হঠাৎ একটা ‘পার্সেল’ বদলে দিল সবার জীবন : এক্সক্লুসিভ আড্ডায় ইন্দ্রাশিস আচার্য

ইন্দ্রাশিস আচার্যের প্রথম দুটি ছবি ‘বিলু রাক্ষস’ এবং ‘পিউপা’ সমালোচক মহলে সাড়া ফেলেছিল কয়েকবছর আগে। ইন্দ্রাশিস, যাঁর ছবি বানানোর একটা নিজস্বতা আছে। তাই এই মুহূর্তে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করা জরুরি বলে মনে হয়৷ তবে আগের ছবিগুলির তুলনায় ‘পার্সেল’ ছবিতে একটা মোটা দাগের গল্প আছে। সেই গল্পে ঢুকে পড়েছে অনেক লেয়ার, বৈচিত্র্য। তাই এই ছবি নিছক আর ন্যারেটিভ হয়ে থাকেনি৷ ডাক্তারি পেশার ঝুঁকি, একটি দাম্পত্য জীবনের টানাপোড়েন, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, হঠাৎ একটা পার্সেল আর ভায়োলিনের ঘনঘটা — ছবির মূল বিষয়বস্তু এগুলোই। ফোকাসে কোনো কিছুই নেই, আবার সবই ফোকাসে রেখে ছবি এগিয়েছে৷ আলোচনা তাই নানাভাবেই হতে পারে। আর ঠিক এই জায়গাতেই ইন্দ্রাশিস আচার্য বারবার নজর কাড়েন।
ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের সংলাপে বারবার ঘুরে ফিরে আসে, “আমাকে কেউ অদ্ভুতভাবে ট্র্যাক করছে”। ছবির স্লোনেস, দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের শট, দৃশ্য অনুযায়ী ভায়োলিনের রিপিটেশন চমৎকারভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে৷ ছবিটি আক্ষরিক অর্থেই একটি সাইকোলজিক্যাল এক্সপেরিমেন্ট। তাই বিশেষ কিছু বলে দেওয়াও নেই, আবার ব্যাখ্যাও নেই। সেইসঙ্গে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং দামিনী বসুর সংযত অভিনয় অন্য মাত্রা দিয়েছে। বিশেষভাবে বলব, অনেকদিন পর ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেন। দেশ-বিদেশের একাধিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘পার্সেল’ দেখানো হয়েছে৷ কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবি পেয়েছে উপচে পড়া ভিড়। নিজের ছবি নিয়ে কী বলছেন স্বয়ং পরিচালক, তা নিচে রইল। সম্প্রতি ছবিটি ‘হইচই’-এ দেখা যাচ্ছে। দেখার আগে অতশত না ভেবে আগে ছবিটি দেখে ফেলুন, তারপর সময়-সুযোগ পেলে ভাবুন।
ইন্দ্রাশিস আচার্যের সাক্ষাৎকার
সুমনঃ হঠাৎ একটা পার্সেল এলে আমরা অবাক হই বা আনন্দিত হই। আপনার ‘পার্সেল’ কতটা অবাক করল বা আনন্দ দিল?
ইন্দ্রাশিসঃ যেকোনো জিনিস যদি ক্রমাগত আসতে থাকে এবং তার সোর্সটা যদি আমি বুঝতে না পারি ঠিক কেন কীসের ভিত্তিতে পার্সেলটা আসছে, তাহলে কোনো জিনিসই আর ভালো থাকে না। পরেরদিন সংবাদপত্র থেকে দেখতে পাই সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে, এই ঘটে যাওয়ার ফলটাকে নিয়েই আমরা উদ্বিগ্ন হই, ঘটে যাওয়ার ঘটনার সূত্র কেবল বিশেষ কিছু জনের কাছে চিন্তার কারণ হয়। গতানুগতিক কমফোর্ট জোন থেকে হঠাৎ সরে গেলে আমাদের প্রতিক্রিয়া পাল্টে যায়। তখন টেনশন চেপে বসে।
সুমনঃ ছবি তৈরি হওয়ার আগের গল্পটা খুব জানতে ইচ্ছা করছে।
ইন্দ্রাশিসঃ ছবিটা তৈরি হয়েছে আমার ছেলের সাত বছরের জন্মদিনের পর৷ ওই জন্মদিনে একটা গিফট এসেছিল, যার মধ্যে কোনো নাম ছিল না৷ ছেলে খুবই এক্সাইটেড ছিল, কিন্তু আমরা কেউই বুঝতে পারছিলাম এটা কে পাঠিয়েছে। আর গিফটাও ঠিক বাচ্চাদের মতো ছিল না। একটা বই ছিল, যেটা যেকোনো বয়সীরাই পড়তে পারবে। সেখান থেকেই চিত্রনাট্য আসে এবং পরবর্তীতে ‘পার্সেল’ ছবি তৈরি হয়। তাছাড়া আমার একটা খুব প্রিয় ছবি আছে ‘ক্যাশে’। সেটাও একটা কারণ।সুমনঃ ২৫তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এক সাংবাদিক বৈঠকে আপনি আলোচনাক্রমে বলেছিলেন, কোনো জাজমেন্টাল জায়গা থেকে এই ছবিটা তৈরি হয়নি৷ যদি একটু বিস্তারিত বলেন...
ইন্দ্রাশিসঃ হ্যাঁ, আসলে সিনেমা নিয়ে আমরা ভীষণ জাজমেন্টাল হয়ে যাই। জাজমেন্টাল তখনই হওয়া উচিত, যখন দেখব মূল বিষয় থেকে আমার ছবিটা সরে যাচ্ছে। আমাদের সকলেরই চেষ্টা থাকে, ছবিকে ভালো জায়গায় উত্তীর্ণ করা। আজ আমার জায়গায় যদি ছবিটা অন্য কেউ বানাতেন, তাহলে তাঁর অ্যাপ্রোচটা নিশ্চয়ই অন্যরকম হত৷সুমনঃ আপনার আগের দুটো ছবি ‘বিলু রাক্ষস’ এবং ‘পিউপা’ দেশ-বিদেশে নানারকম সম্মান পেয়েছে। ‘পার্সেল’-ও সমানভাবে প্রচুর ফেস্টিভ্যাল এবং বেশ কয়েকটি পুরষ্কার পেয়েছে। দর্শক নতুন কী পেলেন ছবিটা দেখে?
ইন্দ্রাশিসঃ পশ্চিমবঙ্গে ‘পার্সেল’ প্রথম প্রিমিয়ার হয়েছিল কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে। সেখানে আমি ভারতীয় ছবি বিভাগে ‘হীরালাল সেন অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছিলাম পরিচালক হিসেবে। তারপর দেশ-বিদেশের অনেক জায়গায় গেছে। আলোচিত হয়েছে। বাংলায় রিলিজ করেছে। এখন ‘হইচই’ প্ল্যাটফর্মে দেখা যাচ্ছে৷ আগে হয়তো অনেকেই ছবিটা নানা কারণে দেখতে পারেননি৷ এখন দেখে নিতে পারছেন। প্রচুর ফিডব্যাক পাচ্ছি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তো বটেই, ব্যক্তিগত স্তরেও অনেক ভালো ভালো ফিডব্যাক পাচ্ছি। সুমনঃ ভয় নামক শব্দটা যেকোনো সম্পর্কের ক্ষেত্রেই সমস্যাদায়ক৷ আপনার ছবিতেও একটা সম্পর্কের কথা আছে৷ ভয় বলতে আপনি কী বুঝিয়েছেন?
ইন্দ্রাশিসঃ আমি ছবিতে কোনো কিছুই ব্যাখ্যা করি না। কারণ আমার মনে হয়, দর্শকরা খুবই বুদ্ধিমান। সেই স্পেসটা তাঁদের দেওয়া উচিত৷ ‘পার্সেল’-ও সেইভাবে বানানো। ধরা যাক, চরিত্র বাড়ি থেকে বাইরে বেরোচ্ছে। ক্যামেরাও সেই মতো এগোচ্ছে। সেখানে ক্যামেরাই ঠিক করে দিচ্ছে চরিত্র কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু যদি চরিত্রের পিছনে ক্যামেরাকে না মুভ করি, যদি ক্যামেরাকে ঘরেই বসিয়ে রাখি, তাহলে অনেকগুলো প্রশ্ন জন্মাতে পারে দর্শকদের মনে। আমি এই ছবিতে কোনো উত্তর খোঁজার চেষ্টা করিনি। এখানে চরিত্রের সঙ্গে দর্শকের একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। দুজনেই একইসঙ্গে যেন উত্তর খুঁজছেন। ‘পার্সেল’-এর একটা জার্নি আছে৷ গন্তব্য ঠিক করছেন দর্শকরা। সেইদিক থেকে আমি সফল হয়েছি।