ইস্টবেঙ্গলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন ‘মোহনবাগান রত্ন’ গোষ্ঠ পাল

নতুন ক্লাব তৈরি হয়ে গেছে ১ আগস্ট। কিন্তু সেই ক্লাবকে পরিচিতি পেতে গেলে তো কোনো একটা প্রতিযোগিতায় খেলতেই হবে। এদিকে আগস্ট মাসে কলকাতার ফুটবল মরশুম অনেকটাই এগিয়ে গেছে। ময়দানে চলছে লিগের খেলা। সেখানে মাঝপথে সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাই নেই। অন্যান্য ছোট প্রতিযোগিতাও শেষ হওয়ার মুখে। এদিকে নতুন তৈরি হওয়া দল এক বছর বসে থাকবে, সে হয় নাকি!
হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ছিলেন না ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সুরেশ চৌধুরী। তিনি আর রায়বাহাদুর তড়িৎভূষণ রায় ক্লাবের যুগ্ম-সম্পাদক। নতুন ক্লাবে তাঁরা জড়ো করেছেন কলকাতার বিভিন্ন দলে খেলা পূর্ববঙ্গের নামি খেলোয়াড়দের। কলকাতার নানা ক্লাবে পূর্ববঙ্গের খেলোয়াররা প্রকৃত সম্মান পান না বলেই তো নতুন ক্লাব গড়ার সিদ্ধান্ত। কেবল পূর্ববঙ্গের মানুষ বলেই নাকি জোড়াবাগান ক্লাব মোহনবাগানের সঙ্গে খেলায় বসিয়ে দিয়েছিল শৈলেশ বসুর মতো দক্ষ খেলোয়ারকে। ময়মনসিংহ জেলার নাগপুর গ্রামের জমিদার সুরেশ চৌধুরী এরই প্রতিবাদে ছেড়ে দিয়েছিলেন জোড়াবাগান ক্লাবের সহ-সভাপতির পদ। ঠিক করেছিলেন নতুন দল গড়বেন। তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন অনেক নামকরা, অর্থবান মানুষও। নতুন ক্লাবের নাম হল ‘ইস্টবেঙ্গল’। সেই নামের সঙ্গে মিশে থাকা ভূখণ্ডের আবেগটাও কোথাও কাজ করে গেছিল।
কিন্তু সদ্য জন্ম নেওয়া সেই ক্লাবকে তো কোনো প্রতিযোগিতায় খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। খোঁজ শুরু হল। এমন সময় তড়িৎবাবু খবর পেলেন, শ্যাম পার্কে হারকিউলিস কাপের খেলা হচ্ছে। একটাই সমস্যা, এই প্রতিযোগিতায় এগারো জনের গোটা দল নামানো যাবে না। কারণ, এটা ছ’জনের দলের টুর্নামেন্ট। প্রতি দলে মাত্র ছ’জন করে খেলোয়ার থাকবে। তখন আর বাছাবাছির সুযোগ নেই। তড়িৎবাবু এই টুর্নামেন্টেই ইস্টবেঙ্গলের নাম দিয়ে দিলেন। দল মাঠে তো নামুক। তাছাড়া, অনেকগুলো নামকরা দল আর ফৌজি দলও অংশ নিয়েছিল হারকিউলিস কাপে। গোটা দলের সবাই যাতে কম-বেশি খেলতে পারে, তাই ইস্টবেঙ্গলের দুটি টিম নাম দিল টুর্নামেন্টে—‘এ’ আর ‘বি’ টিম।
ক্লাব টুর্নামেন্টে নামছে, এদিকে টিমের জার্সিই ঠিক হয়নি। সুরেশবাবু জার্সির খোঁজে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরছেন হন্যে হয়ে। চৌরঙ্গীতে সাহেবদের একাধিক দোকান। কোনো জার্সিই পছন্দ হয় না। সব কেমন ম্যাড়ম্যাড়ে। সুরেশবাবু চাইছিলেন এমন এক জার্সি, যা চোখ ধাঁধিয়ে দেবে। যে অপমান, অবহেলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে তাঁদের নতুন ক্লাবের জন্ম, সেই প্রতিবাদের তেজটা যেন জার্সিতে থাকে। এমন এক জার্সি যা দেখে সকলের ভালোও লাগবে। যাতে প্রাণ আছে।
শেষ পর্যন্ত, এমন এক সেট জার্সির খোঁজ মিলল হোয়াইটওয়ে লেইডলে-র রাজকীয় বিপণীতে। লাল আর হলুদ রঙের উজ্জ্বল জার্সি। এই জার্সি পরে নামলে অনেক দূর থেকেও চেনা যাবে ইস্টবেঙ্গলের খেলোয়ারদের। তাছাড়া, জার্সিটায় যেন আগুন আছে। সুরেশবাবুর পছন্দ হল খুব। সুযোগ বুঝে দোকানিও চড়া দাম হাঁকল। ৮০ টাকা! সেই যুগে এর অর্ধেকের কম দামেই এক সেট বিলিতি জার্সি হয়ে যেত। তাতে কী! সুরেশবাবুর জমিদারি রক্ত। টাকা নিয়ে মাথা ঘামানোর রুচি তাঁর নেই। তাছাড়া, তার প্রাণের নতুন ক্লাবের জার্সি। সামান্য ক’টা টাকার জন্য এই জার্সি নিয়ে দরদাম করে আবেগটা মাটি করতে চান না তিনি। টাকা ফেলে দিয়ে নতুন জার্সি নিয়ে তিনি ফিরলেন ক্লাবে।
এরপর, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রথমবারের জন্য মাঠে নামল ইস্টবেঙ্গল দল। সেমিফাইনালে তাদের ‘এ’ আর ‘বি’ টিম মুখোমুখি হল। ‘বি’ টিম সরে দাঁড়ানোয় ‘এ’ টিম উঠল ফাইনালে। তারপর, ১৯২০ সালের ১৩ আগস্ট অমৃতবাজার পত্রিকায় খবর বেরোল—“হারকিউলিস কাপে ইস্টবেঙ্গলের জয়লাভ”। বিদ্যাসাগর কলেজকে ৪-০ গোলে হারিয়ে দিয়ে প্রথম টুর্নামেন্টই জিতে নিল ইস্টবেঙ্গল। সেই দলে খেলেছিলেন নগেন কালী, নসা সেন (অধিনায়ক), ভোলা সেন, প্রশান্ত বর্ধন, শৈলেন বসু এবং চারু বসু। কিন্তু একজনের নামের উল্লেখ অমৃতবাজার পত্রিকায় ছিল না। এমন একজন, যাঁকে বলা হয় ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম প্রথম কিংবদন্তি। যাঁর খালি পায়ের পাথুরে ট্যাকেলে মাথা পর্যন্ত ঝনঝন করে উঠত গোরা খেলোয়ারদেরও। যাঁকে ভারতের সর্বকালের সেরা ব্যাক বলা হয় আজো। ভারতের জাতীয় দলের অধিনায়কত্বও করেছেন মানুষটি। তাছাড়া, মোহনবাগানের রত্ন হিসেবেই তাঁকে মনে রেখেছেন বাংলার ফুটবলপ্রেমীরা। অথচ, সেই মানুষটি যুক্ত ছিলেন ইস্টবেঙ্গলের প্রথম দলের সঙ্গেও। মানুষটির নাম গোষ্ঠ পাল।গোষ্ঠ পাল ছিলেন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরের মানুষ। মোহনবাগানে খেলতেন রাইট ব্যাক পজিশনে। তখনকার দিনে তাঁর মতো ময়দান কাঁপানো ব্যাক আর কেউ ছিলেন না। সুরেশবাবু খুবই পছন্দ করতেন তাঁকে। একদিন তাঁকে প্রস্তাব দিলেন ইস্টবেঙ্গলে খেলার। শুধু খেলোয়ার হিসবে নয়, তাঁকে তিনি অধিনায়ক হিসেবেই বরণ করে নিতে চান টিমে। সেই প্রস্তাবে না করতে পারেননি গোষ্ঠ পাল। ইস্টবেঙ্গলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন তিনিই।
আরও পড়ুন: ভারতের মাটিতে বিশ্বকাপ হতে পারত অনেক আগেই
কিন্তু, ইস্টবেঙ্গলের প্রথম ট্রফি-জয়ের যে খবর বেরিয়েছিল অমৃতবাজার পত্রিকায়, কোনো এক আশ্চর্য কারণে সেখানে নাম ছিল না গোষ্ঠ পালের। পরের বছর ফের মোহনবাগানে ফিরে গেলেন তিনি। ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে তাঁর খেলোয়ার জীবনের সম্পর্ক বড়োই সংক্ষিপ্ত, অথচ ঐতিহাসিক।
তখনো ইস্টবেঙ্গল বড়ো ক্লাব হয়নি। মোহনবাগান ক্লাবের নাম ও মর্যাদা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকে বলেন, হারকিউলাস কাপের জন্যই নাকি গোষ্ঠ পালকে মোহনবাগান থেকে ধার করে এনেছিলেন সুরেশবাবু। হয়তো তাই সত্যি। নাহলে, এটাই হয়তো হত এই দুই ক্লাবের ভিতরে প্রথম হাই ভোল্টেজ দলবদল।
ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের মতোই গোষ্ঠপালের সেই ‘দলবদল’-ও কিন্তু একশো বছরে পা দিল।
তথ্যঋণ: ‘ক্লাবের নাম ইস্টবেঙ্গল’, শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়