ছোটোবেলায় শোনা ‘তিন তালাক’-এর গল্প জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে, নির্মাতা ফারহা খাতুন

রাস্তাঘাটে ঘুরতে ফিরতে শোনা যায়, ‘ওরা সবাই দিচ্ছে ডাক/ পুরুষতন্ত্র নিপাত যাক’। ‘ওরা’ মানে যে শুধুমাত্র মহিলা তা নয়, অনেক পুরুষও। পুরুষতন্ত্র নিয়ে সামাজিক ক্ষোভ-বিক্ষোভের ইতিহাস বহু পুরোনো। সমাজ বদলায়, সেই সঙ্গে বদলে যেতে থাকে প্রতিবাদের সুর। কিছুটা পড়ে শিল্পে, কিছুটা সাহিত্যে, কিছুটা ব্যবহারিক শব্দচয়নে, কিছুটা আবার পরিবারের মধ্যেই। সমাজের সমস্ত বেড়াজাল ভেঙে কথা বলা এবং ভিন্নমত রাখার স্বাধীনতাকে সঠিক গণতন্ত্র বলে ভাবেন যাঁরা, তাঁদেরই একজনের কথা বলব আজ।
ফারহা খাতুন। মেদিনীপুরের বেলদা নামক এক গ্রামের মেয়ে তিনি। কলকাতার রূপকলা কেন্দ্রে পড়তে এসেছিলেন চলচ্চিত্র সম্পাদনা নিয়ে। এখানেই কাজের হাতেখড়ি। ‘আই অ্যাম বনি’ নামক এক তথ্যচিত্রের সহ পরিচালক ছিলেন ফারহা। তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে নবতম সংযোজন তথ্যচিত্র ‘হোলি রাইটস’। যে ছবিটি এ-বছর পেয়েছে জাতীয় পুরস্কারও। উর্দু ভাষায় নির্মিত ৫৩ মিনিটের এই তথ্যচিত্রের বিষয়বস্তু মুসলিম মহিলাদের কাজি হওয়ার প্রশিক্ষণ। ভোপালের সফিয়ার এক বিস্তৃত প্রতিবাদের সফর। সেই জার্নিতেই নানা মহিলার সঙ্গে পরিচয় হয় ফারহার। পরিচয় হয় সফিয়ার সঙ্গেও৷ এরপর প্রায় চার বছর ধরে একটু একটু করে সফিয়াকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর দিনলিপিকে ফ্রেমবদ্ধ করে রাখার চ্যালেঞ্জ। ভোপালের সফিয়া ‘তিন তালাক’ ভুক্তভোগীদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁদের আবেগের কথা শুনেছিলেন খুব মন দিয়ে। মুসলিম সমাজের মধ্যে থেকেই পুরুষতান্ত্রিক অন্যায় -অত্যাচারের প্রতিবাদে অটল সফিয়ার জীবনের গল্প আজকের দিনে ব্যতিক্রমী।
কিন্তু এই ভাবনার শুরু কোথায়! উত্তর দিচ্ছেন ফারহা খাতুন নিজেই। বঙ্গদর্শনকে ফোন মারফত তিনি জানিয়েছেন, “আমার এক বন্ধু ২০১৪ সালে কয়েকজন মহিলা কাজির গল্প বলে। তখনই সেই সংস্থার সঙ্গে দেখা করি এবং ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই বিষয়টা নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকি। সেই বছরেই যখন কাজি হওয়ার ট্রেনিং শুট করতে শুরু করি, সফিয়া আপার সঙ্গে আমার দেখা হয়। ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্ব এগোনোর পাশাপাশি কাজটাও এগোতে থাকে।”
২০১৫ থেকে ২০১৯ – প্রায় চারবছর শুটিং হয় এই তথ্যচিত্রটির। পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ শেষ হয় ২০২০-র মার্চ মাসে৷ ফারহার ‘হোলি রাইটস’ সোচ্চার হয়েছে মেয়েদের বিশ্বাসের কথায়। বিশ্বাস মজবুত না হলে লড়াই সম্ভব নয়। এই কাজ মেয়েদের কণ্ঠে আরও জোর দিয়েছে, প্রশ্ন করার সাহস জুগিয়েছে। অন্ধকার নয়, উজ্জ্বল আলোর সংকল্প তুলে নিয়ে ফারহা বেছে নিয়েছেন সমাজের কিছু অজানা অধ্যায়।
ফারহার বয়স তখন মাত্র দশ। এক গ্রীষ্মের সকালে পরিচিত কাকিমার মুখে প্রথম শোনা ‘তিন তালাক’ (তিন তালাক অর্থাৎ, স্বামী তিনবার তালাক উচ্চারণ করলে তাৎক্ষণিকভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ, এক ধরনের ইসলামিক রীতি হিসেবে পরিচিত)। ফারহা বলেন, “তিনি খুবই অস্থির হয়ে পড়েছিলেন আর আমাদের সামনে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন। স্বামীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির বচসায় জড়িয়ে পড়েন। স্বামীর মুখ থেকে দুইবার তালাক শব্দটি বেরিয়ে আসে। তৃতীয়বার উচ্চারণ করার আগেই তিনি স্বামীর মুখ হাত দিয়ে চেপে দেন, ফলে সাময়িকভাবে বিবাহ রক্ষা হয়েছিল।”
এমন অভিজ্ঞতা যে কারোর জীবনে অভিঘাত ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক। ফারহা আরও বলেন, “আমি প্রায়শই ভাবতাম, কোরান লিঙ্গ-পক্ষপাতী কিনা।” সফিয়া আখতার তাঁকে সমস্ত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। তথ্যচিত্রটি দেখলে পরতে পরতে উত্তর পেতে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে সফিয়াদের অবস্থান বুঝতে এতটুকুও সমস্যা হবে না।
‘হোলি রাইটস’ সামাজিক ইস্যুতে নন-ফিচার বিভাগে সেরা তথ্যচিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে কয়েকদিন আগেই। ফারহা জানান, ভোপালের সফিয়া আখতার স্পষ্টবাদী তো বটেই, সেইসঙ্গে দারুণ কবিতা আবৃত্তি করেন। এই ছবিতেও তার কিছু অংশ তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতের মতো দেশে একটা বড়ো সমস্যা হল, যেভাবে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবিকে মান্যতা দেওয়া হয়, সেখানে উল্লেখযোগ্য তথ্যচিত্র বা স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি দেখার একমাত্র উপায় গুটিকয়েক ফেস্টিভ্যাল আর কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এইভাবে হারিয়ে যায় সময়ের দাবি মেনে চলা কত উল্লেখযোগ্য কাজ। এ প্রসঙ্গে ফারহা বলেন, “হতাশ তো আমরাও হই। তবে আমরা তথ্যচিত্র নির্মাতারা চেষ্টা করি নিজেদের উদ্যোগে ছবি প্রদর্শন করা। বেশিরভাগ এনজিও কিন্তু তথ্যচিত্রই দেখান। কারণ এই কাজগুলোর মধ্যে সত্য তথ্যগুলো গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়। প্রচুর মানুষের গবেষণার কাজেও লাগে। এর ফলে মানুষের সচেতনতা বাড়ে। আমরা যেমন সফিয়া আপার জন্য ভোপালে একটা স্ক্রিনিং করেছিলাম। সেখানে অন্যান্য জায়গা থেকেও প্রচুর মানুষ এসেছিলেন। ব্যক্তিগত স্তরে আরও স্ক্রিনিংয়ের কথা ভেবেছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য! কোভিডের কারণে এই মুহূর্তে সেটা সম্ভব নয়।”
আশার কথা এই, দর্শক পাল্টাচ্ছেন। পাল্টাচ্ছে দেখার চোখও। তাই ফারহা খাতুনের মতো ‘অফবিট’ মুখেরাও চর্চিত হয়ে যান এই সমাজের কাছে। ফারহার প্রতিভা স্বীকৃত হোক বারবার। তথ্যচিত্রের মাধ্যমে তিনি মেয়েদের চিরাচরিত দুর্দশা ও বিকল্প সমাধানের কথা বলে আমাদের অবাক করুন।
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত তরুণ পরিচালক ফারহা এই মুহূর্তে কলকাতার হারিয়ে যাওয়া ভিস্তিওয়ালাদের নিয়ে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র নির্মাণে ব্যস্ত আছেন।