আজও পাঠককে বিকল্প ভাবনার দিশা দেখাচ্ছে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি

সেই উত্তাল সত্তর দশকের গল্প। বিপ্লবের স্বপ্ন নকশালবাড়ি থেকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়িয়ে ভারতের প্রত্যন্ত সব অঞ্চলে পৌঁছে গিয়ে মানুষকে সমাজ বদলের আশা জোগাচ্ছে। তখন সমস্ত কলকাতা জুড়ে ত্রাসের আবহাওয়া। এরই মধ্যে এক কলেজ পড়ুয়া যুবক অন্য এক বদলের রোমাঞ্চ নিয়ে তার স্বপ্নের চারাগাছ রোপণ করলেন। বন্দুকের নল, বেয়নেট কিংবা বুলেট নয়, কাগজ-কালি-কলমকেই তিনি হাতিয়ার করেছিলেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে সেই চারাগাছ এখন মহীরুহ। এখন সেই বিশাল বটবৃক্ষ সুধীমহলে পরিচিত ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র’ নামে। দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তার খ্যাতি। অবশ্য শুরুর দিনগুলো কিন্তু এতটা মসৃণ ছিল না।
তখন ১৯৭২ সাল। স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র সন্দীপ দত্ত ভারতের জাতীয় গ্রন্থাগারে গিয়েছিলেন কিছু পত্রপত্রিকার সন্ধানে। সেখানে তিনি দেখলেন, চূড়ান্ত অযত্নে বহু পত্রপত্রিকা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগই নেই। কলকাতার সবথেকে বড়ো লাইব্রেরির এরকম দশা তাঁর মনে বড়ো রকমের আঘাত দিয়েছিল। তিনি নিজের ব্যক্তিগত সাধ্যে একটি লাইব্রেরি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তখন, যেখানে বাংলা পত্রপত্রিকা সংরক্ষণ এবং পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা থাকবে। ওই বছরই সেপ্টেম্বর মাসের ২৭ থেকে ৩০ তারিখ নিজের বাড়িতেই এক প্রদর্শনের আয়োজন করেন তিনি। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহের ৭৫০টি পত্রিকা দেখে চমকিত হন অনেকেই। এভাবেই শুরু হয়েছিল লাইব্রেরির সলতে পাকানোর কাজ। এরপর থেকে বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে টেবিলে নিজের সংগ্রহের পত্র-পত্রিকা সাজিয়ে হাজির থাকতেন সন্দীপ দত্ত। পাশাপাশি ১৯৭৬ সালের কলকাতা বইমেলাতে অংশ নিলেন।
অবশেষে ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন প্রায় দেড় হাজার পত্রিকা নিয়ে সন্দীপ দত্ত নিজের পৈত্রিক বাড়ির একতলায় চালু করলেন ‘বাংলা সাময়িকপত্র পাঠাগার এবং গবেষণাকেন্দ্র’। তারপর ধীরে ধীরে পত্র-পত্রিকা-লিটল ম্যাগাজিনের সংগ্রহ আরও বেড়েছে। স্থান পেয়েছে প্রচুর অমূল্য এবং দুষ্প্রাপ্য বই। বাংলা ছাড়াও ইংরেজি, হিন্দি ভাষার সাহিত্যও রয়েছে সেখানে। বাংলার নানা সাহিত্য আন্দোলনের ইশতেহার, বুলেটিন, মুখপত্র, হারিয়ে যাওয়া অসামান্য সব সাময়িকপত্র এবং লিটল ম্যাগাজিনের আশ্চর্য সংগ্রহ দেখে অবাক হতে হয়। সাধারণ পাঠকের জন্য এই লাইব্রেরি সদস্যপদ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় ১৯৭৯ সালে। আর ১৯৯৬ সালে আইনি পদ্ধতিতে এই প্রতিষ্ঠানকে নথিভুক্ত করা হয়, এবং নতুন করে নাম দেওয়া হয় ‘কলিকাতা লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র’।
আরও পড়ুন
লিটল ম্যাগাজিনের জন্যই বেঁচে থাকা যাঁদের
আগামী ২৩ জুন রবিবার এই লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ৪২ বছরে পা দেবে। সেই উপলক্ষ্যে সেদিন বিকেল সাড়ে পাঁচটায় মহাবোধি সোসাইটি সভাঘরে প্রতিষ্ঠা দিবস অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে সঙ্গে লাইব্রেরির তরফ থেকে ঘোষণা করা হবে এবছরের লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার, গবেষক সম্মাননা, সারস্বত সম্মাননা, ছোটগল্পকার সম্মাননা প্রাপকদের নাম। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী।
ছবিসূত্র - ফেসবুক