No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    শিবরাম ইন্টারভিউ দিলেন, চাকরি পেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

    শিবরাম ইন্টারভিউ দিলেন, চাকরি পেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র

    Story image

    প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন ঢাকায় গেছেন একটা কাজে। চাকরি নেই। অভাব পিছু ধাওয়া করে। হঠাৎ একটা চিঠি পেলেন শিবরামের। তাতে লেখা, ‘কলকাতা এস, তোমার চাকরি হয়ে গেছে।’ পড়ে প্রেমেন্দ্র অবাক। চাকরি কীভাবে হল! কোনো ইন্টারভিউই তো তিনি দেননি। কলকাতা ফিরে সেই অফিসের ঠিকানায় পৌঁছে বিস্ময়ের পালা আরো বাড়ল। অফিসার তাঁকে বললেন, ‘‘আরে মশাই, পাবলিসিটি অফিসারের পদে বেছেবুছে লোক ডেকে বললাম, কাল থেকে জয়েন করো। তো সে ছেলে বলছে, আমি তো জয়েন করব না! করবে আমার বন্ধু, প্রেমেন!” নিজে ইন্টারভিউ দিয়ে বন্ধুর জন্য চাকরি পাকা করেছিলেন শিবরাম। সেই চাকরি প্রেমেন্দ্র মিত্র করেওছিলেন কিছুদিন। এমন নয়, তখন শিবরামের হাতে অগাধ টাকা। অভাব তাঁরও বেশ ভালোই। কিন্তু প্রেমেন্দ্ররও তো চাকরি দরকার। এমন বন্ধুত্বকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন বলুন তো!

    কিছু কিছু মানুষ আর তাঁদের সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করা সত্যিই কঠিন হয় আমাদের মতো গড়পড়তা, ঘেরাটোপে আটকা মানুষদের পক্ষে। প্রেমেন্দ্র মিত্র আর শিবরামের সম্পর্ক অনেকটা তেমনই। দুজনের আলাপ জমল সিনেমা হলে। ম্যাডান সিনেমায় (এখন ‘এলিট’) সবচাইতে সস্তা টিকিটের সিটে দুজনে বসে। হলের ছাদ ফুটো করে ‘ওয়ারলিটজার বাজনা’-র জন্য চোঙা বসানো হয়েছে। সেই সঙ্গীত নিয়ে আলাপ শুরু হল দু’জনের। তার আগেই অবশ্য প্রেমেন্দ্র মিত্রর ‘পাঁক’ উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হয়ে চিঠি লিখেছেন শিবরাম। সেই মুগ্ধতা আর আলাপ বন্ধুত্বে ঘন হতে সময় লাগেনি। 

    শিবরাম বারবার বলতেন, “প্রেমেনের মতো মিত্র হয় না।” আর প্রেমেন্দ্রও বলতেন, “খোদ শিব্রামকে আমার মতো কেউ বোধ হয় চেনে না, এ আমার একটা অহঙ্কার।“ শিবরামের মতো বন্ধুও কোনোদিন পাননি প্রেমেন্দ্র মিত্র। সেই নিখাদ বন্ধুত্বের অত্যাচারে মাঝেমাঝে অবশ্য বিব্রতও হতে হয়েছে তাঁকে। প্রেমেন্দ্র মিত্রর আর্থিক অনটন নিয়ে শিবরাম খুব চিন্তিত থাকতেন। বন্ধুর প্রয়োজনে সাহায্য করতেই হয়। তাই একসময় তিনি জোরাজুরি শুরু করলেন, সিনেমাপাড়ার জন্য গল্প লিখে দিতেই হবে প্রেমেন্দ্রকে। সিনেমার জন্য গল্প লিখলে নাকি অনেক টাকা পাওয়া যায়। এদিকে প্রেমেন্দ্র মিত্র তখনো সিনেমার জন্য কাহিনি লিখতে ইচ্ছুক নন। তিনি এড়িয়ে যেতেন বারবার। 

    একদিন স্টুডিওপাড়া থেকে তাঁর কাছে ডাক এল। খানিকটা অবাক হয়েই স্টুডিওপাড়ায় গেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রেমেন্দ্রকে যিনি ডেকেছেন তিনি বলতে লাগলেন, ‘‘আপনার পাঠানো গল্প পড়লাম। কিন্তু ওই জায়গাটা বুঝতে পারলাম না, ওই যে মেয়েটা দার্জিলিং গিয়ে একটা পার্টিতে সবাইকে চ্যালেঞ্জ করে হঠাৎ বিবস্ত্র হয়ে গেল...’’ আকাশ থেকে পড়লেন প্রেমেন্দ্র! কান লাল হয়ে গেল লজ্জায়। তিনি তো কিছু লেখেনইনি। ছি ছি, এসব কী অশালীন গল্প। পরে জানতে পারলেন, ‘প্রেমেন লিখেছে’ বলে শিবরামই নাকি এই গল্প জমা দিয়ে গেছে লোকটার অফিসে। রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরলেন প্রেমেন্দ্র। শিবরামকে হাতের কাছে পেলে হয় একবার! এদিকে শিবরাম আসেন না। দিন তিনেক পর শিবরাম এলেন প্রেমেন্দ্রর বাড়ি। প্রেমেন্দ্র রাগ দেখাবেন কী, শিবরামই পালটা দোষারোপ শুরু করলেন। এত বড়ো সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে! নিজে তো পাঠাবে না, তাই তাঁকেই বাধ্য হয়ে গল্প পাঠাতে হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রেমেন্দ্র ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ওই বিবস্ত্র হওয়ার দৃশ্য নিয়ে খানিক প্রতিবাদ করতেই শিবরাম ধমক দিয়ে বলে উঠলেন, “সিনেমায় তো সবই হয়। তুমি তো পরে সেসব বদলে দিতে পারতে।” এর কী আর কোনো উত্তর হয়!

    গল্পের কোনো শেষ নেই। প্রেমেন্দ্র তাঁর প্রথম ছোটোগল্পের বই ‘পুতুল ও প্রতিমা’ উৎসর্গ করলেন প্রিয় বন্ধু শিবরামকেই। এর বেশ কয়েকদিন পরে বইটার দ্বিতীয় সংস্করণও বেরোল। তার একখানা কপি হাতে নিয়ে শিবরাম অবাক, এ যে তাঁকেই উৎসর্গ করা। গদগদ কণ্ঠে প্রেমেন্দ্রকে বললেন, “তোমার প্রথম বইটা আমাকেই দিয়েছ দেখছি... দ্বিতীয় সংস্করণটাই দিয়েছ বুঝি আমায়? প্রথম সংস্করণটা কাকে দিয়েছিলে?” শুনে প্রেমেন্দ্রও অবাক। “বইয়ের প্রথম সংস্করণ একজনকে, দ্বিতীয় সংস্করণ আরেকজনকে— এরকম দেওয়া যায় নাকি! ...আশ্চর্য! বইটা বেরুবার দিনই তো দিয়েছিলাম তোমায়, তোমার বাসায় গিয়ে, মনে নেই? বইয়ের মলাটও উলটে দেখনি নাকি!” উলটে দেখার সত্যিই প্রয়োজন মনে করেননি শিবরাম। প্রেমেন্দ্রর সব গল্পই তাঁর আগে পড়া। একবার নয়, বারবার। কিন্তু, সেই বইটা গেল কোথায়? 

    খানিক ভাবতেই অবশ্য সবটাই মনে পড়ে গেল। শিবরামের স্বীকারোক্তি তাঁর মতোই অদ্ভুত, “হাতে পেয়ে বইটার মলাট দেখেই খুশি হয়েছিলাম। মলাটের পাতা উলটে আরও বেশি খুশি হবার সৌভাগ্য আমার ঘটেনি যে, সেটা আমার ললাট। প্রেমেনের বই তখন লোকের হাতে হাতে চলত, তাই মনে হয়েছিল এই দুর্যোগের দিনে এটাকেও হাতে হাতে চালিয়ে দিই এই সুযোগে। সঙ্গে সঙ্গে এম সি সরকারে গিয়ে বেচে দিয়ে এসেছিলাম বইটা।” 

    এমন মানুষ আর তাঁর বন্ধুত্বর গল্প শুনে বিস্ময় ঘন হতেই থাকে। একবার রেস্তোরাঁয় খাওয়া-দাওয়া করার ফাঁকে স্নেহের আবেগবশত প্রেমেন্দ্র মিত্রের গালে একটা চুমু খেয়ে ফেলেছিলেন হেমেন্দ্রকুমার রায়। কাজী নজরুল ইসলাম আর শিবরামও তখন সেখানে উপস্থিত। এই সুযোগ তো ছাড়া যায় না, শিবরাম তাই লিখলেন--“গল্প না বৎস, না কল্পনা চিত্র / হেমেন্দ্র চুম্বিত প্রেমেন্দ্র মিত্র।”

    এই টু-লাইনার পড়ে হেমেন্দ্র, প্রেমেন্দ্র আর নজরুল কী বলেছিলেন, তা অবশ্য জানা নেই এই হতভাগ্যর। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @