No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মানবেন্দ্রকে জর্জ বিশ্বাস বললেন, “আপনি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন না”

    মানবেন্দ্রকে জর্জ বিশ্বাস বললেন, “আপনি আর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইবেন না”

    Story image

    কেন এতদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা করেননি ভেবে তখন মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। বাড়িতে ছোটো থেকেই গানের পরিবেশে বড়ো হয়েছেন মানবেন্দ্র। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা বাদ থেকে গেছে। অথচ, ইন্টার কলেজিয়েট কম্পিটিশনে কীর্তন, ঠুমরি, টপ্পার পাশাপাশি নাকি রবীন্দ্রসঙ্গীতও গাইতে হবে। এ তো ভারী বিপদ!

    উপায় বাতলে দিলেন কাকা রত্নেশ্বরই। বললেন, জর্জ বিশ্বাসের কাছে যেতে। এ অবস্থায় একমাত্র তিনিই নাকি গাইড করতে পারবেন। জর্জ তথা দেবব্রত বিশ্বাস তখন থাকতেন সাদার্ন অ্যাভিনিউএর বাড়িতে। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে আর কতই বা দূর! হাতে সময়ও নেই। কম্পিটিশনের দিন ভোরবেলাতেই জর্জ বিশ্বাসের বাড়িতে হানা দিলেন মানবেন্দ্র। মশারি টাঙানো ঘরে। দেখেই বোঝা যায় বাড়ির কর্তার সংসারে বিশেষ আসক্তি নেই। সবচাইতে বড়ো কথা জর্জ বিশ্বাস তখনও ঘুমোচ্ছেন। অচেনা একজন মানুষকে এভাবে ঘুম থেকে ডেকে তুলে গান শেখানোর আবদার করবেন! খানিক দোটানাতেই পড়ে গেলেন মানবেন্দ্র।

    কিন্তু উপায় নেই। অতএব, যা থাকে কপালে ভেবে মশারি তুলে জর্জ বিশ্বাসকে ঠেলাঠেলি শুরু করলেন মানবেন্দ্র। ঠেলায় কাজও হল। ধড়ফড় করে উঠে বসলেন জর্জ বিশ্বাস। একজন অচেনা মানুষ ভোরবেলা তাঁকে এভাবে ডেকে তুলেছে। বেজায় অসভ্য লোক তো। রাগ হওয়াই স্বাভাবিক। জর্জ বিশ্বাসের মেজাজ দেখে মানবেন্দ্র তখন কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে।

    রাগ অবশ্য কমল দ্রুতই। এবং অচেনা অতিথির দাবি শুনে ঘোরতর বিস্মিত হলেন জর্জ বিশ্বাস। মানবেন্দ্র তখন রীতিমতো কাতর স্বরে আবদার জুড়েছেন—“ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে হবে। আপনার কাছে শিখব।” বিস্ময়ের প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে প্রশ্ন করেন জর্জ বিশ্বাস—“কম্পিটিশন কবে?” উত্তরে ফের ধাক্কা—“আজই, বিকেলে। রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় আমার কাকা। তিনি বললেন, একমাত্র আপনিই...” এমন আজব দাবি এর আগে হয়তো কখনো শোনেনইনি জর্জ বিশ্বাস।

    তখন সময়টা খানিক অন্যরকম ছিল। মানুষগুলোও অন্যরকম ছিলেন। তাই, যুগপৎ এত ধাক্কার পরেও গান শেখাতে রাজি হয়ে গেলেন জর্জ বিশ্বাস। শুরু হল শেখানো। ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশেরও পাখি’। মানবেন্দ্র গান তুলছেন। কিছুতেই মনঃপুত হচ্ছে না শিক্ষকের। এদিকে তাঁর অফিসের সময়ও এগিয়ে আসছে। অফিস যাওয়ার আগে বোনকে বলে গেলেন নজর রাখতে। গান যতক্ষণ না ঠিকঠাক তোলা হচ্ছে, ততক্ষণ নিস্তার নেই।

    গান তোলা হল একরকম। জর্জ বিশ্বাসের বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি ফিরলেন মানবেন্দ্র। তারপর বিকেলে কম্পিটিশন। সেখানে গিয়ে এবার অবাক হওয়ার পালা মানবেন্দ্রর। বিচারকদের আসনে অনাদি দস্তিদার, শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পাশে যে দেবব্রত বিশ্বাসও! মানবেন্দ্রকে দেখে তিনি যেন চিনতেই পারলেন না। গান শুরু হল। রবীন্দ্রসঙ্গীতও উতরে গেল কোনোমতে। চেনা মানুষের বিচার করবেন না এই মর্মে নম্বর দেওয়া  থেকে বিরত থাকলেন দেবব্রত বিশ্বাস। কিন্তু বাকি বিচারকদের বিচারে মানবেন্দ্রই প্রথম হলেন।

    এরপর ফের সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে ঢুঁ মারলেন মানবেন্দ্র। এবারে অবশ্য আর আবদার নয়, ধন্যবাদ দিতে আসা। কিন্তু মানবেন্দ্রকে দেখেই জর্জ বিশ্বাস বললেন, “শুনুন মশাই, আপনাকে একটা প্রতিজ্ঞা করতে হবে। কথা দিন, এই আপনার প্রথম আর শেষ রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়া। রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনার জন্য নয়।”

    নাহ, মোটেও সেদিন রাগ করেননি মানবেন্দ্র। বরং, গুরুবাক্য যথাসম্ভব মেনে চলেছিলেন গোটা জীবনেই। বললাম না, তখনকার মানুষগুলো সত্যিই অন্যরকম ছিলেন।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @