সবাই ‘মাছি’ এই মাছির রাজত্বে

চারদিক ভনভন করছে এই মৃত্যু উপত্যকা। এই বেমানান চিত্রকল্প, রক্তমাখা ত্রিস্তরীয় লাশ বেঁচে থাকাগুলোকে আক্রান্ত করছে- করতালি দিয়ে স্বাগত জানানো হচ্ছে বিষাক্ত গেলাস কিংবা রাজার বস্ত্রহীনতাকে। মাছি বসছে শরীরে, মনে। পচে যাওয়া দেহে বসছে, ভালোবাসায় বসছে—নিয়ম করে মাছি বসছে, উড়ছে। জাঁ পল সার্ত্রে'র মূল কাহিনি অবলম্বনে অর্পিতা ঘোষের নির্দেশনায় নাটক 'মাছি'। যেখানে নাটক শুরু হওয়ার আগে দর্শকের প্রবেশের সময় থেকে একেবারে নাটকের শেষ পর্যন্ত একটা আবহ সারাক্ষণ কানের পাশে বাজতে থাকে। কুৎসিত সেই আবহ। ভনভন করতে থাকে একদল মাছিরূপী মানুষ।
সাধারণত পৌরাণিক নাটকের পাত্রপাত্রীরা থাকেন দেব-দেবতার হাতের পুতুল। কিন্তু সার্ত্রে গ্রীক দেবতা জিয়ুসকে ভিলেন বানিয়ে ফেলেছেন এই নাটকে। যে জিয়ুস হেরে যান মানুষ অরেস্টেসের কাছে। আসলে মানুষের তৈরি স্বাধীনতা আর অদম্য সাহসের কাছে দেবতার তৈরি বিপর্যয় হয়ত কিছুই না। আর এভাবেই রচিত হয় ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব। জ্ঞানের আলোতে অরেস্টেস নিজেকে মুক্ত করেছেন সকল কুসংস্কার এবং মিথ্যে ভয় থেকে। অর্জনে লিপ্ত হয়েছেন দৃষ্টির স্বচ্ছতায়। এ দৃষ্টিকে কেউ ধোকা দিতে পারে না, এমনকি ইজিসথাসও নন, যার ষড়যন্ত্রে যোগ রয়েছে স্বয়ং দেবতা জিয়ুসের। নিজের কাছে যা স্বচ্ছ, যা পরিষ্কার, তা করেই ছেড়েছেন অরেস্টস, তা সে যতই কঠিন হোক না কেন। তাঁর জন্মভূমি আরগোসের নাগরিকদের মুক্ত করতে চেয়েছেন প্রতিহিংসা থেকে। ‘মাছি’ জলজ্যান্ত হয়ে ওঠে এমনই দুর্গন্ধময় জীবনে। প্রত্যেকটি চরিত্রের নিজের সঙ্গে যুদ্ধ, স্ববিরোধী চিন্তাভাবনা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, যাবতীয় জটিল ব্যাপার স্যাপার খুব সহজে উঠে আসে।
ফরাসি অস্তিত্ববাদের কথা প্রথম বলেন জাঁ পল সার্ত্রে। এই অস্তিত্ববাদ নান্দনিক বিষয়কে প্রাধান্য দেয়। সার্ত্রে নিজে একজন সামাজিক সংস্কারবঞ্চিত মানুষ। সামাজিক সমস্যা সমাধানে তাঁর কথা হল মানুষের সত্তা বা অধিবিদ্যক ধারণার আদতে কোনো প্রয়োজনই নেই, কারণ তা মানুষের জীবনে সুখ পরিপূর্ণভাবে প্রদান করে না। মানুষের জন্য দরকার নিজের অস্তিত্বকে স্বীকার করা। আর এই অস্তিত্ব স্বীকৃত হলেই মানুষের জীবনে সত্য অর্জিত হয়। কারণ মানুষ সবসময়ই স্বাধীন। সার্ত্রের লেখা পড়লেই বোঝা যায় বিবেচনাহীনতার কাছে ব্যক্তিমানুষ কতই না অসহায়! ব্যক্তি যদি তার অস্তিত্ব বিষয়ে সচেতন থাকে তবে তাকে শোষণ করা সহজ নয়।
পঞ্চম বৈদিকের প্রযোজনা ‘মাছি’ খুঁজে নিতে চাইছে আজকের অরেস্টেসকে। সার্ত্রের মূল নাটক 'দ্য ফ্লাইজ'কে ভিত্তি করেই এই খোঁজ। এই নাটকে ঈশ্বর ও রাজা দু-জনেই আর্গোসবাসীকে পাপের ভয় দেখিয়ে তাঁদের নিজ আধিপত্যে রাখেন। এই দুইয়ের মাঝে বলি হওয়া আর্গোসবাসীকে পাপবোধ থেকে মুক্তি দেয় রাজকুমার অরেস্টেস এবং রাজকুমারী ইলেকট্রা। মূল নাটকটি লেখা হয় ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রাক্কালে। হিটলারের আগ্রাসনী ক্ষমতা যখন তুঙ্গে। এ তেমনই এক সময় হয়ত, যেখানে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে আর এক শক্তি। আর এখানেই এই নাটকের প্রাসঙ্গিকতা। নতুন করে অস্তিত্ববাদ নিয়ে ভাবার সময় হয়ত এসে গেছে। সময় এসেছে প্রতিটি বিষয়ে সচেতন থাকা এবং যাবতীয় লাঞ্ছনা, দমিয়ে রাখা, গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, আওয়াজ তোলা।
আরও পড়ুন
রাজার রঞ্জনে পৌঁছনোর কাব্য ‘আরা বাহা’
মাছিদের আবহ পুরো নাটকে একরাশ অস্বস্তি ছুঁড়ে দিয়েছে। আমাদের ভালোমন্দের বেঁচে থাকার উপর একদল শক্তি মাথা ঘামাচ্ছে। তাদের উত্তেজিত মস্তিষ্ক, অধৈর্য প্রতিমুহূর্তে বিষাদ ছড়িয়ে দেয়। সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে হাতের পুতুল, হাত থেকে পড়লেই যা ভেঙে যাবে। দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ভাবনায় নাটকের মঞ্চে তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন স্তর। একদিকে ঈশ্বর, একদিকে মানুষ, আরেকদিকে মাছি। গোটা নাটকের তারটি বেঁধে দিয়েছে ওই মাছিরূপী মানুষগুলো। নাটকে ব্যবহৃত আলো হয়ে উঠেছে চরম অভিব্যক্তিবাদের রূপক। মূলত লাল এবং নীল রঙের মায়ামায় আলোছায়ায় সৌমেন চক্রবর্তী (আলোক নির্মাতা) মূল ব্যঞ্জনাটি ব্যক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
রাজকুমার অরেস্টিসের ভূমিকায় গম্ভীরা ভট্টাচার্য চরিত্রের দৃপ্ততা বজায় রেখেছেন সুন্দর ভাবে। কথায় আছে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’। এখানে রাজপুত্র হয়েও তিনি একজন সাধারণ জনপ্রতিনিধি। বাঁধন মানেন না, বরং রাজকুমারীকে মুক্তির মন্ত্র শেখান। মূল নাটক থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে পরিবেশন করেছেন নির্দেশক। অরেস্টিস এসে দাঁড়ালেন ২০১৮-য়। রাজকুমারী ইলেকট্রার চরিত্রে তমালী চৌধুরী সুন্দর, তবে বড়ই উচ্চকিত। নাটকের স্বার্থে তা কতখানি প্রয়োজনীয় সে বিষয়ে সন্দেহ জাগে। জিয়ুসের ভূমিকায় শ্যামল চক্রবর্তী অনবদ্য। অন্যান্য চরিত্রে শ্যামাশিস পাহাড়ি, মোনালিসা চ্যাটার্জি, কোরক সামন্ত যথাযথ। আর যাঁদের কথা আলাদা ভাবে বলতেই হয় তাঁরা হলেন কোরাসের অভিনেতারা। শারীরিক অভিনয়, ফিসফিস গলার স্বর, আবহের সাথে তাঁদের উদ্দামতা সবকিছু দিয়ে নাটকের সুরটি বেঁধে দিয়েছেন। আবহ(শ্রেয়ান চট্টোপাধ্যায়) এ-নাটকের সম্পদ, প্রতিটি দৃশ্য ধরে রাখতে সক্ষম। নির্দেশক অর্পিতা ঘোষ বরাবর রাজনৈতিক ইস্যুকে সম্বল করে এর আগে শক্তিশালী কিছু প্রযোজনা উপহার দিয়েছেন। ‘মাছি’ তার ব্যতিক্রম নয়।
নাটক- মাছি
নির্দেশনা- অর্পিতা ঘোষ
বিশেষ কৃতজ্ঞতা- শাঁওলি মিত্র ও দেবেশ চট্টোপাধ্যায়
প্রযোজনা- পঞ্চম বৈদিক