No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    কেরল থেকে বাংলা : ভারতনাট্যমের প্রসারে থাঙ্কমণি কুট্টির ঐতিহাসিক জার্নি

    কেরল থেকে বাংলা : ভারতনাট্যমের প্রসারে থাঙ্কমণি কুট্টির ঐতিহাসিক জার্নি

    Story image

    গল্পের সূচনা হয় ১৯৫৪ সালে, যখন একরত্তি থাঙ্কমণি (স্থানীয় ভাষায় নামের অর্থ দেবী লক্ষ্মী) মুগ্ধ হয়ে দেখেছিলেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী বাসন্তী মেননের নাচের অনুষ্ঠান। বাসন্তী ছিলেন কেরলের বিখ্যাত কবি ভাল্লাথোলের কন্যা এবং কেরালা কলামণ্ডলম্-এর প্রতিষ্ঠাতা। সেই বিখ্যাত কবির বাড়িতে একটি প্রাইভেট শোয়ের আয়োজন করা হয়েছিল, যেখানে থাঙ্কমণি তাঁর বাবা শ্রী কৃষ্ণন নাড়ী-এর সঙ্গে গিয়েছিলেন। কৃষ্ণন সে সময় কমিউনিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় কর্মী। প্রোগ্রাম শেষে ছোট্ট মেয়েটির মুখের ভাব দেখে বাসন্তী তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সে নাচ শিখতে আগ্রহী কিনা। থাঙ্কমণির স্পষ্ট উত্তর – হ্যাঁ!

    প্রাথমিকভাবে কেরল কলামণ্ডলম্-এর বোর্ড সদস্যদের বেশিরভাগই থাঙ্কমণির নৃত্যশিক্ষার আবেদন খারিজ করে দেন। অবশেষে বেশ কিছু বাধা পেরিয়ে তাঁর নির্বাচন হয়। আর থাঙ্কমণি যে ‘কমিউন’-এ এতদিন থাকছিলেন, সেখান থেকে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় কেরল কলামণ্ডলম্-এর হোস্টেলে। তাঁর জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলি তিনি লাভ করেন শ্রদ্ধেয় ভাল্লাথোল-এর কাছে। কোর্স শেষে, থাঙ্কমণি সুযোগ পান নিজের ট্রুপের সঙ্গে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সামনে নৃত্য পরিবেশনা করবার সুযোগও তিনি পান এই সময়ে।

    একবার, ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময়, কথাকলি শিক্ষিকা রমনকুট্টি নায়ার তাঁদের আলাপ করিয়ে দেন রোগা লম্বাটে চেহারার এক ভদ্রলোকের সঙ্গে, বলেন যে এই ভদ্রলোক নাকি কেরল কলামণ্ডলম্-এর কথাকলি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন। ভদ্রলোকের পরনে সেদিন ছিল অদ্ভুতরকম ঢিলা সাদা রঙের পাজামা ও পাঞ্জাবি। থাঙ্কমণি সে বিষয়টি বাকিদের নজরে আনতে, মেয়েরা সকলে মিলেই হেসে ওঠে। তখন কি আর থাঙ্কমণি জানতেন যে এই লোকটিই পরবর্তীকালে হয়ে উঠবেন তাঁর পথপ্রদর্শক, বন্ধু এবং আজীবনের সঙ্গী! আর এঁকে পাশে নিয়েই তিনি ইতিহাসের জন্ম দেবেন! বাংলা ও কেরলের যে সংযোগ এককালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি ভাল্লাথোল রচনা করেছিলেন, তাই-ই রচিত হবে নতুন ভাবে!

    বিয়ে করে কেরলে তাঁর নিজস্ব গ্রাম মাঞ্জেরি ছেড়ে দূরে যেতে চাননি থাঙ্কমণি। কিন্তু যখন তিনি জানতে পারেন যে স্বামীর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংসারটি তিনি কলকাতায় পাততে চলেছেন, তখন এক কথায় রাজি হয়ে যান। ১৯৫৮ সালে সুপরিচিত কথাকলি নর্তক শ্রী গোবিন্দন কুট্টির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কলকাতায় পা রাখেন থাঙ্কমণি। তাঁর কথায়, “আমরা যখন হাওড়া স্টেশনে নামি, আমি অবাক হয়ে দেখেছিলাম, ফুলের বুকে আর মালা হাতে মিঃ কুট্টির কত ছাত্রছাত্রী সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমন আবেগঘন মুহূর্ত আমি কখনোই ভুলতে পারব না।”

    ১৯৫৮ সাল থেকে আজ অবধি, থাঙ্কমণি কুট্টি এই বিশাল শহরটাকে আমার বাবা, আমার দুই ভাই আর আমার কাছে ‘বাড়ি’ করে তুলেছেন। একটি ছাত্রকে নিয়ে শুরু করে, ধীরে ধীরে শহরের নানান স্থানে ওঁরা গড়ে তোলেন স্কুল। সময়ের সঙ্গে আমার বাবা ও মা হয়ে ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের সর্বপ্রথম ক্লাসিক্যাল সেলিব্রিটি নৃত্যশিল্পী। বহু পুরস্কার ও সম্মাননা এসেছিল ঠিকই; কিন্তু বাবা-মা কেবল তা নিয়ে খুশি ছিলেন না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিগুলিকে জীবনের পাথেয় করে এগিয়ে চলেছিলেন তাঁরা।

    আমরা তিন ভাই এই শহরেই বড়ো হয়ে উঠেছি; আমাদের প্রচুর বাঙালি বন্ধু আছে। বাড়িতে যে খাবার রান্না হয়, তাতে বাংলার স্বাদ স্পষ্ট। আমরা ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’ হিসাবে বাংলা পড়েই বড়ো হয়েছি। স্থানীয় এক শিক্ষকের কাছে নিয়মিত তালিম নিয়েছি রবীন্দ্রসংগীতের। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নৃত্যনাট্যগুলির মুখ্য ভূমিকা পালন করতেন গুরু গোবিন্দন কুট্টি, আমার বাবা। তাঁর সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুরুষ চরিত্রাভিনেতা ছিলেন তিনি। তাঁদের প্রোডাকশানে তৈরি চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, মায়ার খেলা ও শাপমোচন বাংলার মানুষের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। এমনকি সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও ওঁরা ডাক পেয়েছিলেন এর জন্য। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার প্রণীত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বোর্ড দ্বারা বারংবার মনোনয়ন পেয়েছেন বাবা মা।

    কিন্তু ওই যে কথায় বলে, জীবনের পথ কোনো গোলাপের পাপড়ি বিছানো গালিচা নয়! ৫ জানুয়ারি ২০০৭, ভোরবেলা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাবা, শ্রদ্ধেয় গুরুজি, যিনি অগণিত মানুষের কাছে ছিলেন একাধারে পথপ্রদর্শক, বন্ধু ও শিক্ষক। নৃত্যজগৎ বা তার বাইরেও যারা বাবাকে চিনতেন, প্রত্যেকেই এই শোক গভীরভাবে অনুভব করেন, কারণ বাবা তো কেবলমাত্র একজন নামী শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন একজন বড়োমাপের মানুষ।

    কলামণ্ডলমের কাছে এ ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু এই সময়ে শক্ত হাতে হাল ধরলেন মা, যাঁর পরিচয় কলামণ্ডলমের সকলের কাছে ‘আন্টি’ নামে। তিন পুত্র ও ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে নিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে এগিয়ে গেলেন মা, যা কখনও স্বামীর পাশে বসে তিনি দেখেছিলেন। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে রেয়াতি মূল্যে গৃহীত জমিটার দাম তখন বেড়ে গিয়েছে। মা প্রথমেই KIT-এর সমস্ত ধার মেটালেন। তারপর এগোলেন পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে, যার উদ্দেশ্য – একটি পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার তৈরি করা। যেখানে ক্লাসরুম, অডিটোরিয়াম, সাউন্ড স্টুডিও, ডরমেটোরি, এবং স্টাফ কোয়ার্টার – সমস্ত কিছু থাকবে এক ছাদের তলায়। পশ্চিমি ভাবধারার যে প্রভাব ভারতীয় যুবসমাজের উপর পড়ছে, তা নির্মূল করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন মা। আর এ জন্য তাঁর হাতে ছিল সবথেকে ধারালো অস্ত্র – ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

    পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের আরও নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল ডাঃ কুট্টির নাম, যিনি পথ দেখিয়েছেন অগণিত ছাত্রছাত্রীকে, তৈরি করেছেন নিজস্ব ঘরানা এবং ১৯৬৮ সালে তৈরি হওয়া ভারতের অন্যতম বৃহৎ ক্লাসিক্যাল ডান্স ট্রেনিং ইন্সটিটিউটটি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বর্তমানে গলফগ্রিনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিখ্যাত মনুমেন্টগুলির মধ্যে দ্য কলামণ্ডলম্ পারফর্মিং আর্টস অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার অন্যতম। যার আবেদনে সাড়া দিয়ে শহর ও রাজ্যের নানান দিক থেকে সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষেরা এসে জড়ো হন একসঙ্গে, এ পৃথিবীকে আরও একটু বাসযোগ্য করে তোলার লক্ষ্যে।

    এই আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে, আমার মা থাঙ্কমণি কুট্টিকে আমি হৃদয়ের অন্তর থেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জ্ঞাপন করি। মা যে কেবলমাত্র ভারতের অন্যতম সম্মানিত নৃত্যধারা ভারতনাট্যমকে বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন তাই নয়, এই বিষয়ক শিক্ষা ও চিন্তাধারার ঐতিহ্যকে তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন সম্মুখপানে।

    __________________________

    *সোমনাথ কুট্টি হলেন শ্রদ্ধেয় ভারতনাট্যম এবং মোহিনীআট্যম মায়েস্ত্রো থাঙ্কমণি কুট্টির পুত্র। বর্তমানে, কলামন্ডলম্ কলকাতার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন।

    **ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @