গোমিরা – অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির আহ্বান

গোমিরা নৃত্য। আঞ্চলিক ভাষায় ‘মুখা খেল’। পশ্চিমবাংলার দিনাজপুরের একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে আর শুভ শক্তিকে আহ্বান জানাতে দেবতাদের তুষ্ট করার জন্য গ্রামবাসীরা এই নৃত্য পরিবেশন করেন। দেব-দেবীদের থেকে চাওয়ার থাকে ‘যা কিছু ভালো’। বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম একটি অঙ্গ এই গোমিরা।
গোমিরা আসলে মুখোশের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়। গ্রামীণ দেবী চণ্ডীর আরাধনায় স্থানীয় রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মানুষ মুখোশ পরে এই নাচ করেন। রঙে, ভাস্কর্যে, শৈল্পিক গুণে আফ্রিকার প্রাচীন মুখোশকে মনে করায় কাঠের তৈরি এই মুখোশ বা মুখা। তবে এই নাচের উৎস কীভাবে হয়েছে, তা সঠিকভাবে জানা যায় না। গ্রামের বিভিন্ন মানুষের ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে।
আরও পড়ুন: শহরের বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া কিছু মুখের কথা
এপ্রিল থেকে জুলাই, বাংলার বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে বিভিন্ন উৎসবের মধ্যে দিয়ে পরিবেশিত হয় গোমিরা নাচ। এই সময় গ্রামে গ্রামে নতুন ফসলের মরশুম। গোমিরার দুটি রূপ রয়েছে – গোমিরা এবং রাম-বনবাস। গোমিরার রূপ ঐতিহ্যবাহী। এখানে দেব-দেবীদের সঙ্গে মিশে যায় বিভিন্ন লৌকিক কাহিনি। যেমন এই নাচের আধারে থাকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, শ্মশান কালী, মাসান কালী, ডাকিনী, বাঘ বাহাদুর, নররাক্ষস ইত্যাদি চরিত্র। অন্যদিকে রাম-বনবাসে চিত্রিত করা হয় রামায়ণের বাণ কাণ্ডকে।
গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ঈশ্বর মনুষ্য রূপ নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেছিলেন, যাতে সকল মানুষকে তাঁরা আশীর্বাদ করতে পারেন এবং খারাপ কাজের বিরুদ্ধে মানুষদের সাহায্য করতে পারেন। এই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরেই যুগের পর যুগ গোমিরা খোশ মেজাজে পরিবেশিত হচ্ছে এই বাংলার দিনাজপুর অঞ্চলে।
আসলে মুখোশের মাধ্যমে অদৃশ্য বা অলৌকিক শক্তিকে সন্তুষ্ট করার কৌশল যেমন রয়েছে, তেমনই মুখোশের আড়ালে আত্মরক্ষার কাহিনিও মিশে রয়েছে সমানভাবে। একদল শ্রমজীবী মানুষের বিশ্বাসে জুড়ে গেছে ছদ্মমুখ বা মুখোশ। মুখোশকে সঙ্গী করেই একদিন যা ছিল বিরামহীন যুদ্ধের প্রস্তুতি, পরবর্তীতে তা রূপ নিয়েছে সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে। আর হয়ে উঠেছে এই বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি।
আজ ছবিমহলে রইল নীলাঞ্জন রায়ের তোলা গোমিরা মুখোশ নৃত্যের ছবি। যে ছবি আমাদের নিয়ে যাবে মায়াবী মুখোশের নগরে আর অজস্র লৌকিক কথকতায়।