হারিয়ে গিয়েও জল থেকে ফিরে এলেন যে দেবী

বারো মাস জল-ঘরে থাকেন দেবী। ভক্তের ডাকে মাত্র ছ’দিনের জন্য তাঁর ডাঙায় উঠে আসা। কিন্তু, এর মধ্যে মাত্র দু’দিন তাঁর দর্শন পায় ভক্তেরা-- বৈশাখ সংক্রান্তির আগের দিন এবং জ্যৈষ্ঠের চার তারিখে। দেবী দর্শনকে কেন্দ্র করে বসে হপ্তাব্যাপী চোখ-ধাঁধানো গ্রামীণ মেলা। বাকি চারদিন, আষাঢ় নবমী, বিজয়া দশমী, পনেরোই পৌষ এবং মাঘ মাসের মাকরী সপ্তমীতে দেবীকে জল থেকে তুলে পুজো করা হলেও দর্শনের অনুমতি মেলে না। ইনি, দেবী যোগাদ্যা। যে জলে তাঁর ঘর, তা ইতিহাসের ক্ষীরনদী। ইতিহাসের প্রবাহে গতি হারিয়ে তা এখন ক্ষীরদিঘি। গ্রামের নাম ক্ষীরগ্রাম। বর্ধমানের কাটোয়া মহকুমার মঙ্গলকোট থানার এই জনপদ ঘিরে থাকে জল-ঘরের এই দেবীকে। গ্রামের সুখ-দুখের বারোমাস্যা মিশে যায় যোগাদ্যায়।
‘ক্ষীরপীঠে মহামায়ে করিয়া স্থাপন। / রাবণ বধিতে লঙ্কা গেলা নারায়ণ।।’ কৃত্তিবাসী রামায়ণে যা ক্ষীরপীঠ, তাই অধুনা ক্ষীরগ্রাম। লোকবিশ্বাসে মা যোগাদ্যা দেবী মহামায়ারই অন্য রূপ। মার্কণ্ডেয় পুরাণেও এই দেবীর বর্ণনা আছে। দেবী জল-বাসা পেলেন কীভাবে? অবধূতা রামায়ণ অনুসারে মহাকালী বা ভদ্রকালী অর্থাৎ দেবী মহামায়ার সেবক মহীরাবণ রাম ও লক্ষ্মণকে হত্যা করার পরিকল্পনায় ছলনার বশে পাতালে নিয়ে আসে। মহাকালীর সামনে বলিদান দেওয়ার সময় মহীরাবণকেই বধ করে লক্ষ্মণ। পরে দেবী মহামায়া সহ সেবক হনুমান রাম ও লক্ষ্মণকে উদ্ধার করে তিনদিন ধরে লাগাতার পাতালপথে এই ক্ষীরগ্রামে আসেন। এই হল দেবীর পৌরাণিক গপ্পো। ঠিক কবে থেকে যে দেবী মহামায়া যোগাদ্যা হয়ে রাঢ় বঙ্গে অন্ত্যজ শ্রেণীর হাতে পূজিত হতে শুরু করেন, তা নিয়ে অবশ্য পণ্ডিতদের মধ্যেই বিতর্ক ঢের।
আরও পড়ুন
চব্বিশ পরগনায় বংশ পরম্পরায় চলছে রথ বানানোর প্রস্তুতি
ক্ষীরগ্রাম কিন্তু সতীপিঠও। অন্নদামঙ্গলে আছে, ‘ক্ষীরগ্রামে ডানিপাড় অঙ্গুষ্ঠ বৈভবঃ।/ যোগাদ্যা দেবতা ক্ষীরকণ্ঠকঃ ভৈরবঃ।।’ দেবীর বাঁ পায়ের বুড়ো আঙুলই গ্রামকে দিয়েছে সতীপীঠের মর্যাদা। ক্ষীরগ্রামের অদূরে আছে এক টিলার উপরে দেবীর ভৈরব ক্ষীরকণ্ঠ শিবের মন্দির। তাই এই গাঁয়ের নাম ক্ষীরগ্রাম।
ক্ষীরদিঘী লাগোয়া দেবীর মন্দির। মন্দিরে দেবীর কোন বিগ্রহ নেই। কারণ দেবীর বাস তো দিঘির জলে। গর্ভগৃহের দেওয়াল ঘেঁষে বেদী। সেই বেদীতেই দেবীর নিত্যপুজো। শোনা যায়, সিংহপৃষ্ঠে আসীন কালো কষ্টিপাথরের দশভুজা মহিষমর্দিনী শক্তির দেবী যোগাদ্যার আসল মূর্তিটি হারিয়ে গেছিল অনেক আগেই। এরপরে, বর্ধমানের রাজা কীর্তি চন্দ্র রায় অষ্টাদশ শতকের তৃতীয় দশকে প্রায় ৮ বিঘা জমির উপর গ্রামের মূলভাগ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় যোগাদ্যার মন্দির নির্মাণ করান। যার তোরণদ্বারের স্থাপত্য নজরকাড়া। সম্ভবত তাঁরই নির্দেশে হারিয়ে যাওয়া মূর্তিটির অনুকরণে একটি দশভুজা মহিষমর্দিনী মূর্তি তৈরি করেন দাঁইহাটের প্রস্তর শিল্পী নবীনচন্দ্র ভাস্কর। নতুন মূর্তিটি বছরের অন্যান্য সময়ে ডুবিয়ে রাখা হত ক্ষীরদিঘির জলেই। কেবল ৩১ বৈশাখ তা জল থেকে তুলে আনা হত সর্বসমক্ষে।
কিন্তু এর মধ্যেই নাকি ঘটে গেল এক অলৌকিক কাণ্ড। বছর কয়েক আগে, ক্ষীরদিঘি সংস্কারকালে নতুন মূর্তির সঙ্গে উঠে আসে হারিয়ে যাওয়া পুরোনো যোগাদ্যা মূর্তি। মূর্তি ফিরে পাওয়ার আনন্দে গ্রামিবাসীরা গড়ে তুললেন সম্পূর্ণ আলাদা একটি মন্দির। সেই মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন মন্দিরে। সংক্রান্তিতে দুই মন্দিরেই চলে দেবীর আরাধনা। একই দেবীর জোড়া মূর্তি নিয়ে জোড়া মন্দির—এমন আর এই দেশে আর কোথাও আছে কিনা সন্দেহ।
ক্ষীরগ্রাম এবং তাকে ঘিরে থাকা দেবী যোগাদ্যাকে নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য লৌকিক ইতিহাস। পৌরাণিক অনুপ্রবেশ সত্ত্বেও দেবী যোগাদ্যা মূলত কিন্তু লোকদেবীই। অন্ত্যজদের দখলে থাকা দেবী আধিপত্যের প্রবাহে ব্রাহ্মণদের কাছে আসে। গ্রামের দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় অন্ত্যজ শ্রেণী প্রথমে দেবীকে ছাড়তে চায়নি। পড়ে রীতিমতো লড়াইয়ে জিতে ব্রাহ্মণরা এই দেবীর দখল পায়। এই ‘দখলদারি’ গোটা মধ্যযুগেরই সত্য। সেই প্রথা মেনে আজও মহাপুজোর আগের রাতে ডোম-চুয়ারি খেলার আয়োজন হয় মূল মন্দিরের সামনে। ক্ষত্রিয় থেকে শুরু করে শূদ্রেরা একে একে বশ্যতা স্বীকার করে নেয় ব্রাহ্মণদের কাছে। সেখানে ব্রাহ্মণদের জয় হয় এবং প্রথা মেনে ডোমরা দেবীর উদ্দেশ্যে শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্ত দিয়ে শুরু করে মহাপুজোর আয়োজন। এই প্রথার আড়ালের ইতিহাস নিয়ে কী বলবেন, সে ভার পাঠকদের ওপরই থাক।
যোগাদ্যা আদতে কৃষিদেবী। তাই দেবীকে ঘিরে যে উৎসব, মেলা তার চরিত্রও গোঁড়া সাম্প্রদায়িক নয়। চৈত্র সংক্রান্তির দিন যোগ্যাদ্যার যে উৎসব শুরু হয়- চলে এক মাস ধরে নানান রীতি, আচারের মধ্যে দিয়ে। উল্লেখ্য হল লগ্ন উৎসব, জলমগ্ন, ক্ষীর কলস সিঞ্চন, ময়ূর নাচ, মৌর নাচ, বীরদর্পে মাটি কাঁপানো উৎসব, মালাকারের বিয়ে, উলগ পুজো, ডোম-চুয়ারি খেলা শেষে মহাপুজো। এলাকার ৩২টি জাতির মিলেমিশে লীন হয়ে এক অনন্য সামাজিক নজির এই যোগ্যাদ্যা পুজো। শোনা যায়, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেও এই পুজোয় নরবলি হত। কথিত আছে দেবী যোগাদ্যা অসহায় মা-এর কাছে হার মেনে নিজেই নরবলির বন্ধের আদেশ দেন। মানুষের স্নেহের কাছে দেবীর হার মানার এই গল্পে কথায় মিলেমিশে যায় লোকবিশ্বাস-বাস্তব...&