“অভিনয় শিখে আসা যায় না, তুমি কতটা পড়াশোনা করছ, কী ভাবছ তার উপর নির্ভর করছে”

সোহিনী সেনগুপ্ত বাংলা থিয়েটার এবং চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিশালী অভিনেত্রী। ১৯৭৭ সালে মাত্র তিনবছর বয়স থেকে থিয়েটার করছেন ‘নান্দীকার’-এ। বাবা কিংবদন্তি নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত এবং মা প্রখ্যাত অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত। থিয়েটারে অবদানের জন্য পেয়েছেন সংগীত নাটক আকাদেমি এবং উস্তাদ বিস্মিল্লা খাঁ যুব পুরস্কার। ২০০০ সালে প্রথমবারের জন্য অভিনয় করেন অপর্ণা সেনের ছবি ‘পারমিতার একদিন’-এ। সেই বছরই জাতীয় পুরস্কার পান শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রাভিনেত্রী হিসাবে। এযাবৎকাল অবধি বাংলা রঙ্গমঞ্চে তাঁকে দেখা গেছে- ‘সুজন বাদিয়ার ঘাট’, ‘মাধবী’, ‘অন্ত আদি অন্ত’, ‘বাবলি’, ‘নাচনী’, ‘রাণী কাদম্বিনী’-সহ একাধিক মঞ্চসফল প্রযোজনায়। আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে নান্দীকার আয়োজিত ৩৬তম জাতীয় নাট্যমেলা। তার আগে নিজের থিয়েটার দল-সহ, অভিনয় এমনকি মি টু মুভমেন্ট নিয়ে কথা বললেন অভিনেত্রী সোহিনী সেনগুপ্ত। সাক্ষাৎকার গ্রাহক সুমন সাধু।
নাচনী নাটকে সোহিনী
• নান্দীকারের ৩৬তম জাতীয় নাট্যমেলা শুরু হচ্ছে। এই বিশাল কর্মকাণ্ডের পিছনের গল্পটা একটু শুনতে চাইব।
সোহিনী- পিছনের গল্পটা হচ্ছে টাকার অভাবের গল্প। এই নাট্যমেলা করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার থেকে পাঁচ লক্ষ টাকার অনুদান পাওয়ার কথা। কিন্তু সরকার এখনও মিটিংই করে উঠতে পারেনি। সেই টাকাটা আদৌ পাওয়া যাবে কি না জানি না। এইবছর ফেস্টিভ্যাল করার কথা যখন পরিকল্পনা করি, তখন ব্যাঙ্কে ৪০,০০০ হাজার টাকা ছিল। দশদিনের ফেস্টিভ্যাল, সেখানে আকাদেমি মঞ্চেরই ভাড়া প্রায় চার লক্ষ টাকা। যে কারণে মায়ের কাছে টাকা ধার নিই। মা সারাবছর ওই টাকাটা সরিয়ে রাখেন। আমাদের বন্ধু বিক্রম দাশগুপ্ত এবার পাশে দাঁড়িয়েছেন। এছাড়া আমাদের দলের সপ্তর্ষিও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছে। ও টেলিভিশন করে যেটুকু উপার্জন করেছে, সেখান থেকে কিছু সাহায্য করেছে। আর দর্শক যেমন যেমন আসেন, সেখান থেকে যা টাকা পাওয়া যায়, তা থিয়েটার দলগুলোকে দেওয়া হয়। প্রতিবছর একটু করে বুড়ো হই আর চিন্তা বাড়ে। কিন্তু কীভাবে যেন ফেস্টিভ্যালটা হয়েও যায় ভালো করে। আর একটা কথা না বললেই নয়, নান্দীকারে কিছু তরুণ-তরুণী আছেন, অনিন্দিতা, অর্ঘ্য, অয়ন, শুভদীপ এরকম প্রায় জনা কুড়ি ছেলে-মেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফেস্টিভ্যালের চেহারাটাই পাল্টে যায়।
বাবা রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও মা স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের পাশে সোহিনী
• নাটক বাছাই পর্বে কোন কোন জিনিসগুলিকে প্রাধান্য দেওয়া হয় বেশি?
সোহিনী- সারা ভারতবর্ষ জুড়ে আমরা তেমন ভালো নাটক খুঁজে পাইনি। আর মহারাষ্ট্র বা মুম্বাইয়ের কিছু ভালো নাটককে যে ডাকব, তাঁদের টাকা দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই। পাশাপাশি আমাদের রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অনেক নতুন ছেলে-মেয়ে ভালো কাজ করার চেষ্টা করছে। এবছর তাঁদের একটা সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছি। নতুন ছেলে-মেয়েরা থিয়েটারে আসুক, আমি এটার পক্ষে। নাহলে থিয়েটার আগামিদিনে এগোতে পারবে না। সারাবছর ধরে আমি, বাবা, মা, সপ্তর্ষি, দলের ছেলে-মেয়েরা যা যা নাটক দেখি, তার মধ্যে বাছাই করে ফেস্টিভ্যালে তাদের জায়গা দেওয়া হয়। এবছর উদ্বোধন করছেন আমার খুব কাছের বন্ধু পার্বতী দাস বাউল। এই বন্ধুদের জন্য আর কিছু ভালো দর্শকদের জন্যই এতবছর রমরমিয়ে আমাদের ফেস্টিভ্যালটা চলছে।
• সেই ১৯৬০ সালে নান্দীকারের জার্নি শুরু হয়।
সোহিনী- হ্যাঁ, আমি জন্মাইনি তখন। আমার নান্দীকার শুরু হয় ১৯৭৭-৭৮ সাল থেকে। তখন আমার বয়স তিন বা চার।
মাধবী নাটকে সোহিনী
• এটা তো অনেকটা সময়। এতগুলো বছরে বাংলা থিয়েটারের কী কী পালাবদল দেখলেন?
সোহিনী- পৃথিবীতে যেমন সবকিছুরই পালাবদল হয়, থিয়েটারেও হয়েছে। যে জিনিস না পাল্টে একেবারে স্থির থাকে, তা মরে যায়। এখন যেমন আমাদের পুরো দলটাই নতুন ছেলে-মেয়েরা দ্যাখে। আমি অতিথিশিল্পী মাত্র। পরিবারে যেমন জ্যেঠু কাকুরা বুড়ো হলে দায়িত্ব পড়ে নতুন প্রজন্মের উপর। এক্ষেত্রেও তাই। এই পরিবারটাই আসলে আমাদের প্রত্যেককে বাঁচিয়ে রাখে।
অলীক সুখ চলচ্চিত্রে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তর সঙ্গে সোহিনী
• আপনি তো এখন বিভিন্ন চলচ্চিত্রের মেন্টর হিসাবে কাজ করছেন।
সোহিনী- না, এই একটাতেই করলাম। রাজ চক্রবর্তীর ‘পরিণীতা’। কারণ শুভশ্রীকে আমার ভালো লেগেছে। ওর ভিতরে ছোটোবেলার আমিকে দেখতে পেয়েছি। প্রচণ্ড জেদি ও নির্ভীক একজন মেয়ে। ওর নিজের কিছু মূল্যবোধ আছে। শুভশ্রীর সঙ্গে এই কাজটা করে খুব আনন্দ পেয়েছি।
• মঞ্চ এবং পর্দা দুই ক্ষেত্রেই অভিনয় শেখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
সোহিনী- অভিনয় শিখে আসা যায় না। তুমি কতটা পড়াশোনা করেছ, তুমি কী ভাবো, তোমার মনন কীরকম, এই সবকিছুর বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে অভিনয়। অভিনয় নিজের যাপন থেকেই উঠে আসবে, আলাদা করে তা শেখা যায় না।
ইচ্ছে চলচ্চিত্রে সোহিনী
• কিছুদিন আগে ‘মি টু’ মুভমেন্ট নিয়ে আপনি সোচ্চার হয়েছিলেন। এবং একটি লেখায় বলেছিলেন, “আমরা ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে পার্থক্য করি না। আমার দলের নিয়ম হল মেয়েরাও একই সঙ্গে সেট তুলবে ও গোছাবে।” – কিন্তু এখনও আমাদের সমাজে ছেলে-মেয়ে বিভাজন-রেখা স্পষ্ট। এই সময়পর্বে আপনার বার্তা কী হবে?
সোহিনী- মেয়েদের আর বসে থাকলে চলবে না। যে মুহূর্তে একটা কিছু হবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। ছোটোবেলায় আমার সঙ্গে অপ্রীতিকর কিছু ঘটলে, রাস্তার মধ্যে মারামারিও করেছি। ভয় পেয়ে, কে কী বলবে, এসব নিয়ে আর ভাবলে চলবে না। যেমন দ্যাখো, আমার দলে প্রায় পুরো জিনিসটাই দ্যাখে একটা ছোট্ট মেয়ে অনিন্দিতা। নবদ্বীপ থেকে এসেছিল থিয়েটার করতে। এখন ও ‘মানুষ’ নাটকে লিড করে। ও কিন্তু পরবর্তীকালে কখনও সেক্রেটারি হবে। অনিন্দিতা অভিনয় করতে পারে, লাইট লাগাতে পারে, সেট তুলতে পারে, ফেস্টিভ্যালের জন্য বিজ্ঞাপনও আনে। আর এই সময়পর্বে আমার বার্তা হচ্ছে, কেউ একদম চুপ করে থাকবে না। প্রতিবাদে গর্জে উঠবে।
• কোন টেক্সট নাট্য রূপান্তর করতে চাইবেন আগামিদিনে?
সোহিনী- সপ্তর্ষি দুটো বড়ো টেক্সট নাট্য রূপান্তর করে দিয়েছে। আসলে এই মুহূর্তে আমাদের কাছে চারটে নাটক আছে। আর নান্দীকারের পরবর্তী কাজ হতে চলেছে ‘মৃত কবিদের উপত্যকা’।
• এযাবৎ কাল অবধি আপনার অভিনয় করা শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা কোনটি?
সোহিনী- বলতে পারব না গো। প্রত্যেকটা প্রযোজনাই আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।
পাঞ্চজন্য নাটকে সপ্তর্ষি মৌলিকের সঙ্গে সোহিনী
• সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে আপনি কি সিলেকটিভ? তাই এত কম দেখা যায়?
সোহিনী- হ্যাঁ, প্রচণ্ড সিলেকটিভ। কয়েকদিন আগে রাজ আমায় বলছিল, তোমাকে যেকোনো চরিত্র দিলে তোমারও মন ভরবে না, আমাদেরও মন ভরবে না। এখানে তোমার জন্য চরিত্র লেখার বড্ড অভাব। তোমাকে দিলে এক্সাক্টলি ঠিক হবে, এমন চরিত্র খুঁজে পাই না।
পারমিতার একদিন চলচ্চিত্রে সোহিনী। শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রাভিনেত্রী হিসাবে জাতীয় পুরস্কার।
• কিন্তু ‘পারমিতার একদিন’-এর পর আপনি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। তারও অনেক বছর পর ‘ইচ্ছে’তে অভিনয় করেছিলেন। এই যে এত বছরের গ্যাপ- আপনার মনখারাপ করে না?
সোহিনী- কখনও না। আমি সর্বক্ষণ ক্রিয়েটিভ প্রসেসে আছি। আমার কাছে সিনেমা আর থিয়েটার করাটাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। যখন বাচ্চাদের পড়াই তখন ক্রিয়েটিভ কাজ করছি। যখন বাড়িতে রান্না করি তখনও ক্রিয়েটিভ কাজের মধ্যে আছি। টাকা-পয়সার লোভ আমার নেই। কখনও মনেও হয়নি, এই কাজটা করলে ভালো টাকা পেতাম। আমি সবসময় ক্রিয়েটিভ জগতের মধ্যে বাঁচছি। তাই আলাদা করে কখনও ক্রিয়েটিভ খিদে তৈরি হয়নি।