‘ঘোষ-ঘারা’ থেকে ‘গুসকরা’, স্বপ্ন দেখছে বর্ধমানের এই ছোট্ট শহর

বর্তমান পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রাচীন শহর গুসকরা, ‘শহর’ অর্থাৎ পৌরসভা অঞ্চলে রূপান্তরিত হয়েছে ১৯৮৮ সালের ১ লা মার্চ। আসলে এই শহরের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ইতিহাস। শহরের কোলাহল পার করে জনঅরণ্যের মধ্যে মিশে আছে এখানকার মানুষ। মঙ্গলকাব্য জুড়ে তাদের আনাগোনা। বিশে ডাকাতের অত্যাচার কিংবা চোংদার জমিদার বংশ। বর্ধমানের রাজা আসছেন, যাচ্ছেন, মিটিং ডাকছেন। সাঁওতালরা একটু একটু করে খুঁজে নিচ্ছেন নিজেদের অস্তিত্ব। দুই নদ যেন আঁকড়ে ধরে রেখেছে প্রাচীন জনপদটিকে। একদিকে দামোদর, আরেকদিকে অজয়। দুটোই নদ। নদের মাঝে ছোট্ট শহর, গুসকরা।
কথিত আছে, ব্রিটিশ জমানায় বিখ্যাত ঘোষ বংশ তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল এই এলাকায়। গুসকরার পূর্ব নাম তাই ‘ঘোষ-ঘারা’। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে অজয়ের শাখা নদী কুনুর। যা এখন প্রায় অবলুপ্ত। গুসকরার পাশেই গোপভূম অঞ্চলে ছিল রাজা সদগোপের বাস, মুসলিমরা ক্ষমতায় চলে এলেও তাঁরা পিছিয়ে পড়েননি। স্বমহিমায় নিজেদের রক্ষা করছিলেন তাঁরা। এখানকার বিশ্বাস, রাজা আদিশূর নাকি পাঁচজন ব্রাহ্মণ এবং পাঁচজন কায়স্থের খাওয়া-পরার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, যাঁরা এসেছিলেন উত্তরপ্রদেশের কনৌজ থেকে। গুসকরা প্রচুর ঐতিহাসিক আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে। ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ছুঁয়ে গিয়েছিল এই অঞ্চলকে।
গুসকরা বন্যা কবলিত অঞ্চল নামে পরিচিত ছিল একসময়। অজয়ের জল ভাসিয়ে দিত পুরো অঞ্চল। ১৯৪৪ সালে বর্ধমানের মহারাজা উদয়চাঁদ মহতাব একটি মিটিং আয়োজন করলেন, মূলত বন্যার হাত থেকে সুরাহার পথ বাতলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছু হল না। এরপর কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে তার কিছুটা সুরাহা হল। তাঁরা প্রচুর লোক মোতায়েন করে বাঁধ নির্মাণ করলেন।
আরও পড়ুন
হারিয়ে গিয়েও জল থেকে ফিরে এলেন যে দেবী
গুসকরার পাশেই রয়েছে আরেকটি প্রাচীন গ্রাম ‘দ্বারিয়াপুর’। সেখানে মিলবে বিখ্যাত ডোকরা শিল্প। এখান থেকেই ডোকরার কাজ আদান প্রদান হয় গোটা পশ্চিমবঙ্গে। এখানকার লোকবিশ্বাসে প্রতিবছর জমে ওঠে রটন্তী কালী মেলা। শীতকালে প্রায় দশদিন ধরে এই মেলায় খুঁজে পাওয়া যাবে গ্রাম্য সংস্কৃতির ভিড়। লোকশিল্প, লোকগাথা দিয়ে সাজানো একটা মেলাকে কেন্দ্র করে চলে গুসকরা উৎসব। মাত্র ১৫ কিমি এগোলেই এক জেলা পেরিয়ে অন্য জেলায় পৌঁছনো যাবে। বর্ধমান পেরিয়ে বীরভূম, তাদের আলাদা করে রেখেছে অজয়। একদিকে গুসকরা, আরেকদিকে শান্তিনিকেতন। গুসকরা থেকে যার ব্যবধান মাত্র ২০ মিনিটের।
শহর থেকে গ্রাম বেশিদূরে নয়। তবে এটা ঠিক ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’র রাজনীতি না। বরং আশপাশের ওই গ্রামগুলোই গুসকরাকে নিজের করে রেখেছে। এখানকার অন্ধকার রাস্তা জানান দেবে পুকুর, মন্দির আর সারি সারি নারকেল গাছের গল্প। অস্পষ্ট উচ্চারণে কী মধুর এখানকার ডায়ালেক্ট। সুসজ্জিত স্টেশনের দিকে তাকিয়ে থাকলে একবারও কি ব্রিটিশ জমানার কথা মনে পড়বে না? মনে পড়বে না জমিদারি ব্যবস্থার কথা? শান্তিনিকেতন প্রতিবেশী শহর বলে সবাই হয়ত এক ডাকে গুসকরাকে চিনে ফেলে। কিন্তু গুসকরার নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আজ ভুলতে বসেছে মানুষ। এই ছোট্ট শহরটি আপনাদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ভুলে গেলে কি চলবে?