আজও চণ্ডীদাসের সুরে মাতোয়ারা বীরভূমের নানুর

‘চণ্ডীদাস বাণী শুন বিনোদিনী, পিরীতি না কহে কথা।
পিরিতি লাগিয়া পরান ত্যাজিলে পিরীতি মিলয়ে তথা।।’
বৃন্দাবনে যেমন কানু ছাড়া গীত নাই, তেমনই চণ্ডীদাস ছাড়া সুর নাই নানুরে! এ নেহাত মিল খোঁজা নয়, নানুর নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসের নাম। বীরভূম জেলার প্রাচীন ইতিহাস সমৃদ্ধ গ্রাম নানুর। এখনও একই শব্দবন্ধে মানুষ বলে থাকেন চণ্ডীদাস-নানুর। সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রজকিনী-রামীর নামও।
বৈষ্ণব পদকর্তা হিসেবে চণ্ডীদাসের নাম সাহিত্যের ইতিহাসকারদের কাছে যেমন সুবিদিত, বিতর্কিতও। তাঁর পরিচয় নিয়ে রয়েছে খানিক ধোঁয়াশা। সাহিত্যের ইতিহাসে চণ্ডীদাস নামের একাধিক পদকর্তার সন্ধান মেলে। বৈষ্ণব সাহিত্যে তাঁদের মধ্যে দ্বিজ চণ্ডীদাস, চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাস এবং বড়ু চণ্ডীদাস - এই চারজন পদকর্তার উল্লেখ সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। কোনও কোনও সাহিত্যের গবেষক বলেন, চার জনই একই ব্যক্তি। একাংশের মতে, যে পদকর্তার বিভিন্ন রচনায় নানুর এবং সংলগ্ন এলাকার কথা ঘুরে ফিরে এসেছে তিনিই নানুরের চণ্ডীদাস।
পরবর্তীকালে নানুরের চণ্ডীদাসের স্বতন্ত্র পরিচিতি ঘটেছে। রামীর চণ্ডীদাস হিসাবে আখ্যায়িত হয়েছেন নানাজনের লেখায়। এখনও কবির সঙ্গে সমোচ্চারিত হয় তাঁর প্রেম-সাধিকা রামীর নামও। চণ্ডীদাসের বিভিন্ন পদেও রয়েছে তাঁর উল্লেখ। স্বভাবতই, কবির পাশাপাশি তাঁর প্রেমিকাকেও স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছেন এলাকার মানুষ। কবির সঙ্গে তাঁর যুগল মূর্তি নির্মাণ, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নামকরণ সেই উদ্যোগেরই নজির। যে ঘাটে রামী কাপড় কাচতেন সেই ঘাটের নাম দেওয়া হয়েছে রজকিনীর ঘাট। নানুরে এখনও ঘুরে ফিরে আসে একটি মিথ। সেখানে বলা হয় রামী একজন বাল্য বিধবা। জমিদারের নির্দেশেই নাকি গ্রাম্যদেবী বিশালাক্ষীর মন্দিরে পরিচারিকার কাজে বহাল হন। ওই সময় মন্দিরের পূজারীর দায়িত্বে ছিলেন স্বয়ং চণ্ডীদাস। তাঁরই প্রচেষ্টায় এবং দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে মন্দিরে প্রবেশাধিকার পান তথাকথিত ‘অচ্ছুৎ’ ধোপানি রামী। দু’জনের প্রণয় জন্মায়, ঘনিষ্ঠ হন। কথিত আছে, রামী যখন ঘাটে কাপড় কাচতেন, তখন ছিপ হাতে পুকুর পাড়ে বসে থাকতেন চণ্ডীদাস।
আরও পড়ুন
হারিয়ে গিয়েও জল থেকে ফিরে এলেন যে দেবী
এই প্রণয় অবশ্য জমিদার এবং সেই সময়ের সমাজপতিরা ভাল চোখে দেখেননি। কবি রামীকে ত্যাগ না করলে চণ্ডীদাসের বাবার সত্কার করতে পর্যন্ত অস্বীকার করে সে সময়ের সমাজ। কিন্তু রামীকে ত্যাগ করেননি চণ্ডীদাস। দু’জনের এই প্রণয় দেখে অবশেষে রামীকে চণ্ডীদাসের সাধনসঙ্গিনী হিসাবে মেনে নিতে বাধ্য হন সবাই।
নানুরে আজও চাপা পড়েনি ইতিহাস। ইতিহাসের গায়ে খোদাই করা আছে পদকর্তার গানের সুর, গানের ভাষা। চণ্ডীদাসের জন্মের মতোই মৃত্যু নিয়েও নানা মত রয়েছে। একটি মত হল, একদিন বিশালাক্ষী মন্দিরের আটচালায় কীর্তন গানে বিভোর ছিলেন সাধক কবি। তাতে যোগ দিয়েছিলেন নবাবের বাড়ির মহিলারাও। তাই নবাবের নির্দেশে কামান দাগা হয় ওই আসরে। তাতে সকলেই ধ্বংসস্তুপে চাপা পড়েন। সে স্তুপ আজও রয়েছে। অনেক পরে পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ বিভাগ এই স্থানকেই চণ্ডীদাসের সমাধি হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবু, চণ্ডীদাসের মৃত্যু নেই। গানের মধ্যে দিয়ে তাঁর সাধনা, সাধনার মধ্যে প্রেম, প্রেমের মধ্যে চুপটি করে বসে থাকা রামী, রামীর মধ্যে সহজ সাধন আর সবকিছুর মধ্যেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা বীরভূমের নানুর। মানুষ আজও ভোলেনি। চণ্ডীদাসের বসতভিটে দেখতে তাই ভিড় জমান আজও সাহিত্যপ্রিয় বাঙালি। আমাদের মধ্যে যদি কোথাও চণ্ডীদাস-রামী থেকে থাকেন, তাহলে নানুরের লালমাটির আরামটুকুও আছে কোথাও না কোথাও।