তারকোভস্কির বৃষ্টি ৩

মিরর
তারকোভস্কির যে সৃষ্টি ব্রম্ভাণ্ড তা জলবিম্বস্বরূপিনী, দ্বিধাহীন পুনর্বিন্যাসে বেঁকে অকস্মাৎ ফেটে হারায়, রঙে ও সাদা-কালোয়। বোধহীন যুক্তিক্রমের সূত্রে খুঁজলে তুতলে যেতে হয় শুরুর শুরুতে যেমত, অপর দর্শনে মায়াদর্পণ বলাটা বেইমানি হয় যেহেতু আপন দেখায় ভর করে এই আঙ্গিকে প্রবেশমাত্র দেখাটা পালটে যেতে থাকে কেননা এখানে পুরোটাই খাঁটি!

ইগনাতিয়েভো বনানী
প্রথম যা মনে পড়ে, দূরাগত ট্রেনের বাঁশি, বাবার পথ চেয়ে বেড়ায় বসে মায়ের ধুমপান। স্টেশন-থেকে-আসা রাস্তাটা ইগনাতিয়েভো বনের ঝোপের কাছে দু-ভাগ হয়ে গেছে। ট্রেন থেকে নামা লোকটা যদি ওখানে এসে আমাদের বাড়ির দিকে ঘুরত, বুঝতাম বাবা আসছে, না হলে অন্য লোক। সেদিন এদিকে এসেছিল এক গ্রাম্য ডাক্তার। আমার যুবতী মায়ের সঙ্গে আলাপের চেষ্টা করছিল এটা সেটা বলে, সিগারেট চেয়ে ধরিয়ে, মায়ের পাশে বসতে গিয়ে বেড়া ভেঙে পড়ে, হো-হো হেসে, তারপর হঠাৎ-ই, গাছেরাও সব বুঝতে পারে, তাদেরও অনুভব আছে, তারা কোথাও পালিয়ে যায় না এইসব বলে চলে যাওয়ার সময় ধানের খেতে সবুজ ঢেউ উঠেছিল দমকা হাওয়ায়, দু-দুবার। বোনের সঙ্গে গাছে-বাঁধা দোলনা-বিছানায় শুয়ে আমি দেখছিলাম। বোন মারিনার তখন আড়াই বছর বয়স আর আমার পাঁচ। বাবা আমাদের ছেড়ে গেছিল ১৯৩৭ সালে। এটুক আন্দ্রেই-এর মতো করে লিখলাম।
প্রথম দেখা
এরপর মারিয়া (মা, অভিনয়ে মার্গারিটা তেরেকোভা) পিছু ফিরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। কবি আর্সেনি তারকোভস্কির গমগমে গলায় ফার্স্ট মিটিং কবিতাটি ধ্বনিত হতে থাকে। জানলা থেকে নিঃশব্দ গ্রন্থপতন ঘটে। নিজের বাবাকে দিয়ে কবিতা পড়িয়েছিলেন তারকোভস্কি। মারিয়া দাঁড়ায়, ফিরে দেখে, ছোট্টো ছেলেটি ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের চলে-যাওয়া দেখছিল, দূরে আগুনের অস্পষ্ট লাল ছিল। কাকীমা এসে ঘুমন্ত মারিনাকে মাটি থেকে তুলে নেয়, কবিতায় অন্ধকারের অন্তর্গত দীপ্তির কথা শোনা যায়। বাড়ির ভেতরে, খাওয়ার টেবিলে ভাই বোনকে দুধ রুটি খেতে দেখি। কিছুটা ধবধবে-সাদা দুধ টেবিলে পড়ে, ঘনকৃষ্ণ মার্জারটি তা চেটে চেটে খাচ্ছিল। মারিনা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কবিতাপাঠ যেন একান্তভাবে মারিয়ার কানেই ধ্বনিত হচ্ছিল। সে, মারিয়া, কবির প্রেম, কবি-পত্নী, কবির পুত্র-কন্যার মাতা সেসব তো ঠিকই কিন্তু এ যে তাকে নিয়েই লেখা তার জন্যেই প্রথমবার পড়া, সেই একান্ত কাব্য-ধ্বনি আমরা শুনেছিলাম। মারিয়াকে অস্থির লাগছিল, ইতস্তত চলনে সে জানলার পাশে গিয়ে বসে বাইরে তাকায়, ক্যামেরা ডলি করে গিয়ে তা দেখে, সবুজ ঘাসের ওপর বেঞ্চি তার ওপর একটি ঢাকনা-খোলা ফাঁকা পানের বাটা, ছোটো কাচের জারে কিছুটা জল। ক্যামেরা ওপরে তাকায়, গাছেদের ফাঁক দিয়ে শুরুতে দেখা বনানী, বেড়া দৃশ্যমান হয়। জানলার পাশে গাছের পাতা তিরতির করে কাঁপছিল, সেখানে বৃষ্টি পড়ছিল। মারিয়ার দু-চোখে প্লাবন, অন্তরাত্মায় ধ্বনিত হচ্ছে ―আমাদের চোখ ছিল খোলা আকাশে / নিয়তি হাতরাচ্ছিল পশ্চাতেই / ক্ষুর হাতে পাগলের মতো। কবিতা শেষ হয়, মারিয়া চোখের জল মোছে। পায়রা, বেড়াল ও কুকুরের ডাক শোনা যায়। বাইরে তখন বৃষ্টি। কারা যেন আতঙ্কিত হয়ে আগুন আগুন বলে চিৎকার করছে। মারিয়া বাইরে থেকে ঘুরে এসে বাচ্চাদের বলে, “আগুন লেগেছে, শান্ত থাকো ! ”ওরা খাওয়ার টেবিল থেকে উঠে দৌড়োয়, ক্যামেরা যায় না, পিছিয়ে এসে স্থির হয়, দেখি চেয়ারে সেই কালো বেড়ালটি, টেবিল কিনারে থাকা, সারা রাত জ্বলে জ্বলে কালো-হয়ে-যাওয়া সেজবাতির চিমনিটা ধীরে ধীরে পড়ে গড়িয়ে গেল কাঠের মেঝেয় কিন্তু ভাঙল না। ক্যামেরা চলে এল বামদিকে, ফোকাস টানল দেওয়ালে টাঙানো একটা ঝাপসা, ধুলিধুসর বিরাট আরশিতে, প্রতিবিম্বে দেখলাম দূরে আগুন জলছে, বাচ্চা দুটো দরজায় দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে। ক্লাইংকার নাম ধরে উদ্বিগ্ন খোঁজ চলছিল চেঁচিয়ে, সাড়া দিয়ে, আয়নার পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসে সে, দরজার দিকে যায়, ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে বাইরে আসলে এক মহাকাব্যিক দৃশ্য-শব্দ-রূপ এসে পড়ে―চারপাশে সবুজ বনানীর ম্যারাপ যেন, মধ্যে সবজি খেত তারপর বেড়া তার পিছনে মঞ্চের মতো ফসল ভরতি খামার-বাড়ি হা হা আগুনে জ্বলছে, জ্বলে যাচ্ছে। পুরোটা ডিপ ফোকাসে তোলা― একেবারে সামনে ঘরের চাল থেকে ঝরছে জল-ধারা, সবুজ সবজি বাগানে কাকা কাকীমা দাঁড়িয়ে, ক্লাইংকা সেখানে গিয়ে দাঁড়াল। মারিয়া একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, এবার এগিয়ে গিয়ে কুয়োর পাশে ঝোলানো কপিকলে আটকানো বালতি থেকে জল নিয়ে চোখে মুখে দিল যেহেতু তার চোখ ভেজা কেননা সেখানে কান্না ছিল, তারপর কুয়োর পাড়ে জড়োসড়ো হয়ে বসল, যেন শীতার্ত। পাশ দিয়ে কেউ একজন এগিয়ে গেল আগুনবাড়ির দিকে। বৃষ্টির ধারাপতন, ঘরপোড়া আগুনে শব্দের সংগে কপিকলের ধাতবশব্দ যোগ হল। ক্যামেরা ঈষৎ ঘাড় তোলে, দূর আকাশে হালকা কমলা, ধোঁয়ার সাদা, পোশাকের কালো, অরণ্যের সবুজ, অগ্নিদানবের লাল―মহাকাব্যমপম! স্বপ্ন নয়, স্মৃতি!
আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের বঙ্কিম পরিহাসে
আমাকে দিল লিপি রচনা করবার আবেগ;
যেন আমিও আগুন বাতাস জল,
যেন তোমাকেও সৃষ্টি করছি।
ছোট্টো আন্দ্রেই পেতলের পালঙ্কে শুয়ে ছিল হঠাৎই উঠে বসল। বাবা এল কি! রঙীন শট(১৯৩৭ সাল)। এভাবেই বাবার অপেক্ষায় পথ চেয়ে শ্বাস নিতে দাদা! ট্রেনের বাঁশি কিংবা পায়ের আওয়াজে ও টের পেত যে বাবা এসেছে! শেষবার খুব কম সময়ের জন্যে যুদ্ধ ফেরৎ, রাতে, এসেছিল বাবা কিন্তু দাদা টের পেয়ে গেছিল ―এসব কথা বোন মারিনা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন। কাট শটে সাদা-কালো স্বপ্নদৃশ্যে―যা আলেক্সি মানে ভাষ্যকার মানে ৪২ বছরের তারকোভস্কি দেখছে যাকে আমরা ছবিতে দেখতে পাই না যদিও এতক্ষণ সে-ই সব কিছু জানাচ্ছিল―বাইরের চুপ-থাকা-গাছপালা ঝোপঝাড় হঠাৎ দমকা হাওয়ায় শরীর ঝুঁকিয়ে মাথা দোলাতে থাকে। এই দৃশ্যটি পরে আরও তিনবার আসবে। ছোট্টো আন্দ্রেই ওই বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে ছিল (১৯৩৬, বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয় তারকোভস্কির চার বছর বয়সে) দূরাগত ট্রেনের শব্দ, হঠাৎই উঠে বসল, অস্ফুটে বলল, “বাবা !” গায়ের চাপা সরিয়ে পেছন হেঁচরে হেঁচরে সে পালঙ্ক থেকে নামে রিনঝিন আওয়াজ তুলে, দূরে-দিয়ে-যাওয়া ট্রেন-শব্দ রাতের নৈঃশব্দকে ডাকে, বালক আন্দ্রেই পাশের ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। এরপর সবই স্লো মোশনে হতে দেখা যায়, যুবতী মায়ের খুলে ফেলা পোশাক উড়ে আসে বাঁ দিক থেকে, বাবার নগ্ন পিঠ ও বাহুতে চোখ আটকায়, পেছনে গ্যাস স্টোভের দুটোই জ্বলছিল। বাবা একটা সসপ্যানে জল নিয়ে মায়ের মাথা ধুইয়ে দিচ্ছিল। মা ঘাড় মাথা নিচু করে একটা চীনে মাটির গামলা মতো পাত্রে চুলগুলো সব ডুবিয়ে দিয়েছে। দুহাতে কেশরাশি ঈষৎ সরিয়ে মাথা তুললেও চুলগুলো শণের মতো লেপটে জেবড়ে মা-মুখ আড়ালে রাখে। শরীরে ছিল হালকা সাদা ভেতর পোশাক, যুবতী মায়ের স্তনবৃন্তের আভাস স্পষ্ট হয় ক্যামেরা পিছিয়ে এলে, মনে হয় মা যেন ভেসে যাচ্ছে পশ্চাতে, অগ্নি শিখাদ্বয় ছিল উর্ধগামী। আলুলায়িত কেশরাশি জাবরা হয়ে মুখ ঢেকে এলো হয়ে ঝুলছে, নগ্ন পা নগ্ন বাহুমূল, বিচিত্র ভঙ্গিতে নগ্ন হাতদুটি দুদিকে ঝুলছে যেন ক্রুশবিদ্ধ, যেন নৃত্যরত। এ কী রূপ! বাঁ পাশে বিশালাকার আয়নায় বিম্বিত অগ্নিশিখাদ্বয়, মেঝেতে অগ্নি-কন্ঠ ফাঁকা বোতল। কাটশটে দেখি ওখানে মা নেই―ফাঁকা। অগ্নিশিখা, জলের ধারাপতনের শব্দ বেশ উঁচুতে। ঘরের ছাদ ভেঙে ভিজে প্লাস্টার পড়তে থাকে ঝপ ঝপ করে, ঘন্টাধ্বনি শোনা যায়, থোকা থোকা চাবড়া মেঝেতে পড়ে ছিটকোয়। ভেসে যায় ঘর। বৃষ্টিতে! মায়ের সারা গা হাত মুখ মাথা ভিজে যেতে থাকে বৃষ্টিতে, পাশ ফিরে চুল ঠিক করতে করতে চলে যায় মা। বারেক তাকায়, স্পষ্ট সে মুখ। আরশিতেও দেখি─ সেখানে কি ছিল ? খুশি তৃপ্তি নাকি অন্যকিছু? ঘরভাসানো বৃষ্টিতে দেওয়াল বেয়ে জলধারা অধোগামী। হাতে-বোনা-শাল গায়ে মা সোজাসুজি তাকিয়ে, ফ্রেমের ডানদিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার মুখে শটটি কাটলে দেখি বৃদ্ধা মা সোজাসুজি তাকিয়ে―আয়নায়―সেখানে গাছ, আগুন,ফেটে-যাওয়া মেঘের ফাঁকে আকাশ আর মায়ের গায়ে ছিল হাতে-বোনা-শাল। মা তাঁর শীর্ণ হাত দিয়ে আয়নার কাচ মুছে দেয়, শব্দে বুঝি হাত ভিজে ছিল। এই দৃশ্যে তারকোভস্কি তাঁর নিজের মাকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছিলেন। গোটা সিকোয়েন্সে ট্রেনের বাঁশি (নাকি রাতচরা পাখি?), জল পড়ার শব্দ, আর্তমিয়েভের জাদু-সঙ্গীত, ছাদ-খসা-প্লাস্টার পতনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনিনি আমরা। জলশব্দ ছিল কেননা তখনও বৃষ্টি পড়ছিল।

১৯৭৪ সালে ফিরি টেলিফোনে মা-ছেলের সংলাপে ভর করে। ক্যামেরা ফাঁকা বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখায়, আন্দ্রেই রুবলেভ -এর পোস্টারও চোখে পড়ে। তারকোভস্কির মা মারিয়া ইভানোভা ভিসনিকোভা ছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি ইন্সটিটিউটের গ্র্যাজুয়েট। ছাপাখানায় প্রুফ সংশোধনের কাজ করতেন তিনি। গোটা ছবিতে বিশ্বযুদ্ধের আগের (১৯৩৫), যুদ্ধকালীন (১৯৪০) এবং যুদ্ধোত্তর ( ১৯৬০, ১৯৭০, ১৯৭৪ ) সময়কাল এসেছে। টেলিফোন লাইন কেটে যায়, চলন্ত ট্রামের শব্দে ক্যামেরা এগোয় দরজার দিকে, শটটি কাটে, শুনি কন্ডাকটর হাঁকছে,“পরের স্টপেজ ছাপাখানা।” টেনশনে এক স্টপেজ আগেই নেমে পড়েছে মারিয়া, সে রাস্তার মাঝখান দিয়ে ঊর্ধশ্বাসে দৌড়োচ্ছে। প্রুফের ভুলটা গতরাতে কি সংশোধন করেছিল! নাকি ...ঝেঁপে বৃষ্টি এল। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে যেতে থাকে সে। মূল ফাটকে আই কার্ড দেখিয়ে ঢুকে আবার একবাড়ি থেকে অন্যবাড়ি পুরো ভিজে মারিয়া নিজের ডেস্কে পৌঁছোয়, সেখানে না পেয়ে দৈত্যাকায় প্রিন্টিং রুমের দানবাকৃতি মেশিনের পাশ দিয়ে গিয়ে শেষপর্যন্ত প্রুফের তাড়া দেখে, মুক্তি-শ্বাস নেয়, যাক ঠিক আছে! স্তালিন জমানার স্নায়ুচাপ টের পাওয়া যায়। রাস্তা থেকে কারখানা, ছাপাখানার ভেতরের দীর্ঘ সিকোয়েন্সে শব্দ প্রক্ষেপ বুঝিয়ে দেয় মুষলধারে বৃষ্টির থাকাকে অথচ মুক্তি স্নানের মুহূর্তে কল থেকে জল-পড়া বন্ধ হয়ে রহস্যময় ধ্বনি শুনতে পাই। করিডর দৃশ্যে আর্সেনির লেখা ফ্রম মর্নিং অন আই ওয়েটেড ইয়েসটার্ডে কবিতাটি কবি কন্ঠে পঠিত হয়েছিল।

সে, বৃষ্টি ফিরে এসেছিল―অ্যালেক্সি-মারিয়ার (বাবা-মা)বিচ্ছেদের পর ইগনাত অর্থাৎ কিশোর তারকোভস্কি কার হেফাজতে থাকবে তা নিয়ে আলোচনার সময়, ঘরের জানলার কাচ বেয়ে উপচে পড়ছিল জলধারা, মায়ের কান্না হয়ে যেন, বাইরে তখন আগুন জ্বেলেছিল ইগনাত (১-১৫)।
প্রথম স্বপ্ন দৃশ্যটিই (১৯৩৬)যেন ফেরে, এবার ‘মা’ ডাকে, কিন্তু স্বপ্নে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে পারে না আন্দ্রেই। জানলার শার্সির কাচ সশব্দে ফাটিয়ে একটা মুরগী বেরিয়ে আসে। এবং তারপর, চুপ-থাকা গাছপালা ঝোপঝাড় হঠাৎ দমকা হাওয়ায় শরীর ঝুঁকিয়ে মাথা দোলাতে থাকে (দ্বিতীয়বার) ( ১-১৯)। তারকোভস্কি যেন হাওয়ার ছবি তোলেন। কিছুটা-খাওয়া রুটি টলতে থাকে, সেজবাতির ভূমিপতন হয়, ছোট্টো আন্দ্রেই ছুটতে ছুটতে বহির্বাটির পাশ দিয়ে চলে যায়, ক্যামেরা থামে, হিমসাদা তুষার পাত হয়, বন্ধ দরজা টেনে-খুলতে-না-পেরে চলে যায় আন্দ্রেই, এবার সেটা নিজে নিজেই খোলে। মা উবু হয়ে বসে, মেঝেতে অনেক আলু পড়ে, কিছু মায়ের হাতে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বিষাদমগ্ন মুখ, পিছনে জানলার বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল, সামনে ছিল না। পুরোটা সাদা-কালোয়, স্লো মোশনে তোলা।
বাস্তবিকই জল কি জলের নিকটতম মানে?
অথবা কি মানবরক্ত বহন করি নির্মম অজ্ঞানে?
কানের দুলজোড়া বেচে কিছু টাকা জোগাড়ের চেষ্টায় মারিয়া দু মাইল দূরের ডাক্তার পত্নীর কাছে গেছে, ছেলে অ্যালেক্সি অর্থাৎ বয়সন্ধির তারকোভস্কিকে (১৯৪৩, বয়স ১১/১২) সঙ্গে নিয়ে, বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল ঝিরঝির করে। তারকোভস্কির দ্বিতীয় স্ত্রী লারিসা তারকোভস্কায়া এই চরিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন তা ছাড়া তিনি মিরর-এর সহকারি পরিচালকও ছিলেন। মায়েরা ভেতরে। কাদামাখা খালি-পা মুছে অ্যালেক্সি একা ছিল বাইরের ঘরে, সেখানে ডিম্বাকৃতি আরশি ছিল তাতে সে নিজেকে পেয়েছিল― পিয়ানোর ওপর দুধ পতনের শব্দে অঁরি পারসেল্লির সঙ্গীতে, আগুনের আংড়ায়, সেজবাতি জ্বলা নেভার শব্দে, বাইরের বৃষ্টিতে, সে এমনকি বাবার প্রেমিকাকেও মনে করতে পেরেছিল। এরপর মারিয়াকে দিয়ে মুরগী কাটায় ওই ধনী মহিলা, ঘরের ভেতরেই। হত্যা- মৃত্যু থেকে ছেলেকে দূরে-রাখতে-পারা মা-মুখে অপর আলো দেখা গেছিল, দেওয়াল বেয়ে জলধারা নেমেছিল।

কাটশটে ফিরেছিলাম শুরুর সেই ছাদভাঙা বৃষ্টিঘরে যেখানে বাবা মায়ের ভালোবাসার এক অ-পূর্ব আখ্যানে পিতা-মাতার ভালোবাসাকে শয্যা থেকে উঁচুতে তুলেছিলেন তিনি, তারকোভস্কি, সেখানে ধবধবে শঙ্খ-শুভ্র কপোত উড়েছিল।
জলের থেকে ছিঁড়ে গিয়েও জল
জোড়া লাগে আবার যেমন নিবিড় জলে এসে।
পুনরায় কাট। ডাক্তারপত্নীর বাড়ি থকে ফেরার দৃশ্যে, নদীর জলে স্রোত ছিল, বাবার পাঠে এউরিদিসে কবিতা ছিল।
ছবির আরও অনেক বাকি ছিল...
অ্যালেক্সি অর্থাৎ ভাষ্যকারের মৃত্যুশয্যায় চড়াই পাখিকে মুঠোয় ধরে উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যে অভিনয় করেছিলেন তারকোভস্কি নিজে।

পতন, উড়ান, জল আগুন বৃষ্টি নদী জঙ্গল আগাছা কাদা মাটি, দুধ ও জল শব্দ প্রায় স্বাক্ষরের মতো থাকে তাঁর ছবিতে। এখানে পাজল নেই, ছকবাজি নেই, ধাঁধা নেই, সংকেত নেই, চিহ্ন নেই, প্রতীক নেই এমনকি প্রহেলিকাও নেই―আছে বিশুদ্ধ সততা, আছে শিল্পের প্রতি অপরিসীম মমত্ব ও দায়বদ্ধতা। মিরর জাতের চলচ্চিত্র অতি বিরল। নিজের মা, নিজের বাবা, নিজের স্ত্রী, নিজে স্বয়ং থেকেছেন ছবিতে। নিজেদের বাড়ি, তার চারপাশ এমনকি ছবি তৈরির সময় সেই কুয়োটির বুজে-যাওয়া রূপ, অতীতের ধ্বংসাবশেষের সবকিছুতে এত আত্মগত এত পারিবারিক ছায়াছবি ঋত্বিক কুমার ঘটকের যুক্তি তক্কো আর গপ্পো ছাড়া চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আর লভ্য নয়। কবিতা যেমন স্বরাট তারকোভস্কির চলচ্চিত্রও তার নিজস্ব ভঙ্গিতে নিজের মতো করে স্বরাট কখনও কখনও কবিতাকেও ছাপিয়ে যায়। কবিতার মতো নয়, অনুভব প্রজ্ঞা আর শিল্পসুষমার অমেয় প্রকাশে এইসব ছবি নিজেই একটি শিল্পজগত সৃষ্টি করে যার নাম তারকোভস্কির চলচ্চিত্র।
পুনশ্চ : জীবনানন্দ দাশ এসেছেন ইটালিকসে। স্মর্তব্য, লেখক বৃষ্টি গন্ডিভুক্ত।