No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ফ্যানি পার্কসের ডায়েরি: কলকাতায় চোর ধরার আজব উপায়  

    ফ্যানি পার্কসের ডায়েরি: কলকাতায় চোর ধরার আজব উপায়  

    Story image

    পুরোনো কলকাতার চুরির গল্প। সত্যি বলতে কী, কলকাতায় চুরি হত, বেশ ভালোই হত। কলকাতার রাস্তাঘাট চুরির অনুকূলও ছিল। চারদিকে এঁদো পুকুর, বাঁশঝাড়। চোরের ভয়ে গৃহস্থ রাত জাগতেন,  পাহারাদারও থাকত দরজায়। তবু দক্ষ চোরের মসৃণ পলায়ন খুব একটা আটকানো যেত না। পথেঘাটেও চুরি মন্দ হত না। গ্যাসের বাতির পূর্বসূরি হিসেবে পথের আঁধার দূর করত রেড়ির তেলের বাতি। সন্ধে হতে না হতেই কর্পোরেশনের বাতিওয়ালা হাজির হত, কাঁধে মই নিয়ে। কাঁচের চিমনি ভালো করে ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করত প্রথমে, তারপর জ্বেলে দিত রেড়ির তেলের আলো। প্রতি মধ্যরাতেই এই তেল চুরি হত। কাঠের থামে উঠে তেল নিয়ে চোর ভ্যানিশ। সকালবেলা বাতিওয়ালা বাতির এই পরিণতি দেখে খুব রাগারাগি করত ঠিকই। তবে চোর তো ততক্ষণে পগারপার। শোনা যায়, এই ‘পগারপার’ কথাটিও এসেছে চোরের দৌলতে।  কলকাতার গায়ে তখনো লেগে গ্রামীণ গন্ধ। ধানখেত, পুকুর ছিল চারদিকে। আর ছিল হচ্ছে পগার। দুর্গন্ধে ভরা পাঁক-ভর্তি পগার পার হওয়া চারটিখানি কথা ছিল না সাধারণ লোকের পক্ষে। তবে হ্যাঁ, চোরের কাছে তা অনায়াসসাধ্য।  

    কিন্তু চোর ধরার বিস্ময়কর কিছু উপায়ও ছিল। ফ্যানি পার্কস তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে সেই উপায়ের হদিশ দিয়েছেন। ১৮২২ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতায় এসেছিলেন ফ্যানি। মোট চব্বিশ বছর ছিলেন এই দেশে। গোটা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি। কলকাতার অনুপুঙ্খ বর্ণনা মেলে ফ্যানির লেখায়। শীত গ্রীষ্ম বর্ষার রকমফের থেকে কলকাতার বাইনাচ, চরক, দুর্গাপুজো – সবকিছুর। তেমনভাবেই ফ্যানি লিখেছেন, চালপড়া খাইয়ে চোর ধরার অভিনব পদ্ধতি তিনি দেখেছিলেন তাঁর নিজের বাড়িতেই। এমনিতে প্রায়শই চুরির ঘটনা ঘটত। বারবার ভৃত্যবর্গ বদলে দিয়েও চুরির নিষ্পত্তি ঘটত না। একবার তাঁর স্বামীর দামি হাতঘড়ি চুরি যায় বৈঠকখানা থেকে। কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যায় না ঘড়ি। অথচ বাড়ির মধ্যে থেকেই যখন গায়েব হল, তখন নিশ্চিত বাড়ির লোকই করে থাকবে। পুলিশে খবর দেওয়া হল। পরের দিন মুনশি এসে হাজির হল সেখানে।  ঘোষণা করা হল, চালপড়া খাওয়ানো হবে বাড়ির পঁয়ত্রিশ জন ভৃত্যকে। চালপড়া খাওয়ার আগের দিন উপোস থাকতে হত। পরেরদিন মুনশি দশসের চাল  ঠান্ডা জলে ধুয়ে চালপড়ার প্রস্তুতি নিতে লাগলেন৷ ফ্যানি জানাচ্ছেন,  আকবরবাদি টাকাকে লোকে  খুব গুরুত্ব দিত। মুনশি ছোটো এক নিক্তিতে একদিকে আকবরবাদি টাকা দিয়ে চাল ওজন করে ভাগে ভাগে রাখছিলেন। ওজন শেষ হলে একেকজন ভৃত্যকে ডেকে একমুঠো চাল দিয়ে শপথ করালেন- আমি চুরি করিনি, চুরি কে করেছে জানি না, চোরাই মাল সম্পর্কেও কোনো ধারণা নেই। 

    সমস্ত ভৃত্যই সে কথা শপথ করল। তারপরের নিয়ম হল, সেই চাল চিবিয়ে সামনের কলাপাতায় ফেলতে হবে। দেখা গেল, পঁয়ত্রিশ জন ভৃত্যের মধ্যে বত্রিশ জনের চিবোনো-চাল লালারসে সিক্ত। বাকি তিন জনের নাকি শুকনো খটখটে। মুনশি রায় দিলেন চুরিতে এই তিন জনের হাত আছে। পুলিশ তখনই সেই তিনজনকে হাজতে নিয়ে গেল। 

    চুরি-যাওয়া ঘড়িটি অবশ্য উদ্ধার হল না। শুধু জানা গেল কারা চুরির সঙ্গে যুক্ত। 

    চোর ধরার এই আজব পদ্ধতি দেখে ফ্যানি তো থ। অবশ্য এরমধ্যে একটা বিজ্ঞান তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন। যে চোর সে নাকি ভয়ার্ত হয়ে থাকবে। ফলে তার মুখ শুকনো থাকবে। সহজ সমীকরণে চোর ধরা। এদেশের অনেককিছুই ফ্যানি পার্কসকে  মুগ্ধ করেছিল। আবার আশ্চর্যও কম করেনি। অপরাধ দমনের এই বিশেষ পদ্ধতি তার মধ্যে একটি। নতুন দেশের নিত্যনতুন তরিবত।  খুঁটিনাটি যা দেখেছিলেন, বন্দি করেছিলেন ডায়েরির পাতায়। ভালোমন্দ মিশিয়ে। তবে দ্রষ্টব্য এটাই, সবমিলিয়েই ফ্যানি ভালোবেসেছিলেন এই দেশকে। এদেশের নিজস্বতাকে খাটো করে দেখেননি কখনো।

    সূত্র: ফ্যানি পার্কসের ভ্রমণ-বৃত্তান্ত,
    অন্য কলকাতা- বিশ্বনাথ জোয়ারদার

    ছবি: আ বরকন্দাজ, ফ্যানি পার্কস

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @