No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ‘আমরা বাঁকুড়াবাসী, মুড়ি খাই রাশি রাশি’ : দ্বারকেশ্বরের চরে জমজমাট ১৫০ বছরের মুড়ির মেলা  

    ‘আমরা বাঁকুড়াবাসী, মুড়ি খাই রাশি রাশি’ : দ্বারকেশ্বরের চরে জমজমাট ১৫০ বছরের মুড়ির মেলা  

    Story image

    ‘মুড়ি মুড়ি, ঝাল মুড়ি, ঝাল ঝাল মুড়ি খাবেন?’ – ব্যাস অমনি ব্যাগ থেকে ১০ টাকা বের করে হাত বাড়িয়ে দিতে মন চায়। লোকাল ট্রেনের নিত্যযাত্রীদের কানে এ শব্দ নতুন নয়। কিন্তু বাঙালির মুড়ি খাওয়ার অভ্যেস শুধু ট্রেনেই ফুরিয়ে যায় না। সকাল সন্ধ্যে চা খাওয়ার অভ্যেসে যদি খানিক মুড়ি জুটে যায় তবে তো কোনো কথাই নেই। লুচি-পরোটা কিংবা ডিম-পাউরুটির ভিড়ে মুড়ির প্রতি টান কমে না এক রত্তিও। মুড়ির সঙ্গে রাঢ়বাংলার মানুষের ভালোবাসা চিরন্তন। কিন্তু তা বলে মুড়ি নিয়ে আস্ত একটা মেলা, এ বোধহয় ভাবাই যায় না! প্রায় ১৫০ বছর আগেই এমন অভিনব উদ্যোগের কথা ভেবেছিলেন মেলা কর্তৃপক্ষ।

    বাঁকুড়া জেলার কেঞ্জাকুড়া গ্রাম। দ্বারকেশ্বর নদের ধারে শীতের শিরশিরানি গায়ে মেখে এখানেই চলে বাংলার এক পুরোনো মেলা। মুড়ি মেলা। নদের ধারে সঞ্জীবনী মাতার আশ্রম। মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে সেখানেই বসে হরিনাম সংকীর্তনের আসর। ফি বছর তা চলে মাঘের ১ থেকে ৪ তারিখ পর্যন্ত। আর শেষ দিন অর্থাৎ ৪ মাঘ নদীর চর মুড়িময়।

    আশ্রমের পার্শ্ববর্তী এলাকা এক সময় ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। দূরদূরান্ত থেকে আসা ভক্তরা হরিনাম সংকীর্তন শুনে সন্ধ্যার পরে আর বাড়ি ফিরতে পারতেন না। সঙ্গে করে বেঁধে আনা মুড়ি বাতাসাই ছিল একমাত্র ভরসা। সেই রেওয়াজই ধীরে ধীরে কখন যে আস্ত একটা মেলার চেহারা নিয়েছে, তা আর আলাদা করে ভেবে দেখা হয়নি কোনোদিন। কবে যেন নিজে থেকেই চিরাচরিত উৎসব হয়ে উঠেছে বাঁকুড়ার মুড়ি মেলা। 

    স্থানীয় বাসিন্দা অরিন্দম সেন জানান, “আমি ছোটোবেলা থেকেই দেখছি এই মেলা নিয়ে মানুষের মধ্যে অদ্ভুত এক উন্মাদনা। আমাদেরও বাড়ির অনেক আত্মীয় এই সময় মেলা উপলক্ষে বেড়াতে আসেন।” মুড়ি নিয়ে যে মানুষের আবেগের বাস্তব ছবি এমন হতে পারে, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হয় না। শখে মুড়ি খাওয়া কলকাতার বাঙালির কাছে কেঞ্জাকুড়ার ৪ মাঘের কথা শুনতে গল্পের মতো লাগবে। কিন্তু গল্প নয়, একথা সত্যিই। শুধু একটা গ্রাম নয়, পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ৫০- ৬০টি গ্রামের মানুষ জড়ো হন এই মেলায়। উপচে পড়া ভিড়ের ছবি প্রতিবছরই লেন্স বন্দি হয় মাঘের ৪ তারিখ।

    পরিবার পরিজন নিয়ে, শীতের আমেজে বেরিয়ে পড়েন বাঙালি। নদীর পাশে বসে জমিয়ে আসর। খবরের কাগজ কিংবা গামছা পেতে ঢালা হয় মুড়ি। মুড়ি মাখা হয় পঞ্চব্যঞ্জন সহযোগে। তেল, নুন, বাদাম, চানাচুর, নিমকি, কড়াইশুঁটি, শশা, পেঁয়াজ, নারকেল ইত্যাদি আরও কত কী! উপচারের শেষ নেই। মেনুতে যোগ হয় আলুর চপ, বেগুনি, সিঙাড়াও। শেষ পাতে আবার মিষ্টি মুখের স্বাদ জোগাতে যোগ হয় নারকেল নাড়ু কিংবা পিঠের মতো খাবারও।

    সহেলি দাস, কর্মসূত্রে কলকাতায় থাকলেও বাঁকুড়ার মুড়ি খাওয়ার রেওয়াজ ভুলতে পারেননি তিনি। তাঁর কথায়, “এখন আর প্রতি বছর যাওয়া হয় না, কিন্তু আগে সবাই মিলে এই দিন মেলায় না গেলে মন খারাপ হয়ে যেত। ঘরে বসে মুড়ি খাওয়া আর মেলায় মুড়ি খাওয়া, স্বাদের যেন কীরকম অদ্ভুত হেরফের হয়ে যেত।”

    “আমরা বাঁকুড়াবাসী, মুড়ি খাই রাশি রাশি” – লোকমুখে প্রচলিত এই প্রবাদের আড়ালে লুকিয়ে আছে মেলার ঐতিহ্য। বাঁকুড়ার মানুষের কাছে মুড়ি এতটাই জনপ্রিয় যে কথিত আছে, একবার আকাশপথে ঢেঁকিতে চড়ে যাওয়ার পথে স্বয়ং নারদ মুনি মুড়ি ভেজানোর চোঁ-চোঁ শব্দে রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। মুড়িতে জল দিয়ে খাওয়ার এই রেওয়াজ বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমানের মানুষের কাছে নতুন নয়। দ্বারকেশ্বরের চড়ের বালি সরিয়ে জল বের করে সেই জলে মুড়ি মেখে দিব্যি চলে খাওয়াদাওয়া।

    মেলা ১৫০ বছরের পুরোনো হলেও এমন জাঁকজমক বিগত ত্রিশ বছর ধরে। তার আগে মেলা ছিল গ্রামীণ পরব মাত্র। কিন্তু আজ এই মেলার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়েছে যে, বাঁকুড়া ছাড়িয়ে মুড়ি পরব এখন হানা দিয়েছে বর্ধমানেও। পৌষ সংক্রান্তির দিন বর্ধমান-পানাগড়ের কাঁকসা গ্রামেও একইভাবে পালিত হয় ‘মুড়ি মেলা’।

    বাঁকুড়ার মেলায় হাজির হওয়া গ্রামবাসীদের জন্য এ দিন দুপুরে খিচুড়ি প্রসাদের ব্যবস্থা থাকে সঞ্জীবনী মাতার আশ্রমে। দ্বারকেশ্বরে স্নান, মুড়ি খাওয়া, শীতের আড্ডা, আর শেষ পাতে খিচুড়ি প্রসাদ, সব মিলিয়ে মাঘ মাসের শুরুটা ফি বছর দিব্যি জমে ওঠে। তারপর ফের নতুন একটা বছরের অপেক্ষা নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে নিজের নিজের গ্রামের পথে পা বাড়ান আট থেকে আশির দল।

    ছবিঃ সন্দীপ কর্মকার

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @