ঐতিহ্যের গম্ভীরার মুখানাচে আজও মাতোয়ারা মালদা

“পিনহ্যা ডোরাকাটা বাঘছাল
মাথায় বইন্ধ্যাছ জটার জাল
তোমার গলার সাপটা আহ্লাদ ভ্যাপটা
বড় তামাশায় রং লাগাও ভোলা
পড়্যা দুই হুলুম মুখার তালে
ভীমরতি ধরাছ্যে কালে কালে
তুমি ভস্ম মাখা ফাকম্ ধরা
মুখেতে ভ্যাক্ ভ্যাকম্ বাজাও ভোলা।”
ঝোলানো চাঁদোয়ার নিচে রং মেখে জটাজালে আবৃত শিব দাঁড়িয়ে রয়েছে, একহাতে ত্রিশূল আর অন্যহাতে ডুগডুগি ধরে। তাকে ঘিরে লাইন দিয়ে ঘুরে চলেছে কয়েকটি ছেলের দল। যাদের মাধ্যমে শিবের উদ্দেশ্যে ধেয়ে আসছে দৈনন্দিন জীবনে মিশে থাকা ভূরি ভূরি অভিযোগ, অভাব, অনটনের অকপট বাক্যবাণ। কিছুটা ইনিয়ে-বিনিয়ে ছন্দ-মেশানো কবিয়ালি গানের ভঙ্গিমায়। একটু দূরে অর্নগল বেজে চলেছে ঢাক, কাঁসর। একপাশে পায়ে ঘুঙুর বাঁধা একটি ছেলে মাথায় পরিপাটি করে জড়ানো কাপড়ের ওপর নারসিংহী মুখোশ পড়তে ব্যস্ত। এই দৃশ্যে জনমানসে যতটা পরিচিত তার তুলনায় কি অধিক জনপ্রিয় গম্ভীরা গান? যার সরেজমিনে সমীক্ষা করতে এসে পড়া মালদা জেলায়।
পরি নৃত্য
প্রাচীন যে সকল ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য প্রচলিত রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হল আনুমানিক ১২০০-১৫০০ শতাব্দীর পালযুগের সমসাময়িক প্রাচীন লোকনৃত্য গম্ভীরা। চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর দিনপঞ্জিতেও এর উল্লেখ পাওয়া যায়। বর্তমানে মালদা জেলায় ইংরেজবাজার, চাঁচল, বামনগোলা, বাচামারি, আইহো, ভূতনি, হবিবপুর, গাজোল, মধুঘাট সহ বিভিন্ন জায়গায় গম্ভীরা লোকনৃত্যর দেখা মেলে। একইভাবে, দিনাজপুরে এই ধরনের লোকনৃত্যকে গমিরা নৃত্য বলা হয়। উভয় লোকনৃত্যই মুখোশ-সংক্রান্ত। গম্ভীরা নাচে ব্যবহৃত মুখোশগুলির অধিকাংশ তৈরি হত কাঠে (এক্ষেত্রে, মূলত গামার কাঠ ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে অন্য কাঠও এই মুখোশশিল্পে ব্যবহৃত হয়)। এছাড়া হয় পেপার পাল্পের মুখোশ। মুখোশগুলির বেশিরভাগই ধর্ম-সংক্রান্ত, যেমন- নারসিংহী (সাদা), চামুণ্ডাকালি (কালো/হলুদ/কমলা)। এছাড়া রয়েছে কিছু লোকায়ত মুখোশ, যেমন- স্বর্ণকালি (হলুদ), বুড়ো-বুড়ি, পরি, রাম-রাবণ, কার্তিক, সরস্বতী, মুনি-ঋষি, গণেশ ইত্যাদি।
আরও পড়ুন
মুখোশেই নিজের মুখ দেখে দিনাজপুর
সারা বছর ধরে এই ধরনের মুখোশগুলি মালদা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় মন্দিরে মূলত শিব বা কালি বিগ্রহের পাশে রেখেই পূজিত হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে, মুখানৃত্যশিল্পীর বাড়িতে এইধরনের মুখোশ রাখা থাকে। কিন্তু, বিশেষত গাজন উপলক্ষে, চৈত্র মাস থেকে শুরু করে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত, বিভিন্ন অঞ্চলে একটি নিদিষ্ট দিনের একটি নিদিষ্ট সময়ে এই মুখাগুলি মন্দির থেকে বার করে নিষ্ঠাভরে পুজোর পরেই মুখানাচের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।
মুখানৃত্যে শুধুমাত্র পুরুষরাই অংশগ্রহণ করেন। প্রত্যেকটি মুখানাচের ক্ষেত্রে নৃত্যশিল্পীর পোশাক, বেশভূষার মধ্যে বৈচিত্র বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়। যেমন- নারসিংহী মুখানৃত্যের সময় শিল্পী সাদা পোশাক ও পায়ে ঘুঙুর পরিধান করে। কিন্তু, বামাকালি বা স্বর্ণকালি নৃত্যের ক্ষেত্রে আবার পোশাকের তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। এখানে মূলত অলংকারে শোভিত কালো রঙের পোশাক, পায়ে ঘুঙুরের সঙ্গে পরিহিত আলতা অন্য মাত্রা যোগ করে নৃত্যে। একইভাবে, বুড়ো-বুড়ি, পরি, কার্তিক, সরস্বতী, রাম-রাবণের মতন ভিন্ন ভিন্ন মুখানাচের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত বিভিন্ন পোশাকের বৈচিত্র চোখে পড়বার মতনই। মাথায় একখণ্ড লম্বা কাপড়ের টুকরো পাগড়ির মতো শক্ত করে বেঁধে তার উপর পরা হয় প্রত্যেকটি মুখা বা মুখোশ। ঢাকের তালের ছন্দে তাল মিলিয়ে একের পর এক নৃত্য পরিবেশিত হয়। এবং প্রত্যেকটি নৃত্যের শেষে অঞ্চলের জনগণ তাদের সাধ্যমতন কিছু অর্থ প্রণামী হিসাবে এইসকল নৃত্যশিল্পীর হাতে তুলে দেন।
মালদা জেলায় গম্ভীরার মুখানাচের অন্যতম নৃত্যশিল্পীরা হলেন বাবলু দাস, সমর দাস, অমর দাস, পার্থ বসাক, চন্দন দত্ত, রমেন দাস, প্রবীর রায়, আদিত্য চৌধুরী, ষষ্ঠী দাস প্রমুখ। এঁরা সারা বছর বিভিন্ন পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কিন্তু, চৈত্র-শ্রাবণ মাসে মূলত গম্ভীরা লোকনৃত্যেকে কেন্দ্র করে কখনও বংশপরম্পরায় আবার কখনও মানতের মতোই বিশেষ কোনো কারণে এঁরা মুখানাচে অংশগ্রহণ করেন।
বামাকালি মুখানৃত্য
মালদা জেলায় বিভিন্ন অঞ্চলে রাত থেকে শুরু হয়ে পরের দিন ভোর অবধি চলে এই মুখানৃত্যের মহড়া। তবে, বামনগোলার বেশ কিছু ব্লকে এবং বাচামারিতে সকাল থেকেই এই লোকনৃত্যে শুরু হয়। কোনো কোনো অঞ্চলে গম্ভীরা মুখানৃত্যেকে কেন্দ্র করে সিঁদুরখেলা, হরিলুটের প্রচলনও রয়েছে।
গম্ভীরা বা গমিরা উভয় শব্দের উৎপওি নিয়ে মতাভেদ রয়েছে। অনেকে মনে করেন গামার কাঠ থেকে এই ধরনের মুখোশ তৈরি হত বলে একে গম্ভীরা বলা হয়। আবার অনেকের মত-- গম্ভীরা শব্দটির উৎপত্তি গম্ভীর থেকে, যার মূলে রয়েছেন স্বয়ং গম্ভীর (শিব)। আগে সাতদিন ধরে এই ধরনের মুখোশ-নৃত্য আয়োজিত হলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে চারদিনে। মালদা জেলায় ঘটভরা (ঘট প্রতিষ্ঠা), ছোটো ও বড়ো তামাশা হিসাবে বোলবাই নাচ (চারজন মিলে শিবের উদ্দেশ্যে যে গান করে, যাকে গম্ভীরা গানও বলা হয়), কাঁটাফোড়া, ঢেঁকিচোবানো ইত্যাদি লোকাচার অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে গম্ভীরা নৃত্য পালিত হয়।
বোলবাই নৃত্য
অঞ্চলভেদে মালদা জেলার ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় এই গম্ভীরা নাচের সময় বিপুল সংখ্যক আঞ্চলিক লোকের সমাগম সারাদিন-সারারাত ধরেই দেখতে পাওয়া যায়। এই লোকনৃত্য এখনও কতখানি শিকড়ে গাঁথা তার প্রমাণ মেলে এখান থেকেই।
জনপ্রিয়তার পাশাপাশি অবশ্য আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যান্য অনেক লোকনৃত্য বা লোকাচারের এর মতনই গম্ভীরাও আজ মুষ্ঠিমেয় কিছু লোকশিল্পী, কারিগর, লোকনৃত্যশিল্পীর ওপরই নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে, এই ঐতিহ্য মাখানো লোকশিল্পটি কতখানি বেঁচে থাকবে তার চাবিকাঠি নবীনপ্রজন্ম ও লোকশিল্পের গবেষকের হাতেই।
তথ্য-সহায়তা: সৌম্য সেনগুপ্ত, শ্রেয় সেনগুপ্ত।
ছবি: লেখক