No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ৫০ বছরে ‘চেতনা’ – মহাসমারোহে মঞ্চে ফিরছে যুগোত্তীর্ণ ‘মারীচ সংবাদ’, ‘জগন্নাথ’

    ৫০ বছরে ‘চেতনা’ – মহাসমারোহে মঞ্চে ফিরছে যুগোত্তীর্ণ ‘মারীচ সংবাদ’, ‘জগন্নাথ’

    Story image

    বিশ্বনাট্য দিবস ২০০৪ উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমি পত্রিকার ‘পথনাটক সংখ্যা’-য় চন্দন সেন অনূদিত মিশরের নাট্যকর্মী ফতেয়া-এল-আশাল’এর একটি লেখা ছিল। সেই লেখার শুরুতেই ছিল, চিরকাল তিনি এই বিশ্বাসই করেছেন যে মহৎ মানবিক অনুভূতিগুলোই নাটককারদের স্বাতন্ত্র্য চিহ্নিত করে। তাঁদের সৃজনের মর্মবাণীই মানুষকে বারবার নিজেকে অতিক্রমণে সাহায্য করেছে, নৈরাশ্য আর শোষণ থেকে তাকে মুক্তি দিয়েছে এবং তার মধ্যে এইভাবে একটা আত্মপ্রত্যয়ী মর্যাদাবোধ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণের জন্য আর সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করার প্রয়োজনে নাটককারদের নিজেদের কাজ সুদক্ষতার সঙ্গে অধীত করতে হয় এবং শিল্পসম্মতভাবে তাঁদের সৃজনকে তুলে ধরার কৌশল পূর্ণভাবে আয়ত্তে রাখতে হয়। তা নাহলে তাঁদের নাটকের বার্তা হারিয়ে যাবে হঠাৎ কোনো দমকা হাওয়ায়, -নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে নিশ্চিতভাবেই...

    এই যে চিন্তা, অনুভূতি ও ইচ্ছা -এসব নিয়েই হচ্ছে চেতনা। চেতনা যেন সন্ধানী আলো। ‘চেতনা’র সংজ্ঞা সম্ভব না হলেও চেতনার বর্ণনা সম্ভব বিভিন্ন মাধ্যমের দ্বারা, যার একটি ‘থিয়েটার’। আর বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের জগতে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যে দলগুলি জনপ্রিয়তার সঙ্গে মঞ্চ সাফল্য বজায় রেখেছে সেগুলির অন্যতম একটির নামও  ‘চেতনা’। চেতনা নাট্যদল। নানা ধরনের মননশীল নাট্য সৃষ্টি করে আজও অব্যাহত চেতনার পরিক্রমা। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একাডেমি মঞ্চে, আগামী ২২ নভেম্বর চেতনা ৫০ বছর পূর্ণ করতে চলেছে। এই উপলক্ষে ১৮ থেকে ২৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ছ’দিন ব্যাপী নাট্যমহোৎসব।

    থিয়েটার সেই আলো, যা মানুষকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলে। এ এমন এক আলো যা অজস্র দর্শকের সঙ্গে উষ্ণ আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করে, তাঁদের প্রেরণা দেয়। কখনও মঞ্চের উপর অভিনয়ের গুণে, কখনও লিখিত ভাষ্যে সেই আলো হার্দিক সেতুবন্ধনের কিংবা মনের সঙ্গে মনের উষ্ণ সংযোগের কাজটি করে যায়। চেতনা নাট্যদলের যাত্রাপথের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাবো তাঁরা এই কাজটি সুনিপন ভাবে করে গিয়েছেন। ধারাবাহিক ভাবে ‘চেতনা’ মঞ্চস্থ করে গিয়েছে ‘মারীচ সংবাদ’, ‘জগন্নাথ’, ‘রাণী ক্রেউসা’, ‘মেফিস্টো’, ‘ডন তাকে ভালো লাগে’, ‘গোপাল উড়ে’ –এগুলির মতো জনপ্রিয় সব নাটক। চেতনা-র প্রথম নাটক ‘মারীচ সংবাদ’ মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯৭৩-এর ১৬ জানুয়ারি, সেই হিসেবে এই নাটকটিও অর্ধশতবর্ষ পূর্ণ করছে।  সাংবাদিক বৈঠকে ‘মারীচ সংবাদ’ নিয়ে সুজন মুখোপাধ্যায় জানান, “এ বার আর দলের ছেলেমেয়েরা নয়। পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে সকলের প্রিয় তারকাদের নিয়ে বিশেষ সম্মিলিত অভিনয়ে মঞ্চস্থ হবে তাঁদের বৈগ্রহিক নাটক। তারকা মানে তাঁরা সিনেমা-সিরিয়াল করেন বলে নয়, তাঁদের সবার শিকড় এই থিয়েটারে। অনির্বাণ চক্রবর্তী, অনির্বাণ ভট্টাচার্য, দেবশঙ্কর হালদার, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, সুমন মুখোপাধ্যায়, সুরজিৎ বন্দোপাধ্যায় কিংবা আরও যাঁরা এই প্রযোজনায় থাকবেন, তাঁরা সকলেই আসলে পেশাদার নাট্যব্যক্তিত্ব। এখন পর্দায় কাজ করলেও শুরুটা হয়েছিল থিয়েটারেই। তাই তাঁদের একসঙ্গে এনে মারীচ সংবাদের পঞ্চাশকে স্মরণীয় করে রাখতে চাওয়া।”

    তুমুল জনপ্রিয় ‘মারীচ সংবাদ’-এ মেরিবাবার ভূমিকায় অভিনেতা বিপ্লবকেতন চক্রবর্তী

    ‘চেতনা’ শুরু হয়েছিল যাঁর মাধ্যমে সেই অরুণ মুখোপাধ্যায়ের দুই সন্তান সুমন মুখোপাধ্যায় ওরফে লাল এবং সুজন মুখোপাধ্যায় ওরফে নীল, শুরু থেকে চেতনার সঙ্গে থাকলেও দুজনেই পরবর্তী সময়ে স্ব স্ব নাট্যদল নির্মান করেন। তবু ‘চেতনা’ জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজন পড়লে তাঁরা তিনজন আজও একত্রিত হন মঞ্চে। সুমন মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “ঠিক দুবছর বয়সে যখন বাবা অরুণ মুখোপাধ্যায়ের কাঁধে চড়ে মঞ্চে প্রবেশ করেছিলাম মে দিবসের মিছিলে—ম্যাক্সিম গোর্কির উপন্যাস অবলম্বনে ‘মা’ নাটকে। কণ্ঠে ছিল আধা উচ্চারণে গান ‘শ্রমিকের ডাক পয়লা মে, দিক-দিগন্তে ছোটায় আজ, কত প্রাণ গেছে সংগ্রামে, উঠেছে বিশ্বে কত আওয়াজ’। বা এমনও হতে পারে গানটি শুধু ছিল শ্রবণে। কিন্তু কর্ণকুহর চুইয়ে পশেছিল অন্তরনিবিড়ে। সেই জ্বালানির রসদ আজও শরীরে অবশিষ্ট রয়েছে।”

    চেতনা নাট্যদলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে আরও এক নাট্য-ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করবো। তিনি সুবিমল রায়। আজীবন নাট্যকর্মী এবং চেতনা নাট্যগোষ্ঠীর সভাপতি ছিলেন। ২০০৩ সালে তিনি চলে গিয়েছেন। চেতনা প্রযোজিত বিভিন্ন নাটকে তিনি নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন এমনকী অরুণ মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় অভিনীত প্রায় সব নাটকেই মঞ্চসজ্জার দায়িত্ব ছিল তাঁরই হাতে। ১৯৭২-এ চেতনার জন্ম। প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন সভাপতি। চেতনা-র আমেরিকা সফরেও তিনি সঙ্গী ছিলেন। মৃত্যুর কিছুকাল আগেও তিনি ‘মারীচ সংবাদ’-এ অভিনয় করেছেন—২০০২ সালে দিল্লিতে এন এস ডি আয়োজিত ভারত রঙ্গ মহোৎসবে ‘জগন্নাথ’ নাটকে অভিনয় করেছেন। তাঁর স্মৃতিচারণা করে অরুণবাবু লিখেছিলেন, “মন এবং মস্তিষ্ক দুই-ই সজীব ছিল শেষ পর্যন্ত। ...মারা যাবার পরপরই দু’একটি অভিনয়ে সুবিমলবাবু এসে পৌঁছেছেন কিনা খোঁজ নিয়ে ফেলেছি। আমার নাট্যজীবনে সুবিমলবাবুর ভূমিকাটা প্রায় অপরিহার্য ছিল।”

    শুধু সুবিমল রায় নন এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁদের জীবনযাপন থেকে ‘চেতনা’-কে আলাদা করা যাবে না। যেমন- শিল্পী হিরণ মিত্র। একেবারে শুরু থেকে যিনি এই নাট্যদলের শিল্পভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। ৫০তম বছর পূর্তির জন্যও একাধিক পোস্টার, ছবি, নাট্যশ্লোগান তৈরির দায়িত্বভার বর্তেছে তাঁর উপর।  “চেতনার বাইরে নীলের সঙ্গে একটা মাত্র কাজ করেছি। সুমন ও অরুণদার সাথেও অন্য দলের হয়ে কাজ করেছি। ‘চেতনা’ দল হিসেবে বা অরুণ দা’র ক্ষমতা হিসেবে শেখবার মতো। ওরা তিনজন তিনরকম। তবুও ওরা একটাই ‘চেতনা’। আমি তো প্রায় শুরু থেকেই ওদেরর সঙ্গে ছিলাম, থাকবোও।” বঙ্গদর্শনকে জানান শিল্পী।

    ৫০ বছর পূর্তিতে চেতনার নাট্যপত্র, প্রচ্ছদ- হিরণ মিত্র

    নতুন প্রজন্মের ভিতরেও ‘চেতনা’ রয়েছে তা নাট্যোৎসবের টিকিট বিক্রির বহরেই প্রমাণিত। অনলাইনে (থার্ড বেল) টিকিট কাটার সুফলে ইতিমধ্যেই বেশ কিছু নাটকের শো হাউসফুল। এছাড়া অফলাইনেও রয়েছে টিকিট কাটার সুযোগ। কখন কোন নাটক, দেখে নিন এখানেঃ

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @