অতনু ঘোষের ছবি ‘বিনিসুতোয়’ রইল মিডলাইফ ক্রাইসিস এবং গল্পের ভিতরে গল্প

“সুখের মাঝে তোমায় দেখেছি,
দুঃখে তোমায় পেয়েছি প্রাণ ভ’রে।
হারিয়ে তোমায় গোপন রেখেছি,
পেয়ে আবার হারাই মিলনঘোরে।
চিরজীবন আমার বীণা-তারে
তোমার আঘাত লাগল বারে বারে,
তাই তো আমার নানা সুরের তানে
প্রাণে তোমার পরশ নিলেম ধ’রে।”
রবীন্দ্রনাথের এই গানটি দিয়েই শেষ হয় ছবি, ‘বিনিসুতোয়’। নতুন আলোয় কিংবা নতুন অন্ধকারে বারবার ঘুরে মরেছে মানুষ জীবন থেকে যন্ত্রণায়। তবু দিনশেষে নিজের ‘তুমি’টিকে চিনে সদর্থক ভাবনায় স্থিত হওয়াই এই চলচ্চিত্রের উপজীব্য। কাহিনিই এই ছবির মূল চাবিকাঠি। পরিচালক অতনু ঘোষের অন্যান্য ছবিগুলিতেও কাহিনির উপরই গড়ে উঠেছে দৃশ্যপট। এই ছবিতে চরিত্রের ভিড় নেই। মূল দুই চরিত্র কাজল সরকারের ভূমিকায় ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং শ্রাবণী বড়ুয়ার চরিত্রে জয়া এহসান। দুজনেই অসম্ভব মেধাবী অভিনেতা, তার নতুন আস্বাদ আমরা পাই ‘বিনিসুতোয়’।
আজকের টার্গেট ওরিয়েন্টেড লাইফ স্টাইলে, মধ্যবয়সে পৌঁছে যে সংকট তৈরি হয় শিক্ষিত মানুষের যাপনে, তা নিয়ে অজস্র ফিল্ম আগেও হয়েছে, কিন্তু এই ছবিটি একেবারেই আমাদের উচ্চ-মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের গল্প বলেছে তার কাহিনির মধ্য দিয়ে। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার কাজল সরকার, স্ত্রী সন্তান, ভালো মাইনে নিয়ে সমাজের চোখে সম্পূর্ণ। চাকরিতে উচ্চপদেই রয়েছেন। এখন মাঝবয়সে পৌঁছে নিজের জীবনের গল্প হারিয়ে ফেলেছেন রোজনামচায়। একইভাবে শ্রাবণী বড়ুয়া পারিবারিক চা-ব্যবসার ম্যানেজিং ডিরেক্টর। দীর্ঘ দাম্পত্যের পর একান্ত ব্যক্তিগত কারণে স্বামীর থেকে দূরে থাকেন। তিনিও চূড়ান্তভাবে অর্থ, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকলেও জীবন থেকে হারিয়ে ফেলেছেন গল্প। আর তাই নিত্যনতুন মানুষের সঙ্গে বিনিসুতোয় গেঁথে ফেলেন সম্পর্কের মালা। কাজল সরকারও একই পথ বেছে নিয়েছেন ইদানীং। আর এই করতে গিয়েই দু’জনের আলাপ রিয়েলিটি শোয়ের অডিশনে। তারপর দুজনের স্বপ্নের, সংসারের ভাঙা পুতুলের গল্প শুরু হয়। অদ্ভুতভাবে, রবীন্দ্রগানে আমরা অন্তরাকে যেমন করে দেখি, প্রশ্ন নিয়ে আসে, আর সেই প্রশ্নের উত্তর মেলে সঞ্চারী পেরিয়ে আভোগে, ঠিক তেমনই দু’জনের গল্পের অন্তরাতে এসে ছবির প্রথমার্ধ শেষ হয়।
তারপর দেখি, কাজলের সংসার। আর পাঁচজন জীবনসঙ্গীর মতনই কাজলের স্ত্রী (চান্দ্রেয়ী ঘোষ) মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার স্বামীর কাছে আশা করেন ইউরোপ, আমেরিকায় থিতু হয়ে কোথা থেকে কোথায় পৌঁছে যাবে, আর একইভাবে ছেলেকে সেরা সিবিএসই স্কুলে পড়ালে তবেই ছেলের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত। এমনকি এই কারণে নিজের কেরিয়ারও বিসর্জন দিয়ে বসে আছেন তিনি। এমনকি তিনি তাঁর ভাবুক স্বামীকে আদর করতে দেবার সময়ও বলেন চোখ খুলে আদর করতে, যেন হারিয়ে ফেলা স্বামীকে ঘনিষ্ঠ সময়েও চোখে চোখে রাখতে পারেন। আর কাজল সরকার চাইছেন ছেলে গল্প পড়ুক, বাবাকে গল্প পড়াক। ছেলের নাম রেখেছেন তাই ‘কাহন’। বৌকে বোঝান, পাড়ায় যিনি খবরের কাগজ বিলি করেন, তিনি ম্যানহাটানে গিয়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস বিলি করলেও তাঁর জীবনের গল্পটা একইরকম থাকবে। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই স্ত্রী বুঝতে অপারগ।
এরপর কাজলের মা মারা যান। আমরা দেখি মায়ের মৃত্যুশয্যায় বসে গান গাইছেন শ্রাবণী বড়ুয়া। কাজলের মায়ের সঙ্গেও বিনিসুতোর সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন শ্রাবণী। কীভাবে, কেন তা জানতে হলে দেখে ফেলতে হবে ছবিটি। আমরা আমাদের জীবনেও এরকম অজস্র বিনিসুতোর সম্পর্ক তৈরি করে ফেলি, যেগুলো আমাদের ভারে দীর্ণ করে না, কিন্তু অদ্ভুত দায়হীন ভালোবাসায় ঋদ্ধ করে।
এই ছবির উপরি পাওনা জয়া এহসানের গলায় রবীন্দ্রনাথের গান। যেমন গলা, তেমন চমৎকার গায়ন। চান্দ্রেয়ী ঘোষকে অনেকদিন পরে ছবিতে দেখে ভালো লাগলো। ঋত্বিক চক্রবর্তী আর জয়া এহসানের অভিনয়ের ব্যাপারে কিছু বলবার নেই, তাঁরা অসাধারণভাবে যথাযথ। শুধু এক জায়গায় জয়ার মুখে ‘গুলো’ শব্দটি হয়ে গেছে ‘গুলা’। কলকাতায় বড়ো হওয়া অভিজাত মহিলারা এই শব্দ ব্যবহার করেন না। ঢাকার শব্দ অসচেতনভাবে এসে গিয়েছে তাঁর মুখে।
তবু সব মিলিয়ে অসাধারণ ছবি। দেখবার মতন ছবি। মিডলাইফ ক্রাইসিসকে একান্ত কলকাতার জীবনে দেখিয়েছেন পরিচালক। আর গল্পের সঞ্চারী আর আভোগ, রবীন্দ্রনাথের গানের মাধ্যমেই পরিবেশন করাটা পরিচালকের মাস্টারস্ট্রোক। তাঁর পরিশ্রমের সুবিধা হয়েছে।
“আজ তো আমি ভয় করি নে আর
লীলা যদি ফুরায় হেথাকার।
নূতন আলোয় নূতন অন্ধকারে
লও যদি বা নূতন সিন্ধুপারে
তবু তুমি সেই তো আমার তুমি–
আবার তোমায় চিনব নূতন ক’রে।”