গড়িয়াহাট সংহতি ইস্কুল : যেখানে শিক্ষার আলো পাচ্ছে শহরের উপেক্ষিত শিশুরা

কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত গড়িয়াহাট উড়ালপুল (Gariahat Bridge)। কত কত মানুষের নিত্য যাতায়াত। কেউ অফিসযাত্রী, কেউ মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছে। অথচ উড়ালপুলের নিচে অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে একটা বিশাল অংশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে প্রায় ২০০টি পরিবার। যারা ঘুমের বিছানা বলতে বোঝে পথচলতি মানুষের জন্য তৈরি করে দেওয়া বসার জায়গা, ছাদ বলতে বোঝে লোহার উড়ালপুল। পড়াশোনা তো দূরের কথা। শহরের ব্যস্ততম এই উড়ালপুলের নিচে ফুটপাতের শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘গড়িয়াহাট সংহতি ইস্কুল’ (Gariahat Sanhati School)। ক্লাসঘরে বসে জোরে জোরে আওড়ায় নামতা-স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ। আর বলে তাদের অসুবিধার কথা। নিজেদের স্বপ্নের কথা। বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে সেই স্বপ্নের দিকে নির্ভীকতার সঙ্গে পা বাড়ানোর কথা বলে তারা। তাদের এই আওয়াজের সঙ্গী হয়েছেন ‘গড়িয়াহাট সংহতি ইস্কুল’-এর শিক্ষক ঋক ধর্মপাল ব্যানার্জি, শালিনী মাজি, গিলি-সহ অন্যান্যরা।
শহরের ব্যস্ততম এই উড়ালপুলের নিচে ফুটপাতের শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘গড়িয়াহাট সংহতি ইস্কুল’। ক্লাসঘরে বসে জোরে জোরে আওড়ায় নামতা-স্বরবর্ণ-ব্যঞ্জনবর্ণ। আর বলে তাদের অসুবিধার কথা। নিজেদের স্বপ্নের কথা।
এই স্কুল কী এবং কেন – তা নিয়ে সম্প্রতি একটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছেন শিল্পী গিলি। গড়িয়াহাট উড়ালপুলের শিশু রূপসানা, আফসানা, আরিফার মতো আরও অনেক শিশুদের প্রতিদিনকার লড়াই, বেঁচে থাকা সেই মিউজিক ভিডিওটিতে অতি চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। এই স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিক্ষক গিলি মিউজিক ভিডিও প্রসঙ্গে জানান, “আমাদের কাজ ওদের এই কথাগুলো বাকিদের শোনানো। রাস্তার বাসিন্দা আওয়াজ তুলছে। সেই আওয়াজে দুঃখ-রাগ-আনন্দ-স্বপ্ন মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।” এই গানের ভাবনা, কথা ও কণ্ঠ গিলির নিজের। সংগীত আয়োজন ও পরিচালনা করেছেন অভিষেক ভট্টাচার্য।
গান প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে শহরের মানুষদের সচেতন করার জন্য বিশেষ আলোচনা হয় গত সেপ্টেম্বর মাসে। যে আলোচনায় উঠে আসে সংহতি স্কুল আসলে কী, উপেক্ষিত ও শোষিত শিশুদের সামগ্রিক উন্নতি এবং অধিকারপ্রদানের ভাবনা নিয়ে আলোচনা, এই স্কুলের শিক্ষকরা শিশুদের সঙ্গে কীভাবে মেলামেশা ও শিক্ষা আদানপ্রদান করেন – এই জাতীয় নানান বিষয়।
সংহতি স্কুল শুরু হয় ২০২০ সালে, লকডাউনের কারণে দেশে তখন কড়া নিরাপত্তা। গড়িয়াহাট ব্রিজের নিচে বহু দশক ধরে বাস করেন বহু সংখ্যক মানুষ। যেখানকার শিশুরা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হয়ে যায় নিমেষের মধ্যে। স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা ও শিক্ষক ঋক ধর্মপাল এ প্রসঙ্গে জানান, “সেই মুহূর্তে শিশুদের শিক্ষার সংস্পর্শে ফিরিয়ে আনা আমাদের আপৎকালীন তাগিদ বলে মনে হয়। স্কুল মানে সেখানে শুধু বাচ্চারাই পড়বে তা নয়, সত্তরোর্ধ্ব বয়স্ক-বয়স্কারাও একইরকম ছাত্রছাত্রী। পুরো গড়িয়াহাট ব্রিজের নিচটাই তাদের স্কুল। আমরা যেমন সকলকে শেখাই, ঠিক একইভাবে তাদের থেকেও শিখি। মাথায় রাখতে হবে আমরা যে তাদের সাহায্য করতে এসেছি, বিলোতে বা দান করতে এসেছি – এরকম নয়। তারা যে লড়াইটা প্রত্যেকদিন লড়ছেন, সেটা আমাদের কাছে শিক্ষণীয়। আমরা সেই লড়াইতে সংহতি জানাতে এসেছি। তাই পাঠশালার নাম গড়িয়াহাট সংহতি ইস্কুল।”
এই স্কুল কী এবং কেন – তা নিয়ে সম্প্রতি একটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছেন শিল্পী গিলি। গড়িয়াহাট উড়ালপুলের শিশু রূপসানা, আফসানা, আরিফার মতো আরও অনেক শিশুদের প্রতিদিনকার লড়াই, বেঁচে থাকা সেই মিউজিক ভিডিওটিতে অতি চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।
ঋকের কথা শুনে বোঝা যায়, এখানকার শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীর সম্পর্ক খাতায় কলমে শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রী হলেও আসলে সংহতি ও সহাবস্থানের সম্পর্ক। এই সম্পর্ক নিয়েই তাঁরা একে অপরের থেকে শিখছেন, জানছেন। শ্রমজীবী শ্রেণির মানুষদের এই লড়াইকে কুর্নিশ জানাচ্ছেন।
গড়িয়াহাট সংহতি স্কুলের ছাত্রী রূপসানা সেখ বলেন, “আগে এখানকার বাচ্চারা ভিক্ষা করত। এখন স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করে। প্রচুর লোকে আমাদের ছবি তুলতে আসে। ছবি তুলে চলে যায়। আমাদের নাম পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করে না। আমরা বড়ো হয়ে ভালো চাকরি করতে চাই।”
রূপসানা, আফসানা, আরিফার মতো এই শিশুরাই সমাজের ভবিষ্যৎ। তাদের জেদ আর ভালোবাসার কাছে অতি তুচ্ছ হয়ে যায় শহরের আপাত সৌন্দর্য। ভালোবাসার কলকাতায় বাস করা এই অভাগা মানুষগুলো তুমুল সংকটের মধ্যেও হাসে। গান গায়। স্বপ্ন দ্যাখে। ২০০টি পরিবারে এইভাবে রোজ রাত নামলেও তাদের সকালের আলো ফোটে সংহতিতে।