No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ভাটনগর পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় উজ্জ্বল উপস্থিতি চার বঙ্গসন্তানের

    ভাটনগর পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় উজ্জ্বল উপস্থিতি চার বঙ্গসন্তানের

    Story image

    ই বাংলা বরাবরই কৃতি সন্তানদের জন্মভূমি। তা সে শিল্প হোক বা বিজ্ঞান। শিল্পক্ষেত্রে যেমন গান, ছবি আঁকা, সিনেমা বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালিদের একটা আলাদা কদর রয়েছে সারা বিশ্বে, তেমনই বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালি গবেষকরা বারবার নিজেদের এবং বাংলার নাম উজ্জ্বল করেছেন। বিজ্ঞানক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান হলো শান্তিস্বরূপ ভাটনগর পুরস্কার (Shanti Swaroop Bhatnagar Award)। সেই পুরস্কারের প্রাপকদের তালিকায় প্রতি বছরের মতো এবারও বাঙালি গবেষকদের উজ্জ্বল উপস্থিতি। ১২ জন গবেষকের মধ্যে ৪ জনই বাঙালি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীপ্যমান গঙ্গোপাধ্যায়, পদার্থবিদ্যায় অনিন্দ্য দাস এবং বাসুদেব দাশগুপ্ত এবং রসায়নে দেবব্রত মাইতি এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছেন। গত ১১ সেপ্টেম্বর তারিখে পুরস্কার প্রাপকদের তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, প্রখ্যাত রসায়নবিদ, সিএসাইআরের (CSIR) প্রথম প্রধান অধিকর্তা, ইউজিসির (UGC) প্রথম চেয়ারম্যান শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের নামাঙ্কিত এই পুরস্কারটি দেওয়া হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাতটি ক্ষেত্রে- জীববিদ্যা, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, গণিত, মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্থ, ওশান, অ্যাটমোস্ফিয়ার এবং প্ল্যানেটারি সায়েন্সে। পুরস্কারটি দেয় কাউন্সিল অফ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (CSIR) সংস্থা।

    গবেষক এবং আইআইএসসি বেঙ্গালুরুর অধ্যাপক অনিন্দ্য দাস বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমরা কনডেন্সড ম্যাটার নিয়ে গবেষণা করি। দ্বিমাত্রিক যৌগে (গ্রাফিন, টুইস্টেড গ্রাফিন) কিছু বিশেষ ধরনের কণা খোঁজার চেষ্টা করছি বহুদিন ধরেই। যাদেরকে বলা হয় অ্যানিওন (Anyons)। এই কণাগুলির বিশেষত্ব হলো, বাইরের উদ্দীপনায় এই কণাগুলির ব্যবহারের বা গঠনের কোনও পরিবর্তন হয় না। এই কণাগুলি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং-এর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। আমরা গবেষণাগারে এই কণাগুলিকে খুঁজে পাওয়ার কৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছি।” জানালেন, তিনি বৈজ্ঞানিক গুরু হিসাবে মানেন রিচার্ড ফাইনম্যানকে। তাঁর কথায়, “আমি উচ্চশিক্ষা করার সময় ফাইনম্যানের বইগুলি থেকে অনেককিছু শিখেছি।” এই পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাইলেন নিজের বাবা-মা, শিক্ষক ও সহকর্মীদের। তাঁর আদি বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের এগরাতে। এগরা এবং কাঁথিতে স্কুলের পড়াশোনা। সেই প্রন্তিক অঞ্চল থেকে উঠে এসে এই মঞ্চে পৌঁছতে পারায় গর্বিত তিনি। তবে এও বলেন, “আমরা কাজ করি নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার, নতুন কিছু আবিষ্কার করার আনন্দে। সেটাই সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। পুরস্কার পেয়ে খুশি, তবে এর বেশি কিছু নয়।” এটি বোধহয় সব সচেতন গবেষকেরই মনের কথা। জানালেন, তাঁর এই কৃতিত্ব যদি প্রান্তিক এলাকার অন্যান্য শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করে, তবে তিনি বেশি খুশি হবেন। 

    চিকিৎসাবিজ্ঞানে পুরস্কার পেয়েছেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজির (CSIR-IICB) অধ্যাপক ও গবেষক দীপ্যমান গাঙ্গুলি। তাঁর কাজের ক্ষেত্র ইমিউনোলজি (Immunology)। “আমাদের দেহে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী ব্যবস্থা রয়েছে, যারা বাইরের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য জীবাণুর বিরুদ্ধে দেহকে সুরক্ষা দেয়। তবে কখনও কখনও বিভিন্ন কারণে সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত কার্যকর হয়ে উঠে শরীরের বিরুদ্ধেই কাজ করতে শুরু করে। ফলে দেখা দেয় বিভিন্ন অটো-ইমিউন রোগ,” বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন দীপ্যমান। তাঁদের কাজ হলো সেই অতিসক্রিয়তার কারণ খোঁজা, তাদের বিশ্লেষণ করা এবং সেইসব রোগনির্ণয়ের পদ্ধতি খোঁজা। কোভিডের সময়ে তাঁদের আবিষ্কৃত প্লাজমা থেরাপি ট্রায়াল সাফল্য লাভ করেছিল। তাঁর কথায়, “কোভিডের সময়ে অনেক রোগীর মৃত্যুর কারণ ছিল দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অতিসক্রিয়তা। সেই সময় একটি মিটিং-এ এই থেরাপির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তারপর কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে আর সহযোগিতায় এই পরীক্ষাটি সফল হয়েছিল।” তিনি এই প্রাপ্তির জন্য ধন্যবাদ জানালেন তাঁর অধীনে গবেষণারত রিসার্চ স্কলারদের। “গবেষণার অধিকাংশ কাজ তো ওঁরাই করেন, তাই ওঁদের কৃতিত্ব অনেকটাই”, বলেন দীপ্যমান। একদিকে দেশের গবেষণাক্ষেত্রে বিভিন্ন অসুবিধা, ফান্ড কমে আসা, অন্যদিকে তাঁদের এমন সব অভিনব আবিষ্কার। এই দুটো ব্যাপারকে একসঙ্গে কীভাবে দেখছেন? দীপ্যমানের জবাব, “গবেষণাখাতে এমনিতেই অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় আমাদের দেশে বরাদ্দ অনেকটা কম। এটা আমার ব্যক্তিগত মত নয়, অঙ্কের হিসাব। সেই সংক্রান্ত কিছু অসুবিধা তো রয়েইছে। আর দেশের প্রশাসনের উৎসাহ যেন কিছুটা কমেছে মৌলিক বিজ্ঞানে গবেষণার ক্ষেত্রে। সেই বিষয়গুলিতে গবেষণার সুযোগ বাড়ছে, যেগুলিতে চটজলদি বাণিজ্যিক লাভ হয়। কিন্তু মৌলিক বিজ্ঞানে গবেষণা না হলে কোনও দেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘকালীন উন্নতি করতে পারে না বলে মনে হয় আমার।” প্রসঙ্গত, গত ৬৪ বছর ধরে এই পুরস্কারের ঘোষণা হয়ে আসছে ২৬ সেপ্টেম্বর তারিখে। কিন্তু ২০২২ সালে এই পুরস্কারের ঘোষণা হয়নি। এই বছর ২৬ এর বদলে ১১ সেপ্টেম্বর পুরস্কার প্রাপকদের তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে। “এই ধরনের পুরস্কার, যার সর্বজনগ্রাহ্যতা রয়েছে এবং ইতিহাস রয়েছে, সেই পুরস্কারের ক্ষেত্রে এরকম ঘটলে বোধহয় পুরস্কারেরই খানিক সম্মানহানি হয়”, মত তাঁর। 

    পদার্থবিদ্যায় এবছর পুরস্কার প্রাপকের তালিকায় রয়েছেন টাটা ইনসটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চের (TIFR) অধ্যাপক বাসুদেব দাশগুপ্ত। তাঁর কাজের ক্ষেত্র অ্যাস্ট্রো-পার্টিকেল ফিজিক্স। “নিউট্রিনো নামে একধরনের পারমাণবিক কণা রয়েছে, যাদের কিছু অভিনব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। একধরনের তারা রয়েছে, যাদের আয়তন সূর্যের থেকে ৮-১০ গুণ বড়ো। তাদের জীবনকালের শেষে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। একে সুপারনোভা বলে। সেই সুপারনোভার মধ্যে নিউট্রিনো কণাগুলি অদ্ভুত ধরনের ব্যবহার করে। সেই সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা করে থাকি। গবেষণার আরেকটি ক্ষেত্র হলো ডার্ক ম্যাটার,” বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় জানান বাসুদেব দাশগুপ্ত। তিনি নিজের পরিবার, শিক্ষক, সহকর্মী, ছাত্রদের পাশাপাশি ধন্যবাদ জানালেন দেশের জনতাকে। কারণ তাঁদের দেওয়া ট্যাক্সের টাকাতেই চলে এইসব গবেষণার কাজ। তাঁর কথায়, “দেশের জনগণ বহুবছর ধরে মৌলিক বিজ্ঞানের বিষয়ে গবেষণায় পরোক্ষ ভূমিকা রেখে আসছেন। তাই তাঁদের আলাদা করে ধন্যবাদ জানাতে চাই।”

    এছাড়াও রসায়ন বিভাগে পুরস্কৃত হতে চলেছেন আইআইটি বম্বের (IIT Bombay) অধ্যাপক দেবব্রত মাইতি। বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের এই প্রাক্তণী, আপাতদৃষ্টিতে কম গুরুত্বপূর্ণ অণু থেকে বাণিজ্যিকক্ষেত্রে এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে দরকারি রাসায়নিক তৈরির ক্ষেত্রটিতে গবেষণা করেন। সেই কাজে ব্যবহৃত হয় আলোকশক্তি, এনজাইম, ধাতু প্রভৃতি। তিনি বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “কার্বন আর হাইড্রোজেন পরমাণু পরস্পর যুক্ত হয়ে জৈব অণুর প্রাথমিক গঠন তৈরি করে। হাইড্রোজেন পরমাণু সরিয়ে অন্য পরমাণু জুড়ে দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে বিভিন্ন ঔষধি, অ্যাগ্রোকেমিক্যালস, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত নানান সামগ্রী। বিপাকক্রিয়া চলাকালীন উৎসেচকগুলি সহজেই এই কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ড ভেঙে ফেলতে পারে। সেই রীতিকে গবেষণাগারে অনুসরণ করে তৈরি করা যেতে পারে ঔষধি, কীটনাশক ইত্যাদি প্রয়োজনীয় দ্রব্য। সেই লক্ষ্যেই কাজ করি আমরা।” তিনি ধন্যবাদ দিলেন নিজের বাবা-মা, পরিবার, সহকর্মী এবং ছাত্রদের। তিনি আরও বলেন, “আই আই টি বম্বেতে গবেষণার খুবই ভালো সুযোগ রয়েছে। কর্তৃপক্ষও সবসময় সাহায্য করেন। সেইজন্য এই পুরস্কারের পিছনে তাঁদেরও অবদান রয়েছে।” এই নামগুলিই গোটা দেশের কাছে আরেকবার প্রমাণ করল বাঙালিদের দক্ষতাকে।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @