No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বার্ধক্যের অসুখে তুমুলভাবে বেঁচে থাকার জন্য একমাত্র শক্তিশালী ওষুধ লেখালেখি

    বার্ধক্যের অসুখে তুমুলভাবে বেঁচে থাকার জন্য একমাত্র শক্তিশালী ওষুধ লেখালেখি

    Story image

    লিখেই চলেছেন তিনি। এখনও পর্যন্ত তাঁর কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে ৪৬টি। তার বাইরে ছড়ার বই, প্রবন্ধের বইও আছে বেশ কয়েকটি। তাঁর বয়স এখন ৭৮ বছর। এই বয়স একটা সংখ্যা মাত্র, যে কারণে কলম এখনও থেমে যায়নি তাঁর।

    পুরো নাম ডঃ প্রণতি নাথ। মালদহ পি ডি ওমেন্স   কলেজের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপিকা তিনি। চলতি বছরের রথের মেলাতেও প্রবন্ধ সংগ্রহ নামে তার একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। অবসর জীবনে জমানো পেনশনের টাকায় তার এই বই প্রকাশ করা। তার বই কেও কিনুক আর না কিনুক, এটা প্রকাশ করাই তার নেশা। 

    তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, বিয়ে করে সংসার ধর্ম পালন করতে গেলে লেখালেখিতে সমস্যা হতে পারে। তাই বিয়ের পথে পা বাড়াননি। এখন শিলিগুড়ি হাকিমপাড়ার শরৎ বসু রোডে নিঃশব্দে লিখে চলেছেন। শরীর ভালো নেই। বার্ধক্যজনিত নানান রোগব্যাধি শরীরকে জড়িয়ে ধরছে ক্রমশ। কিন্তু ওই যে, যতদিন বাঁচবেন লিখবেন। কারণ সেই ভালোবাসাটুকু ছাড়া এই বয়সে আর তো কিছু নেই। প্রতিদিনই ডায়েরি লেখেন।৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক  দিবস। তার আগে প্রণতিদেবীর বার্তা, ছেলেমেয়েরা নতুন কিছু সন্ধানের জন্য মন নিয়ে পড়াশোনা করুক। ডিগ্রির জন্য নয়। শুধুমাত্র সিলেবাসভিত্তিক পড়াশোনা নয়, পারিপার্শ্বিক জ্ঞানের জন্য পড়াকেই তিনি গুরুত্ব দিতে চান। একসময় শিলিগুড়ি গার্লস হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চলে যান শান্তিনিকেতন। সেখানে গান ও নাচ শেখেন। তারপর প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। বিশ্বভারতীতে বিদেশি ছাত্রীদের জাপানি ভাষাও শেখাতেন তিনি। পরে প্রণতিদেবীর মা অসুস্থ হলে বিশ্বভারতী থেকে চলে আসেন শিলিগুড়ি। এরপরেই মালদা পিডি ওম্যানস কলেজে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপিকা হিসাবে নিযুক্ত হন। ৬০ বছর বয়সে সেখান থেকে অবসর নিয়ে শিলিগুড়ি হাকিমপাড়ার পৈতৃক ভিটাতে চলে আসেন। তবে ছাত্রীজীবন থেকে চাকরিজীবন, তারপর অবসরজীবন- কবিতা লেখার নেশা থামেনি কখনও।

    ১৯৪১ সালের ২৫ বৈশাখ দার্জিলিং জেলার কার্শিয়াংয়ে জন্ম প্রণতি নাথের। ‘শুকতারা’, ‘শিশুসাথী’র যুগ থেকে তাঁর লেখালেখি শুরু। মালদায় অধ্যাপনার সময়ও ‘বিহঙ্গ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। শৈশবে হাতে লিখে প্রকাশ করতেন পত্রিকা ‘সপ্তডিঙা’। বার্ধক্য আসার অনেক আগে শিলিগুড়িতে ‘মিলেমিশে’ নামে একটি পত্রিকা দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন।  বহু লেখালেখি করলেও একসময় সেসব নিয়ে বই প্রকাশের দিকে তাঁর অনীহা ছিল। শেষে বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক বন্ধুদের অনুরোধে ও আবদারে কবিতার বই প্রকাশ করেন। তিনি নিজেই জানাচ্ছেন, অমিয় গুপ্ত, পুষ্পজিৎ রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, অজিতেশ ভট্টাচার্য, মহাশ্বেতা দেবী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অভিজিৎ সেন, অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য এবং শান্তিনিকেতনের আরও অনেকে তাঁকে কবিতার বই প্রকাশ করতে একসময় প্রেরণা দিয়েছিলেন।

    যখন তাঁর বয়স একটু কম ছিল, আকাশবাণী শিলিগুড়ি থেকেও তাঁকে বহুবার নানা প্রবন্ধ ও কবিতা পাঠ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হত। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও চলছে তাঁর লেখালেখি। অনেক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সম্মান ও সংবর্ধনা পেয়েছেন আজীবন। আর তার জন্য এতটুকুও অহঙ্কার নেই। সহজ-সরল-আত্মভোলা-অনাড়ম্বর জীবন বেছে নিয়েছেন। তিনি পরিস্কারভাবে বলেন, “পেনশনের টাকা থেকে কিছু অর্থ বাঁচিয়ে বই প্রকাশ করি। আলাদাভাবে কোনো প্রকাশক আমার নেই। দরকার হলে কখনও ওষুধ কম সেবন করি।” আর রাতে কোনওদিন ওষুধ খেতে ভুলে গেলেও ডায়েরি লিখতে ভুল হয় না। লেখালেখিই যেন বার্ধক্যে    তুমুলভাবে বেঁচে থাকার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ওষুধ।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @