই সবেরই বীজ তারা জমিয়ে রেখেছিল। আম, কাঁঠাল, লিচু ও আরো নানা ফল। সেই সব নিয়েই তারা জুড়ে গেল পিনাকী গুহ খাসনবিশের সঙ্গে। গ্রীষ্মের ছুটি চলায় বাকি ছাত্রদের খবর দিতে পারেননি পিনাকী। মাত্র দুজনকেই জানাতে পেরেছিলেন বীজবপনের খবর। সরফরাজ আর মহম্মদ আকিদ সেই ডাক শুনে সাড়া না দিয়ে পারেনি।
এরপর, বেইলি ব্রিজ সংলগ্ন পোর্টের এলাকায় মন্টু হাইত আর পিনাকী গুহ খাসনবিশের সঙ্গে মিলেই বীজবপন করে সরফরাজ আর মহম্মদ আকিদ। তারা সঙ্গে করে তো বীজ এনেছিলই, মন্টু হাইত তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন আরো নানা জাতের বীজ। মাটিতে সেইসব ছড়িয়ে দিতে দিতে তারা তখন স্বপ্ন দেখছে, সবুজে ফের ভরে যাচ্ছে কলকাতা। স্যার তাদের শিখিয়েছেন, বাঁচতে গেলে প্রকৃতিকে ফিরিয়ে দিতেই হবে তার সবুজ পোশাক। সেই টানেই তো রমজান মাস জুড়ে তারা বীজ জমিয়েছে। ধর্মাচরণের মধ্যেও মিশে গেছে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন।
ধর্মে-ধর্মে টানাপোড়েন, সাম্প্রদায়িক হানাহানির বাস্তবতায় স্যার পিনাকী গুহ খাসনবিশ আর তার দুই ছাত্র সরফরাজ-আকিদের গল্পটা অনেকটা যেন রূপকথার মতোই ঠেকে। মন্টু হাইতের কথাই বা বাদ দিই কীভাবে! কলকাতাকে সবুজে ভরিয়ে তোলার যুদ্ধ চালিয়েই যাচ্ছেন তিনি। সবুজের ভিতরে বাসা বাঁধে পাখি, কাঠবেড়ালি ও আরো কত প্রাণ। পৃথিবী তো ওদেরও। আর পিনাকী তাঁর ছাত্রদের শেখাচ্ছেন প্রকৃতিকে জড়িয়ে বাঁচার কথা। সরফরাজ-আকিদের ধর্মের পৃথিবীতেও তাই ছায়া ফেলে দাঁড়াচ্ছে গাছ। প্রকৃতিকে জড়িয়ে নেওয়ার এমন ধর্মাচরণই যেন দেখে পৃথিবী। এমন রূপকথাদেরই তো বড়ো প্রয়োজন এখন।
কলকাতার যেমন প্রয়োজন অনেক অনেক গাছের। অরণ্য তৈরি করা যায় না হয়তো, কিন্তু সবুজে ঢেকে তো দেওয়া যায় শহরের অনেকটাই। সেটাই হোক। অন্তত সেটাই।