বাংলা থিয়েটারের নতুন ‘স্পেস’ চেনাচ্ছে গোবরডাঙা ‘নক্সা’

১২০০ স্কোয়ার ফিটের একটা পারফর্মিং স্পেস। ব্ল্যাক বক্স নয় কিন্তু, এক্সপেরিমেন্টাল পারফর্মিং স্পেস হিসাবেই দেখা ভালো। ফ্লোর থেকে যার উচ্চতা ২২ ফুট। এই স্পেসের যে-কোনো স্থানকে কেন্দ্র করেই নির্মিত হতে পারে থিয়েটার। দর্শকও বসতে পারেন যে-কোনো দিকে। এখানে অভিনয় করতে গেলে সবার আগে স্পেসটাকে বুঝতে হবে। তার সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন সর্বাগ্রে লক্ষণীয়। গোবরডাঙা নক্সা কলকাতা থেকে অনতিদূরে গড়ে ওঠা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি থিয়েটার সংস্থা। যারা মনে করেন শুধু মঞ্চ কাঁপানো নয়, থিয়েটার হোক পথের মানুষের, সর্বস্তরের মানুষকে একত্রিত করবার উদ্দেশ্যে তাঁদের যাত্রা এগিয়ে চলেছে সারিবদ্ধভাবে। ঘরের আনাচ কানাচ কিংবা ঘর থেকে বেরিয়ে পাড়ার রাস্তা বা বহুদিন ধরে পড়ে থাকা মাঠ সবকিছুকেই যদি থিয়েটারের আয়ত্তে নিয়ে আসা যায়, তবে থিয়েটার হয়ে উঠবে আমাদের যাপনের অংশ। ১৯৮১ সাল থেকে শুরু হয়েছে নক্সার পথ হাঁটা। আজ তার বয়স ৩৭।
এই ধারণা নিয়ে নকশা বহুদিন ধরে নাট্যশিল্পের প্রসার করছে। নক্সা এটাও বিশ্বাস করে যে স্কুল-কলেজে প্রথাগত শিক্ষার সঙ্গে যদি সিলেবাসে নাট্য প্রশিক্ষণও থাকে, তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের কল্পনাশক্তি বৃদ্ধি পায়, তাদের মৌলিক ভাবনা-চিন্তায় গতি আসে, বিভিন্ন বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্বতন্ত্র হয়। তাই নক্সা এমন উদ্যোগ নিতে বদ্ধপরিকর যা ছাত্রসমাজ এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের একসঙ্গে নিয়ে নাট্যশিল্প-কেন্দ্রিক শিক্ষার বিস্তার ঘটায়।
'বাবা বাগেশ্বরের ঘোড়া’ নামক একটি প্রযোজনা এরকম স্পেসে অভিনয় করা হয় একাধিকবার। সাধারণভাবে যেদিকে অভিনয় হয়, দর্শকদের যদি বসিয়ে দেওয়া হয় সেইদিকে? এমনটাই ঘটিয়েছেন এঁরা। এই স্পেসে রয়েছে একটি ব্যালকনি। যেখানে ১২৫ টি দর্শকাসন রয়েছে। দর্শক যেখানে বসেন সেই জায়গাগুলোকে অভিনেতার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেছেন। এতে একটা সমস্যাও তৈরি হয়। দর্শকদের স্পেস অভিনেতাকে দিয়ে দিলে বেশি দর্শক পাওয়া যায় না, অর্থাৎ ৫০ জনের বেশি মানুষ বসার জায়গা পান না। ‘বাবা বাগেশ্বরের ঘোড়া’ প্রায় তিনমাস প্রত্যেক রোববার এখানে নিয়মিত অভিনীত হত, যার সবকটা শো ছিল হাউসফুল। এই মুহূর্তে চলছে ‘মুচিরাম গুড়’ নামের একটি প্রযোজনা। যেখানে একদিকে দর্শক বসেন, আর অভিনয় হয় তিনদিকে। গোবরডাঙা নক্সা দলের সভাপতি আশিস দাস বলছেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে টিপিক্যাল, বস্তাপচা থিয়েটার চর্চাতেই অভ্যস্থ ছিলাম। কিন্তু কিছুদিন করার পর আমার মধ্যে ভীষণ ক্লান্তি আসে, মনে হয় আমার নিজের জন্য নিজের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ করার সময় এসেছে। তারপরেই এই স্পেসটা করার কথা ভাবি। গোবরডাঙাতেই একটি জায়গা কিনে প্রায় ৭০ লক্ষ টাকা খরচ করে এমন সুন্দর একটি থিয়েটার স্পেস তৈরি করেছি।”
এখানে থিয়েটার করতে পারবেন প্রত্যেকেই। তবে সবার আগে বুঝতে হবে এই স্পেসের প্রতিটি কোণ। চিনে নিতে হবে এখানকার প্রকৃতি। থিয়েটার চর্চা এভাবেই যাপন হয়ে ওঠে, আমার আপনার প্রত্যেকের। প্রসেনিয়ামের বাইরে গিয়ে থিয়েটারকে নতুনভাবে চেনার এহেন প্রয়াসকে বাংলা থিয়েটার কুর্নিশ জানায়।