No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাঙালির প্রথম বৈদ্যুতিক পাখার কোম্পানি শুরু করেছিলেন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী  

    বাঙালির প্রথম বৈদ্যুতিক পাখার কোম্পানি শুরু করেছিলেন এক স্বাধীনতা সংগ্রামী  

    Story image

    নতুন হাওয়া তৈরির কারিগর তিনি। নাম ক্ষীরোদবিহারী চক্রবর্তী। এ শহরে হাওয়া এমনিতে বেশ কম। হাওয়ার জন্যই পাংখাকুলি নিয়োগ। তবু তা অচলই। তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাওয়া সে দেয় না। তা অচল-হাওয়ার এই দেশে সচল বায়ু এনে একেবারে তাজ্জব করে দিয়েছিলেন ক্ষীরোদবিহারী। হাতে টেনে নয় – বিদ্যুতে সেই হাওয়া চলেছিল সনসন বেগে। তাতে জন্ম হয়েছিল ক্লাইড কোম্পানি। বাঙালির তৈরি কলকাতার প্রথম বৈদ্যুতিক পাখার কোম্পানি। 

    কলকাতার এলিট সিনেমা। তারই পাশে হিন্দুস্থান ইন্সিওরেন্স কোম্পানির বিশাল অফিস। আর তারই এক কোণে ‘ক্লাইড এঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড’। ১৯১৯ সালে এই কোম্পানির তৈরি ফ্যান প্রথম হাওয়া এনেছিল কলকাতায়। ক্ষীরোদবিহারীকে এই কোম্পানি গড়তে সাহায্য করেছিলেন ময়মনসিংহের মহারাজা রাজেন্দ্রকিশোর, পাইকপাড়ার কুমার অরুণ সিংহ প্রমুখ ধনী ব্যক্তিরা। সে এক অদ্ভুত সময় বটে। নানাদিকে নানান জন ব্যস্ত। নতুন কিছু বানাতে তারা উঠেপড়ে লেগেছে। তাতে সাফল্যও মিলছে দ্রুত। ক্ষীরোদবিহারী ছিলেন আজন্ম ব্রিটিশ-বিরোধী। পূর্ব বাংলার নারায়ণগঞ্জের বন্দর গ্রামে ছিল তাঁর বাড়ি। জলপাইগুড়িতে স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন তিনি। কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্সে উচ্চশিক্ষা লাভ করার সময় তাঁর সেই কার্যকলাপ আরো দৃঢ় হয়। পুলিশ ধাওয়া করা শুরু করে। অগত্যা দেশ ছেড়ে পালান তিনি। একটি কার্গো জাহাজে পে-মাস্টারের চাকরি নেন। সেখানে ইলেকট্রিকের কারিগরদের সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়। সেখান থেকেই চটপট ওয়ারিং, ফ্যান মেরামতি ইত্যাদি কাজ শিখে ফেলেন। তারপর সঞ্চিত অর্থে কলকাতা ফেরেন। ১৯১৮-তেই ইলেকট্রিক ফ্যানের কারখানার জন্ম।

    ক্লাইড কোম্পানি অন্যান্য বিদেশি কোম্পানিকে বেশ বিপাকে ফেলে দেয়। চাহিদা বাড়ে, উৎপাদনও। তাই বকুল বাগান রোডে তৈরি হয় অ্যাপ্রেনটিস ট্রেনিং স্কুল। ছেলেরা তো ট্রেনিং নিতই সেখানে।পরবর্তীতে মেয়েরাও আর্মেচারে তার জড়ানোর মতো সূক্ষ্মকাজ শিখে ফেলতে থাকে। বাঙালি যুবকের তৈরি স্বদেশি যুগের হাওয়ায় তখন দেশবাসী মজে তখন। কিন্তু পরপর যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অবক্ষয় ছাপ ফেলে ক্লাইড কোম্পানিতে। দেনার দায়ে কোম্পানি বিক্রি হয়ে যায়। 

    তবে এ গল্প আনন্দের। শুধু ভেঙে পড়ার নয়। ক্ষীরোদবিহারি ক্লাইড কোম্পানি হারিয়ে তৈরি করে ফেলেন ‘ক্যালকাটা ফ্যান’। স্বাধীন ভারতেও এই হাওয়া ছিল। ১৯৩২ সালে তিনি হিন্দুস্তান পার্কের একটি জমিতে তৈরি করেন নিজস্ব ফ্যান তৈরির কারখানা। ফের এটার সঙ্গেও তৈরি করেন ফ্যান তৈরির পাঠশালা। অনেক ঝড়ঝাপটার পরেও ক্যালকাটা ফ্যান চলেছিল ঢের ঢের বছর। 

    চিরকাল কোনোকিছুই স্থায়ী হয় না। আয়ু ফুরোয়। কিন্তু ক্ষীরোদবিহারির নিরলস প্রচেষ্টা সত্যিই আশ্চর্য করে দেয়। ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় ফ্যান কোম্পানির বিশাল বাজারে যেভাবে সে টিকে ছিল তা শেখার মতোই। বারবার তিনি সব হারিয়েছেন। আর বারবারই উঠে এসেছেন নতুন কিছু করার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে। ইংরেজদের দূরে ঠেলে বাংলাকে নতুন আলো দেখিয়েছিলেন তিনি। তা শুধু ব্যক্তিগত তাগিদে নয়। দেশ গড়ার প্রবল প্রেরণায়। 

    বাঙালি ব্যবসায়ীদের ইতিহাস নিশ্চয়ই লেখা হবে একদিন। সেদিন ক্ষীরোদবিহারীর অবদান নিশ্চিত অনেক বড়ো করে লেখা থাকবে।
     

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @