No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘ক্লাস’ থেকে ‘মাস’, বাংলা থিয়েটারের ১১০০ রজনী দেখেছে সারকারিনার দর্শক

    ‘ক্লাস’ থেকে ‘মাস’, বাংলা থিয়েটারের ১১০০ রজনী দেখেছে সারকারিনার দর্শক

    Story image

    সারকারিনা মঞ্চে অমর ঘোষ। ছবি সৌজন্য কমল সাহা - বাংলা নাট্যকোষ পরিষদ

    লকাতার মধ্যে থাকা ‘বিশ শতকের কলকাতা’-টা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আকাশঝাড়ু ফ্ল্যাট বাড়ি, মল, মাল্টিপ্লেক্সের ভিড়ে কলকাতা হয়েছে আধুনিক। সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মায়ানগর’, বহু বছর পর কোনও বাংলা ছবিতে থিয়েটার হল সারকারিনা (Sarkarina Theatre)-কে দেখানো হয়েছে। ছবির বেশ কিছু দৃশ্যের শ্যুটিংও হয়েছে সারকারিনায়। ছবিতে থিয়েটার হলের বয়স্ক ও মানসিক ভারসাম্যহীন মালিক বুবু, থিয়েটার হল চালানোর পুরোনো স্মৃতি ঘিরে বাঁচেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, ভেঙে পড়া হলটি আবার একদিন খুলতে পারবেন। একেবারে বাস্তব জীবন থেকে চরিত্রটি অনুপ্রাণিত। ব্রাত্য অভিনীত বুবু চরিত্রটি সারকারিনার প্রাণপুরুষ অমর ঘোষের ছায়া অবলম্বনে নির্মাণ করা হয়েছে।

    একদা উত্তর কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ছিল থিয়েটার পাড়া। আজ সেখানে বাসা বেঁধেছে অবসর। ছুটির দিনে, শনি-রবিতে যে পাড়ায় তিল ধারণের জায়গা থাকত না, এখন সে তল্লাট নির্বাসনে। রঙ্গনা, বিশ্বরূপা, রঙমহল, বিজন থিয়েটার একে একে নিভেছে সব। এই পাড়াতেই রুগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সারকারিনা। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডে (এপিসি রোড) নেমে হালসি বাগানের উল্টোদিকে রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটে ঢুকে কয়েক পা হাঁটলে চোখে পড়বে রঙ্গনা থিয়েটার। আরও কয়েক পা এগোলেই সারকারিনা। থিয়েটার পাড়ার এক প্রবীণ বাসিন্দার সঙ্গে দেখা হল ক্ষেত্র সমীক্ষার সময়। বললেন, ‘‘কী দেখবেন আর! সব তো শ্মশান হয়ে গেছে। আমি ষাট বছর এ পাড়ায় ছিলাম। এখন কাছে একটা ফ্ল্যাটে চলে গেছি। সেই গমগম করার দিন আর নেই। ওই দেখুন, ওটাই সারকারিনা। হাল দেখছেন!’’

    সারকারিনার আসল জাদু ছিল তার মঞ্চে। প্রথাগত তিনদিক ঘেরা মঞ্চ নয়, হলের একেবারে মাঝখানে গোলাকৃতি মঞ্চ। মঞ্চ কেবল ঘুরতোই নয়। বিভিন্ন উচ্চতায় নামা-ওঠা করত। চারিদিকে গোল হয়ে বসে থাকত দর্শক।

    পেশাদার থিয়েটার হলগুলোর মধ্যে সেরা বলা হত সারকারিনা-কে। কারণ রিভলভিং থিয়েটার মঞ্চ। গোটা এশিয়ার মধ্যে একমাত্র এখানেই এমন মঞ্চ ছিল। সার্কুলার এরিনার বলে নামকরণ হয়েছিল সারকারিনা। সারকারিনার আসল জাদু ছিল তার মঞ্চে। প্রথাগত তিনদিক ঘেরা মঞ্চ নয়, হলের একেবারে মাঝখানে গোলাকৃতি মঞ্চ। মঞ্চ কেবল ঘুরতোই নয়। বিভিন্ন উচ্চতায় নামা-ওঠা করত। চারিদিকে গোল হয়ে বসে থাকত দর্শক। সারিতে সারিতে ধাপে ধাপে উঠে যেত দর্শকাসন। মোট আসন সংখ্যা ছিল এক হাজার। এ-ও এক বিস্ময়!

    নাটক চলতে চলতে কয়েক সেকেন্ডের অন্ধকার। গোলাকার মঞ্চটি নেমে যেত নিচে। সেখানেই থাকত সাজঘর। মুহূর্তে আবার উঠে আসত গোটা মঞ্চ। তখন নতুন দৃশ্য, নতুন মঞ্চ সজ্জা, অভিনেতারাও নতুন। এভাবেই দৃশ্য পরিবর্তনের সময় নেমে যেত মঞ্চ। বিভিন্ন উচ্চতায়, বিভিন্ন স্তরে প্রযোজনা চলত। হাইড্রোলিক পিস্টনের সাহায্যে মঞ্চ ওঠা-নামা করত। মঞ্চ নিচে চলে গেলে মঞ্চের চারদিকের সিমেন্টের বেসমেন্টে অভিনয় চলত। আবার কখনও কখনও দর্শকদের মধ্যে থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সংলাপ বলতে বলতে হেঁটে প্রবেশ করতেন মঞ্চে। এসব দেখার জন্যই মানুষ জড়ো হতেন সারকারিনায়। এটাই ছিল অমর ঘোষের ম্যাজিক। তিনিই সারকারিনার প্রাণ পুরুষ। তাঁর উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল এই থিয়েটার হল। তিনিই স্থপতি, স্টেজের অভিনব নকশাও তাঁর-ই করা।

    সারকারিনায় তিনটি বক্স ছিল। সেখানে হিন্দি, ইংরেজি ও এস্পেরান্তো ভাষায় ‘ডাবিং’ করা প্রযোজনা শোনা যেত। আজকের সিনেমার দুনিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া ‘প্যান ইন্ডিয়া কালচার’ থিয়েটারের জগতে এনেছিলেন অমর ঘোষ। জোড়া মঞ্চও ছিল। দ্বিতীয় তলায় ছিল অন্য মঞ্চটি, অর্থাৎ থিয়েটার হল হলেও সারকারিনা ছিল কলকাতার প্রথম ‘মাল্টিপ্লেক্স’। 

    অমর ঘোষ নিজে ছিলেন পদার্থবিদ্যার শিক্ষক। পরে রবীন্দ্রভারতীর নাট্য বিভাগে অধ্যাপনাও করেছেন। গড়েছিলেন নিজের নাট্যদল ‘উদয়াচল’। উত্তর কলকাতার রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটের একটি খাটাল কিনে থিয়েটার হল বানান। ১৯৭৫ সালের রথযাত্রার দিন শুরু হয়েছিল নির্মাণ কাজ। গোটা এক বছর পর ১৯৭৬ সালের রথযাত্রায় জ্বলে উঠল আলো। সেটিই সারকারিনা। সেই হলে প্রথম প্রযোজিত হল অমর ঘোষ রচিত-নির্দেশিত এবং অভিনীত নাটক ‘তুষার যুগ আসছে’। উদ্বোধনের আগেই শো হাউস-ফুল হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে এল নয়া প্রযোজনা ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, চলল এগারোশো রজনী! সারকারিনার সর্বকালীন রেকর্ড। উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, হারাধন বন্দ্যোপাধ্যায়, শমিতা বিশ্বাস, সবিতাব্রত দত্ত, দিলীপ রায়, সুলতা চৌধুরী, সাবিত্রী চ্যাটার্জি, নন্দিনী মালিয়া, সমর মুখোপাধ্যায়, পার্থপ্রতীম চৌধুরীর মতো কিংবদন্তিরা এই মঞ্চে অভিনয় করে গিয়েছেন। একমেবাদ্বিতীয়ম সারকারিনার অশ্বমেধের ঘোড়া তখন ছুটেছে দুর্বার গতিতে। স্বল্পবসনা সুন্দরীর লাস্যময় নৃত্যের আসরও বসেছে সারকারিনায়। মিস শেফালির পাও পড়েছে সারকারিনার সাম্রাজ্যে। ঈর্ষার শিকার হয়েছে সারকারিনা। ‘ক্লাস’ থেকে ‘মাস’, গুরুগম্ভীর থিয়েটার থেকে হালকা চালের চটুল থিয়েটার, সবেতেই অমর ঘোষের সারকারিনা ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে।

    প্রথম প্রযোজিত হল অমর ঘোষ রচিত-নির্দেশিত এবং অভিনীত নাটক ‘তুষার যুগ আসছে’। উদ্বোধনের আগেই শো হাউস-ফুল হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে এল নয়া প্রযোজনা ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, চলল এগারোশো রজনী! সারকারিনার সর্বকালীন রেকর্ড।

    তারপর আটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ধাক্কা খেল পেশাদার ‘কর্মাশিয়াল’ থিয়েটার। অমরবাবু নিজের সর্বস্ব বিকিয়ে দিয়েছেন সারকারিনাকে বাঁচানোর জন্য, সচল রাখার জন্য। বাড়ি অবধি বেচেছেন। সুদিন আর ফেরেনি। পেশাদার থিয়েটারের সঙ্গে সঙ্গে সারকারিনারও গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে। এখন সারমেয় আর ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে সে। ১৯৯৫ থেকে পড়তির দিন শুরু। ২০০৮ সালে ‘গুলবাগ’ ছিল শেষ প্রযোজনা। ২০১৪ সালে চলে গিয়েছেন অমর ঘোষ। তাঁর পুত্রেরা আছেন আর যক্ষপুরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সারকারিনা। টিকিট ঘর থাকলেও টিকিট টাকার লোক নেই। অন্ধকার ঘর, কাচ ভাঙা জানলা, মরচে ধরা সিঁড়ি, নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রপাতি, ভেঙে পড়া আলোর স্ট্যান্ড, ধুলো জমা চেয়ার আর স্মৃতিই এখন সম্বল।

    সারকারিনার কাছেই ফুটপাতে ভাতের হোটেল চালান চন্দন যাদব। তিনি জন্ম থেকেই থিয়েটার পাড়ার বাসিন্দা। সারকারিনাকে সচল দেখেছেন প্রৌঢ় চন্দন। রান্না করতে করতে হিন্দি টানে ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘‘ওমর ঘোষ (অমর ঘোষ) বেঁচে থাকতেই সব বন্ধ হয়ে গেল। শেষের দিকে এখানে (সারকারিনায়) নাচ হত। এখানে কে আসেনি, সবাইকে আমি চা খাইয়েছি। আর্টিস্টরা সব কড়া চা খায়। এখন সব বন্ধ। একবার রাজা মুরাদ এসেছিল। প্রচুর ভিড় হয়েছিল। দু-রাতের শো ছিল। এই তো বিজন (বিজন থিয়েটার) শেষ হয়ে গেছে। রঙ্গনা সাঁইবাবার মন্দির হয়ে গেছে। ওমরবাবু নাটক লিখতেন। অনেক চেষ্টা করেছিলেন। ছোটোবেলা থেকে দেখেছি।’’

     

    যখন কথাবার্তা চলছে, আর একজন স্থানীয় বাসিন্দা এগিয়ে এলেন। প্রবীণ মানুষ। বললেন, ‘‘এটা হল থিয়েটার পাড়া। ওদিকে মিনার্ভা আর এপাশে রঙ্গনা। মাঝে কত হল ছিল! সব বন্ধ।’’ সারকারিনার বিষয়ে বললেন, ‘‘ত্রিশ-চল্লিশ বছর হল বন্ধ। (বুঝলাম বয়সের ভারে হিসাবে খানিকটা গোলমাল হয়ে গিয়েছে হয়তো।) স্টারকে যেমন সরকার বাঁচিয়ে রেখেছে, ওরম কিছু হলে ভালো হয়! ভিতরে সব অন্ধকার। ভাঙাচোরা। এই পাড়ায় টলিউডের কম লোক আসেনি। হিন্দি সিনেমার লোকেরাও এসেছে। এখন আর কেউ ভুলেও আসে না। দেব, জিতও এসেছে এক সময়। বাকিগুলোয় (অন্যান্য থিয়েটার হলে) প্রোমোটার আসলেও, এটায় এখনও পারেনি।’’

    সারকারিনার উল্টোদিকে এখন রদ্দি-কাগজের কয়েকটা দোকান, বন্ধ গুদাম রয়েছে আর ফ্ল্যাট বাড়ি আছে। অনেকেই জানেন না সারকারিনার মঞ্চের ম্যাজিকের কাহিনি। ইতিহাস অজানা পাড়ার নয়া বাসিন্দাদের। নতুন বাসিন্দারা কথা বলতেও চান না। ঝড়-জল, প্রোমোটারের থাবা সব সমালেও দাঁড়িয়ে আছে বাংলা তথা দেশের গর্ব, আধুনিক নাট্যচর্চার অন্যতম পীঠস্থান সারকারিনা। কিন্তু কত দিন? কালের নিয়মে কি মাটিতে ধূলিস্যাৎ হওয়া লেখা রয়েছে সারকারিনার ভাগ্যলিপিতে? হারিয়ে যাবে অতীতের সমৃদ্ধ ইতিহাস?

    আবার থিয়েটার পাড়ায় আলো জ্বলবে, পেশাদারি থিয়েটার একদিন ফিরবে এ স্বপ্ন অলীক। একমাত্র প্রতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ও সংস্কার বাংলার নাট্যজগতের এই গর্বকে বাঁচাতে পারে। পুনর্জন্মের আশায় ততদিন প্রহর গুনতে থাক সারকারিনা।

    ছবি: প্রতিবেদক

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @