‘ছোটি সি বাত’ মোটেই ছোটো কথা নয়, সিনেমায় বুঝিয়েছিলেন বাসু চ্যাটার্জি

১৯৬৯ সাল, একই বছর মনি কাউল বানালেন ‘উসকি রোটি’, মৃণাল সেন বানালেন ‘ভুবন সোম’ আর বাসু চ্যাটার্জি বানালেন ‘সারা আকাশ’ (এই ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মনি কাউল)। অনভ্যস্ত ভাষার জন্ম হয় ভারতীয় চলচ্চিত্রে, আসে নব তরঙ্গ, নতুন ভোর; যাকে বলে ‘ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ’, অসংগঠিত ভাবে গড়ে ওঠা এই নতুন ভাষার ছবিগুলির আত্মপ্রকাশকে চলচ্চিত্র ঐতিহাসিক ও সমালোচকরা এই নামেই সংজ্ঞায়িত করেছিলেন। সেসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ভাষায় পরিচালকেরা চলচ্চিত্র নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু করেন। আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে বহু ছবি দর্শকের কাছে নতুন বার্তা এনে দেয়।
মনি কাউল, মৃণাল সেন পর্দায় যেভাবে নিজেদের কথা বলতেন, বাসু চ্যাটার্জির ধরন ছিল তার থেকে আলাদা। তবে, তাঁরা তিনজনই ছিলেন নিজেদের সময়ের কথক। বাসু চ্যাটার্জি দেখাতে চেয়েছিলেন মধ্যবিত্ত মন, ধরতে চেয়েছিলেন মধ্যবিত্ত ভারতের আশা আকাঙ্ক্ষাকে। তাঁকে সমালোচকরা বলতেন ‘ফ্যামিলি-ম্যান’, কারণ তাঁর ছবির বুনটে থাকত পারিবারিক মেলোড্রামা। কাউল, কুমার শাহানি, বাসু ভট্টাচার্য(তিসরি কসম-এ চ্যাটার্জি ওঁর সহকারি ছিলেন) –এঁরা ছিলেন চ্যাটার্জি’র ‘ক্রিয়েটিভ কমরেডস’, শেষ পর্যন্ত যাঁরা বন্ধু হয়ে থেকে গিয়েছিলেন। ভারতীয় জনবিন্যাসের নিজস্ব অহংকার ও সত্ত্বা তৈরি করেছিলেন তিনি। তাঁর বাংলা ছবিগুলো বেশি বাস্তববাদী বলে মনে করেন অনেক চলচ্চিত্র সমালোচক। মাতৃভাষায় হঠাৎ বৃষ্টি, হচ্ছেটা কী, হঠাৎ সেইদিন-এর মতো ছবি পরিচালনা করেছেন বাসু চট্টোপাধ্যায়।
‘দিওয়ার’-এ যে রাগী লোকটি গুদাম ভর্তি গুণ্ডা পেটায়, সে আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে, কিন্তু ‘মঞ্জিল’ ছবির ওই যুবকটির সঙ্গে আমরা পরিচিত। একদিকে অমিতাভ যখন অন্যান্য ছবিতে বেদম মারপিট করছেন, রেগে যাচ্ছেন, অন্যদিকে চ্যাটার্জি’র ছবিতে সেই অমিতাভই এক বৃষ্টির দিনে স্যুট-টাই পরে মুম্বইয়ের রাস্তায় মৌসুমি (চ্যাটার্জি)-র হাত ধরে হাঁটছেন আর ‘রিমঝিম গিরে শাওন’ গানে মুদ্ধ করেছেন দর্শকদের।
“ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ-এ যে ছবিগুলো পিলার হিসেবে ধরা হয়, তার মধ্যে ‘সারা আকাশ’ তো একটা প্রাইমারি ছবি। ফর্ম, এক্সপেরিমেন্ট, ভাষা সবমিলিয়ে বাসু চ্যাটার্জি উল্লেখযোগ্য। ”
মুম্বইয়ের ওই বৃষ্টির দিনে কেন কেউ থ্রি পিস পরে হাঁটবেন, গান গাইবেন –এর উত্তর দর্শকদেরই খুঁজে বের করতে হবে। চ্যাটার্জির ছবিতে নিজেদের মত কাউকে বড়ো পর্দায় চিনতে পারার অনুভুতি, যে রোজ প্রতিদিন বাস-ট্রামে ওঠার ঝক্কি সামলায় এবং কর্মক্ষেত্রে ‘বস’ আর ধূর্ত সহকর্মীদের কাছে ঠোক্কর খায়, তেমনই জ্যান্ত চরিত্রে রূপদান করেছিলেন অমল পালেকর। বাসু ও অমল জুটি জীবনের সেরা কাজগুলো করেছিলেন একসঙ্গে, রজনীগন্ধা (১৯৭৪), চিতচোর (১৯৭৬) ও বাতোঁ বাতোঁ মে (১৯৭৯)। মূলস্রোতের গা ঘেঁষে তাঁর ছবি এভাবেই নিজস্ব ‘আইডেন্টিটি’ তৈরি করতে পেরেছিল। যদিও, চ্যাটার্জি নিজেই তাঁর সিনেমাকে বলতেন ‘মিডল-অফ-দ্য রোড সিনেমা’।
“ইন্ডিয়ান নিউ ওয়েভ-এ যে ছবিগুলো পিলার হিসেবে ধরা হয়, তার মধ্যে ‘সারা আকাশ’ তো একটা প্রাইমারি ছবি। ফর্ম, এক্সপেরিমেন্ট, ভাষা সবমিলিয়ে বাসু চ্যাটার্জি উল্লেখযোগ্য। মেইনস্ট্রিম আর অল্টারনেটিভ, সাধারণত এই দুটো ভাগেই পরিচালকদের ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বাসু চ্যাটার্জি এই বিভাজনে বেঁধে রাখেননি নিজেকে – নিজস্ব ভাষা তৈরি করেছিলেন। এছাড়াও যেটা বলার যে, এঁরা নিজেদের ছবিতে সেইসময়কার কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল, সমাজ, জীবনযাত্রা, রাজনীতি সবকিছুই আর্কাইভ করে গিয়েছেন। সেটা আমাদের সিনেমার ইতিহাসকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করে। সিনেমা তো আর প্যাকেটজাত আলুভাজা নয় যে, এখনকারটা খেতে ভালো তাই আগেরটা খাবো না! নতুন প্রজন্ম বা আগামী প্রজন্মের জন্যেও তাই বাসু চ্যাটার্জি একইভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবেন।” বলছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র অধ্যাপক-পরিচালক মধুজা মুখোপাধ্যায়।
২০২০, ৪ জুন ভারতীয় চলচ্চিত্র হারিয়েছে বাসু চ্যাটার্জির মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক-চিত্রনাট্যকারকে। ১০ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন। ২৬ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব(২০২১)-এ তাঁকে বিশেষ সম্মান জানানো হয়েছিল। প্রদর্শিত হয়েছিল তাঁর ছবি ‘ছোটি সি বাত’। আর ‘ছোটি সি বাত’ যে মোটেই ছোটো কথা নয়, আজীবন কলমে-ক্যামেরায় সেটাই ধরে রাখার কাজ করে গিয়েছেন বাসু চ্যাটার্জি।