পদ্মা সেতুর গোড়ার কথা

গত ২৫ জুন বাংলাদেশের পদ্মা নদীর ওপর দীর্ঘতম সেতুটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলাই বাহুল্য, নবনির্মিত এই সেতুটি স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির পাশাপাশি দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠেছে পদ্মা সেতু। বর্তমানে ঢাকা যাতায়াতের সময়ও অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে এই সেতু। বাংলাদেশের অভিনব এই সেতুর সঙ্গে কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনও সম্পর্ক আছে?
শুনতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি, সম্পর্ক আছে! ১০০ বছরের আগেকার কথা। রবিবাবু একবার বাংলাদেশের পাহাড়ী অঞ্চলে ভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই সঙ্গে এ-ও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে পালকি অথবা মানুষের পিঠে চড়ে ভ্রমণ করতে হয়, এমন কিছুতে তিনি উঠবেন না। এই ঘটনাই প্রথমবার ব্রিটিশ প্রশাসনকে শিলং এবং শ্রীহট্ট (আজকের সিলেট)-এর দুর্গম পথের মধ্যে সেতু নির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করিয়েছিল। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার আবিদ রেজা চৌধুরীর নকশায় তৈরি হয়ও একটি সেতু। সেই আবিদ রেজা চৌধুরীর ছেলেই আজকের বিস্ময়কর পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রধান পরামর্শদাতা। পদ্মা সেতু নির্মাণের অন্তরালের সেই মানুষটি হলেন, বাংলাদেশের অধ্যাপক, ডঃ জামিলুর রেজা চৌধুরী। ইঞ্জিনিয়ারিং দৃষ্টিকোণ থেকে, পদ্মা সেতু বিশ্বের অন্যতম চ্যালেঞ্জিং একটি প্রকল্প। নদীর অনন্য ভৌগোলিক অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিতে নতুন নির্মাণ কৌশল তৈরি করতে হয়েছিল সেতুর নির্মাণে। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশের এই একীকরণ অনেক আগে থেকেই কবিগুরু স্বয়ং ভেবেছিলেন। তাঁর ভাবনা আজ সত্যি হয়েছে। ধন্যবাদ প্রাপ্য প্রতিভাবান পিতা-পুত্র যুগলের। তাঁরা দুজনেই নিজ নিজ সময়ে এই দুটি সেতু নির্মাণ করে স্থান এবং মানুষের মধ্যে ব্যবধান দূর করতে এবং কবিগুরুর আদর্শকে বাস্তবায়িত করতে সাহায্য করেছেন।
আবিদ রেজা চৌধুরী ও জামিলুর রেজা চৌধুরী
২০২২ সালের ২৫ জুন, পদ্মা নদীর উপর এই দোতলা সড়ক-রেল সেতু উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা নদীর ওপর এই বহুমুখী সেতুটি ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প। দীর্ঘতম এই সেতুটি (৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ) শরীয়তপুর এবং মাদারীপুরকে সংযুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। সেতুটি শুধু বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার প্রায় তিন কোটি মানুষকে উপকৃত করেছে তাই নয়, উপরন্তু ঢাকা এবং কলকাতার মধ্যে যাতায়াতের সময়ও কমিয়ে দিয়েছে।
পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রকৃতপক্ষেই বাংলাদেশ-এর ১৭ কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণ। সেতুটি ব্যবসা-বাণিজ্য, ভ্রমণ-পর্যটন সহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে নতুন দিশা দেখিয়েছে। তাই বাংলাদেশবাসীর এই সেতু নিয়ে উত্তেজনার পারদ তুঙ্গে। পদ্মা সেতুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্তর্নিহিত যোগাযোগ আছে, এ তত্ত্বটা কয়েক দশকের পুরোনো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন জীবিত। জানা যায়, তিনিই প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য সুপ্ত আগুনটি জ্বালিয়েছিলেন। প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী, বাংলাদেশের ইঞ্জিনিয়ার গোষ্ঠীর সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনিই। তিনি একাধারে ছিলেন একজন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রশাসক এবং সর্বোপরি একজন দক্ষ পরিচালক। পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞদের আন্তর্জাতিক প্যানেলে তিনিই ছিলেন প্রধান ব্যক্তি। ২০২০ সালের ২৮ এপ্রিল, ৭৬ বছর বয়সে মারা যান জামিলুর রেজা চৌধুরী।
দীর্ঘতম এই সেতুটি (৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ) শরীয়তপুর এবং মাদারীপুরকে সংযুক্ত করেছে, যা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১৯১৯ সালের কথা। আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী আগে, শিলং সফরে বেরিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারাও নোবেল বিজয়ী কবির শহরে আসার কথা শুনে, তাঁকে একবার দেখার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করেন। অনেকেই আবার কবিকে শ্রীহট্ট (সিলেট) আসার জন্য অনুরোধ করেন। শিলং তখন আসামের রাজধানী এবং সিলেট ছিল একটি জেলা শহর। বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত ছিল সিলেট। জালিয়ানওয়ালা বাগে গণহত্যার ঠিক চার মাসের মাথায় ওই ঘটনার প্রতিবাদে কবি তার নাইটহুড ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন (তিনি ৩০ মে, ১৯১৯, ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখেছিলেন রবি ঠাকুর)। তাঁর এই সাহসী সিদ্ধান্ত তখন সর্বস্তরের মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। মানুষ আক্ষরিক অর্থেই তাঁকে মন থেকে পুজো করেছিলেন সেদিন। গোবিন্দ নারায়ণ সিংহ মজুমদার, ব্রাহ্মসমাজ, শ্রীহট্ট গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক এবং শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি সহ বেশ কয়েকটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রধানরা কবিকে শ্রীহট্ট পরিদর্শনের অনুরোধ করে একটি টেলিগ্রাম করেন। কবিও অনায়াসে রাজি হয়ে যান সেই অনুরোধে। কিন্তু শিলং ও শ্রীহট্টের মধ্যে তখন সরাসরি যোগাযোগের কোনো পথ ছিল না। কংক্রিটের রাস্তা না থাকায় যাতায়াত ব্যবস্থাও ছিল দুর্গম। শ্রীহট্টে পৌঁছতে চেরাপুঞ্জি ও থারিয়াঘাট হয়ে খাসিয়া পাহাড়ে নামতে হতো। একটি নির্দিষ্ট অংশ পর্যন্ত রাস্তাটি নৌ-চলাচলযোগ্য ছিল, কিন্তু এর বাইরে, ভ্রমণকারীকে মানুষের পিঠে চড়তে হতো – তখনকার দিনে পার্বত্য অঞ্চলে এটাই ছিল সাধারণ পরিবহনের মাধ্যম।
দীর্ঘ ও দুর্গম পথে একজন মানুষের বোঝা হয়ে, তার ঘাড়ে চেপে ভ্রমণ করার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন কবি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, এভাবে ভ্রমণ তিনি করবেন না। বিকল্প হিসেবে প্রয়োজনে ওই ১০ মাইল পথ তিনি হাঁটার প্রস্তাব দেন। অবশেষে, আরও একটি ঘুর পথের দীর্ঘ সফর বেছে নেওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেদিন গুয়াহাটি-লামডিং-বদরপুর-কুলাউড়া হয়ে অবশেষে শ্রীহট্টে পৌঁছান। কবির এই ভ্রমণবৃত্তান্ত সে সময়ে স্থানীয় প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। তড়িঘড়ি সরাসরি সিলেট-শিলং সড়ক নির্মাণের প্রাথমিক আলোচনা শুরু করে প্রশাসন।
আরও পড়ুন: স্বাধীন বাংলাদেশ – স্মৃতি এবং স্মৃতির কাঁটা
তৎকালীন প্রভাবশালী কংগ্রেস নেতা ও মন্ত্রীদের অন্যতম ছিলেন শ্রীহট্টের বুরাঙ্গা গ্রামের বসন্ত কুমার দাস। তিনিই প্রাথমিক উদ্যোগ নেন সেতু নির্মাণের। কিন্তু পাথুরে উমগাট নদীর রাস্তা এবং জয়ন্তিয়া পাহাড়কে সংযুক্ত করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ সময় পদস্খলনের সমাধান খুঁজতে ডাকা হয় আবিদ রেজা চৌধুরীকে। আবিদ রেজা চৌধুরী তখন শিলং-এ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত। তিনি একটি বিশেষ সেতুর নকশা করেন এবং ১৯৩০ সালে তাঁরই নির্দেশে ওই পথে নির্মিত হয় বিকল্প একটি সেতু। ইতিহাসের আশ্চর্য মহিমা, একদিন যে আবিদ রেজা চৌধুরীর হাতে বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নয়া মোড় এনেছিলেন আজ তাঁরই ছেলে ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রধান পরামর্শদাতা। আজকের দ্বিতল এই পদ্মা সেতুটি প্রকৃতঅর্থেই বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়।
মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে ক্লিক করুন।