মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’ : একটি প্রয়াণ তিথি হয়ে উঠল অতি সাধারণ নর-নারীর মিলনতিথি

সময়: ‘আজকের দিন’, অর্থাৎ বর্তমান। মানবসভ্যতার ইতিহাস বলে, না অতীত, না ভবিষ্যৎ, শুধু এই মুহূর্তটুকুই নিশ্চিত করে আমাদের অস্তিত্ব বা ক্ষণস্থায়ীত্বকে। এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে প্রেমই বোধহয় সাহস জোগায়। বলে, “পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে”। অধ্যাপক ও চলচ্চিত্র-সমালোচক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ থেকে ধার করে বলতে হয়, “সময়ের সঙ্গে এত তীব্র সহবাস, নিজের সময়ের ঠোঁটে এরকম চুম্বনের দাগ আর কেউই রেখে যাননি। না সত্যজিৎ, না ঋত্বিক। তাঁরা মহাকাব্যপ্রণেতা হতে পারেন কিন্তু হয়তো ইস্তেহার লেখার দায়, স্বেচ্ছায় ও সানন্দে, মৃণাল সেন নিয়েছিলেন।” তাই তো কোনোরকম ভণিতা ছাড়াই নান্দনিকতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পেরেছিলেন দৈনন্দিনতাকে। এই ‘ক্ষুধার নন্দনতত্ত্ব’ই ছুঁতে পেরেছিলো নিবিড়ভাবে মধ্যবিত্বের বারোমাস্যা, ঠিক যেমনভাবে নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে ছুঁয়েছিল সমসাময়িক তৃতীয় বিশ্বের অর্থাৎ আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ‘ইম্পারফেক্ট সিনেমা’। সোলানাসের ‘দি আওয়ার অফ দ্য ফার্নেসেস’ (১৯৬৮), আলেয়ার ‘মেমোরিজ অফ্ আন্ডারডেভেলপমেন্ট’ (১৯৬৮) বা সেমবেনের ‘হালা’ (১৯৭৫)-র বাস্তবতার সঙ্গে সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায় মৃণাল সেনের ‘ইন্টারভিউ’ (১৯৭০), ‘কলকাতা একাত্তর’ (১৯৭২), ‘পদাতিক’ (১৯৭৩), ‘কোরাস’ (১৯৭৪)-এর মতো ছবিগুলিতে; নয়া-উপনিবেশবাদের সঙ্গে মধ্যবিত্তের সংঘর্ষ যার বিষয়বস্তু এবং বামপন্থার সঙ্গে অন্তহীন সংলাপ যার তাত্ত্বিক সংশ্লেষ। তাই ইতিহাসের তটে গেঁথে থাকা ঝিনুকের দু-ডালার মাঝে সময়ের সুক্তিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকবেন চলচ্চিত্র নির্মাতা ও তাত্ত্বিক মৃণাল সেন।
স্ব-বিরোধ এবং ক্রমাগত নিজেকে আমূলভাবে ভাঙার পরীক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ মৃণাল সেনের শুরুটা সত্যজিতের মতো ঐতিহাসিক বা অভিজাত ছিল না একেবারেই। নিতান্ত সাধারণ হতে গিয়েও অসাধারণ হয়ে ওঠার রহস্য বোধহয় জীবনের প্রতি আপোষহীন, অকপট ভালোবাসা। তাই তাঁর ছবির প্রেক্ষাপট রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক হলেও চরিত্ররা কিন্তু কেউই অসাধারণ নন, ছাপোষা মধ্যবিত্ত। সময়ের ঢেউয়ে নাগরিক মধ্যবিত্তের উত্থান-পতন এবং পরিস্থিতির সঙ্গে রসায়নই তাঁর সৃষ্টিকে কালজয়ী করে তুলেছে। তবে এই লেখাটির বিষয় মৃণাল সেনের বহুলভাবে আলোচিত ও উদযাপিত ছবিগুলি নিয়ে নয়, চলচ্চিত্র পরিচালক ‘মৃণাল সেন’ হয়ে ওঠার একেবারে শুরুর দিকে যে ছবিটি তাঁকে প্রথম আন্তর্জাতিক খ্যাতি এবং অদম্য আত্মবিশ্বাস এনে দিয়েছিল এটি সেই ছবি: চিদানন্দ দাশগুপ্তের কাহিনি অবলম্বনে নির্মিত ‘বাইশে শ্রাবণ’ (১৯৬০) মৃণাল সেনের তৃতীয় ছবি (‘রাত-ভোর’ এবং ‘নীল আকাশের নীচে’র পর)।
পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘বাইশে শ্রাবণ’ সেই অর্থে কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, ইতিহাস এখানে অনুঘটকের কাজ করেছে মাত্র। ব্যক্তি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের রসায়ন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অপরিহার্য মানবতাবাদই এই ছবির মূল উপজীব্য। লোকাল ট্রেনের ফেরিওয়ালা মাঝবয়সী ও সাদামাঠা চেহারার প্রিয়নাথ (জ্ঞানেশ মুখার্জি) তার অতি বৃদ্ধ ও বিধবা মায়ের অনুরোধে এবং নিজের একাকিত্ব ঘোচাতে বিয়ে করে আনে অত্যন্ত কম বয়সী সুন্দরী তরুণী মালতী (মাধবী মুখোপাধ্যায়)-কে। প্রিয়নাথের ভালোবাসা ও পরম যত্নে এই অসমবয়সী দাম্পত্য সুখী হয়। সেনের ছবিতে প্রিয়নাথ-মালতীর এই ছক ভাঙা রোমান্স এক স্মরণীয় মুহূর্ত বৈকি! কিন্তু আকস্মিক এক দুর্ঘটনায় মাকে হারানোর শোকে বিহ্বল এবং বয়সের ভারে কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় পিছু হঠতে থাকা প্রিয়নাথ যখন আরেক আকস্মিক দুর্ঘটনায় নিজের একটি পা খুইয়ে কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে থাকে, ঠিক তখনই সুগ্রীব দোসর হয়ে আসে মন্বন্তর। অনাহার এবং অবসাদে উবে যায় প্রণয়, মানবাত্মার অন্ধকার কুঠুরির দানবটি তার হিংস্র দাঁত-নখ নিয়ে বেরিয়ে আসে। নিতান্তই স্বার্থপর হয়ে ওঠে সে। তিনদিন অনাহারে থাকার পর প্রিয়নাথ একটু চাল জোগাড় করে আনে কোনোমতে। ভাত রেঁধে মালতী একটু একটু করে প্রায় সবটুকুই তুলে দেয় প্রিয়নাথের পাতে। গোগ্রাসে গিলতে থাকা দানবীয় খিদে লক্ষ্য করতে ভুলে যায় একদা প্রেয়সী মালতীর জন্য কিছু ভাত অবশিষ্ট রইলো কিনা। স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকা নীরব মালতীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বোধহয় ক্ষোভ আর ঘেন্না ছাড়া আর কিছুই ছিল না। তাই তো যেটুকু ভাত হাঁড়ির তলায় পড়েছিল সেটুকু পাতে নিয়েও মুখে ওঠেনি তার; আবার হাঁড়িতে নামিয়ে দিয়ে জল দিয়ে রেখে দেয় প্রিয়নাথের জন্য। অনাহার নয়, দারিদ্র্যও নয়, প্রিয়নাথের এই বদলে যাওয়া, এই স্বার্থপর হয়ে ওঠাই ব্যথিত করে মালতীকে। স্বামীর থেকে কিছু না পাওয়া মালতীর আফশোস এক বিশেষ মুহূর্তে প্রকাশ পায় চরম সত্য হয়ে। এই সত্যের উপলব্ধিই তাকে নিঃসঙ্গ করে, হতাশ করে, ঠেলে দেয় আত্মহত্যার পথে।
পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘বাইশে শ্রাবণ’ সেই অর্থে কোনো ঐতিহাসিক দলিল নয়, ইতিহাস এখানে অনুঘটকের কাজ করেছে মাত্র। ব্যক্তি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের রসায়ন, সংকটকালীন পরিস্থিতিতে মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং অপরিহার্য মানবতাবাদই এই ছবির মূল উপজীব্য।
“এমন অনেক মালতী আছে বাংলাদেশে/ তারা সবাই সামান্য মেয়ে।” – রবীন্দ্রনাথের এমনই এক ‘সাধারণ মেয়ে’ই তো মৃণালের নায়িকা। কী-ই বা তার চাওয়া পাওয়া জীবনের কাছে? স্বামী-সুখ, সন্তান আর দুবেলা দুমুঠো ভাত ছাড়া! অথচ এই ন্যূনতম না-পাওয়ার বাস্তবতাও তুচ্ছ মনে হয় মানবাত্মার অন্ধকারতম দিকের উন্মোচনে- ভালোবাসার মৃত্যুতে। প্রিয়নাথের নিষ্ঠুরতা জন্ম দেয় মালতীর নিষ্ঠুরতাকেও। আগাগোড়া আপোষ করে আসা ক্ষুদ্র প্রাণ শেষ পর্যন্ত আপোষহীন হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের ফসল হিসেবে দুর্ভিক্ষ ও যুদ্ধের ইতিহাস বিস্তৃত হয় মালতী-প্রিয়নাথের রান্নাঘরেও। ইতিহাসের দুর্বিপাক স্পর্শ করে পারিবারিক বিপর্যয়কে।
মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ রবীন্দ্রনাথ নেই, তাঁর প্রয়াণ তিথিটুকু সুপরিকল্পিতভাবে হয়ে উঠেছে পল্লী বাংলার অতি সাধারণ দুই নর-নারীর মিলন তিথি। এখানেই ঘটে যায় এক বিপ্লব। সাধারণের অধরা রবি ঠাকুর সমাজ-সংস্কৃতির সমস্ত অর্থহীন আভিজাত্যের ট্যাবুকে ভেঙে কোথায় কোন এঁদো গাঁয়ের অজ্ঞাতকুলশীল নর-নারীর বিবাহের সানাই বাজিয়ে দেন তাঁরই মৃত্যুদিনে। এভাবেই কোনো জাতীয় বিপর্যয় যে অত্যন্ত তুচ্ছ হয়ে যেতে পারে কারও অস্তিত্বে, তাতে কী-ই বা আসে যায় ইতিহাসের! জীবন-বাস্তবতার এই অকপট অনুভবই ‘বাইশে শ্রাবণ’-কে সেন্সরবোর্ডর চরম আপত্তি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ‘তেইশে শ্রাবণ’ হতে দেয়নি। “Hunger... is simply not an alarming symptom: it is the essence of our society.” – লাতিন আমেরিকার এই বাস্তবতা এদেশের সমকালেও হয়তো একইভাবে প্রযোজ্য। যে ক্ষুধাকে বাইরে থেকে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়, এমনকি সেই চেষ্টাটুকুও যেখানে নান্দনিকতার মোড়ক ছাড়া আর কিছুই নয়, সেখানে তো আমাদের ‘ঠাকুর’ হয়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথ প্রান্তিক হয়ে থাকবেনই।
‘বাইশে শ্রাবণ’ আসলেই একটি সর্বাত্মক প্রগতিশীল ছবি। গ্রামীণ চিত্রকল্পের রূপায়ণে সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’-র ছায়া এই ছবির মধ্যে লক্ষ্য করা গেলেও সত্যজিতের উনিশ শতকীয় আলোকপ্রাপ্তির মহত্ব কিন্তু এখানে নেই, বরং রয়েছে রূঢ় সমাজ-বাস্তবতার পাঠশালায় গেরিলা পাঠ নেওয়া চাবুকের শব্দ। তথাকথিত পুরুষসুলভ মধ্যবয়সী প্রিয়নাথ যে গ্রামীণ সমাজের অভ্যাসে বেড়ে ওঠা এক অতি সাধারণ মেয়ের স্বপ্নের পুরুষ নয়, তা এক মুহূর্তের জন্য দর্শক বুঝে উঠতে পারেনি, যতক্ষণ না সেই চরম সত্যটি মালতীর মুখ থেকে জানা যায়। এমনকি মালতীর জীবনের এই আপোষ তার স্বামী প্রিয়নাথের চোখেও ধরা পড়ে না যতক্ষণ না তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়। এই বিভ্রম এবং চরিত্রের এই মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এতো সরাসরি এবং সুস্পষ্টভাবে এই ছবিতে উঠে এসেছে। শক্তিশালী ইমেজের প্রয়োগেও ছবিটি কয়েক ধাপ এগিয়ে। স্বামীর থেকে সন্তান না পাওয়ার দুঃখ মৌখিক অভিব্যক্তিতে একবারের জন্যও প্রকাশ পায়নি, অথচ বলরামের নাতনি ছোট্টো গোলাপির প্রতি মালতির অস্বাভাবিক স্নেহ প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দেয় তার সন্তানের আকাঙ্ক্ষাকে এবং তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন বিরক্ত প্রিয়নাথ গোলাপিকে তার মায়ের কাছে দিয়ে আসতে বললেও মালতী তাকে ছাড়তে অস্বীকার করে। তার শান্ত অথচ কঠিন “দেব না” বাক্যটির কাছে প্রিয়নাথকে নিতান্তই অসহায় মনে হয়।
মৃণাল সেনের ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ রবীন্দ্রনাথ নেই, তাঁর প্রয়াণ তিথিটুকু সুপরিকল্পিতভাবে হয়ে উঠেছে পল্লী বাংলার অতি সাধারণ দুই নর-নারীর মিলন তিথি। এখানেই ঘটে যায় এক বিপ্লব। সাধারণের অধরা রবি ঠাকুর সমাজ-সংস্কৃতির সমস্ত অর্থহীন আভিজাত্যের ট্যাবুকে ভেঙে কোথায় কোন এঁদো গাঁয়ের অজ্ঞাতকুলশীল নর-নারীর বিবাহের সানাই বাজিয়ে দেন তাঁরই মৃত্যুদিনে।
তপন সিনহার ‘টনসিল’ (১৯৫৬) ছবিটির পর ‘বাইশে শ্রাবণ’-ই প্রথম উল্লেখযোগ্য ছবি যেখানে ‘মাধুরী’ থেকে ‘মাধবী’ হয়ে ওঠেন এ ছবির নায়িকা। প্রায় সকল শ্রেষ্ঠ বাঙালি পরিচালকের ছবিতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে আসা প্রবাদপ্রতিম অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের রুপোলি পর্দায় স্বমহিমায় পদার্পণ এই ছবির মাধ্যমেই। সেদিক থেকেও এ ছবি যেন একটি যুগের সূচনা করে। ‘বাইশে শ্রাবণ’-এ প্রায় নবাগতা মাধবীর সাবলীল অভিনয়ে এ যুগের দর্শকও মুগ্ধ হতে বাধ্য। জ্ঞানেশ মুখার্জি এবং হেমাঙ্গিনীদেবীর অভিনয়ও যথেষ্ট প্রশংসনীয়।
‘বাইশে শ্রাবণ’ প্রসঙ্গে মৃণাল সেন নিজে বলেছেন, “ছবিটাকে আজও ভালোবাসি। দেখে মনে হয়েছিলো, না, আর বোধহয় ছবির রাজ্য থেকে বিদায় নিতে হবে না।” যে মানুষটি নিজেকে নিরন্তর ভেঙেছেন গড়েছেন, চলচ্চিত্র মাধ্যমকে যিনি গিনিপিগের মতো কাটাছেঁড়া করেছেন, তিনিই যখন তাঁর নিজের কর্মসাধনার শুরুর দিকের একটি বিশেষ কাজকে আজীবন ভালোবাসার কথা এত জোর দিয়ে বলতে পারেন, তখন সেই কাজটি যে বিশিষ্ট সে বিষয়ে সন্দেহ থাকে না। সাধারণ থেকে বিশেষ হয়ে ওঠা একজন শিল্পীর এহেন কাজের যে যথেষ্ট মূল্যায়ণ হয় না তা শুধু আশ্চর্যের নয়, হতাশারও। বিশ্বায়ন ও দৃশ্যায়নের ভারে জর্জরিত এই স্মৃতিভ্রষ্ট সমাজ কি মৃণাল সেনকে মনে রাখবে? একদা সময়কে যিনি ধরেছিলেন নগরের অলিতে-গলিতে, মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে, ক্যামেরার গেরিলা দৌড়ে, সময় তাকে মনে রাখবে কিনা সেকথা সময়ই বলুক। অবশ্য তাতে কী-ই বা এসে যায় তাঁর, অমরত্বের প্রত্যাশী যিনি ছিলেন না কোনোকালেই!