No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলার পটচিত্রে দুর্গাপুজো

    বাংলার পটচিত্রে দুর্গাপুজো

    Story image

    থিমের ভারে উৎসবের আলোকবৃত্ত থেকে অনেকটা দূরে সরে গেলেও বাংলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্য পটদুর্গা। প্রখ্যাত পটশিল্প গবেষক অঞ্জন সেন বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “বাংলায় প্রায় হাজার বছর বা তারও আগে থেকে দুর্গাপুজোর প্রচলনের কথা জানা যায়। মার্কণ্ডেয় পুরাণের দেবীমাহাত্ম্য অংশে মাটির দেবীমূর্তি নির্মাণের উল্লেখ আছে। একাদশ শতকের কালিকাপুরাণ বা শূলপাণির দুর্গোৎসব-বিবেক গ্রন্থেও মৃণ্ময়ী মূর্তির উপাসনার বিবরণ আছে। সেই সময়েই সম্ভবত পটদুর্গার প্রচলন হয়েছিল। ধীরে ধীরে সেটি একটি শিল্পের রূপ নেয়।”

    বাংলাতে সবরকম চিত্রশিল্পীদের পটুয়া বলা হয়, কিন্তু পটুয়া সম্প্রদায় আলাদা একটি জাতি। এঁরা মূলত দীঘল পট বা জড়ানো পট আঁকতেন। কিছু কিছু চৌকো পটও আঁকতেন। এইসব চৌকো পটে দুর্গার লোকায়ত দিকটি ধরা পড়ে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ সংগ্রহশালা-তে এই ধরনের কিছু পট সংরক্ষিত আছে। তার একটিতে দেখা যায় রামের দুর্গা বন্দনার দৃশ্য। এছাড়া ব্রতচারী সংগ্রহশালা-তেও বেশ কিছু পটচিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। শুধু সংগ্রহশালাতেই নয়, বেশ কিছু জায়গাতে মণ্ডপেও দেখা মেলে পটদুর্গার। বাংলার বেশ কিছু জায়গায় আজও চলে আসছে পটদুর্গার পুজো। মলরাজ রাজবাড়ি, বিষ্ণুপুর রাজবাড়িতে আজও পটের দুর্গাকে পুজো করা হয়। এছাড়াও বাঁকুড়ার মল্লিকবাড়ি, বীরভূমের হাটসারিন্দা, পূর্ব মেদিনীপুরের নয়াগ্রামে পটদুর্গার পুজোর প্রচলন আছে। বর্ধমান রাজবাড়ির পটেশ্বরী দুর্গা খুবই বিখ্যাত। সূত্রধর, কুম্ভকার, কর্মকার প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষ আঁকেন দুর্গাপট। মুসলমানদের মধ্যেও রয়েছেন জাত পটুয়া সম্প্রদায়। কারণ, দুর্গার পটচিত্র আসলে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বাঙালির উৎসবের দ্যোতক।  

    দুর্গাপট- মল্লিকবাড়ি, বাঁকুড়া

    গত বছর হাতিবাগান সার্বজনীন দুর্গোৎসবের মণ্ডপসজ্জার থিম ছিল পটচিত্র। দুর্গাপট, কালীপট, মনসাপটে সেজে উঠেছিল সারা মণ্ডপ। মণ্ডপসজ্জায় ছিলেন সঞ্জীব সাহা এবং প্রতিমা তৈরিতে সনাতন দিন্দা। সঞ্জীববাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আগে আমি বাংলার লোকায়ত শিল্প নিয়েই কাজ করতাম। মাঝে অনেকদিন ইনস্টলেশনের কাজ করেছি। গত বছর মনে হলো অন্যরকম কিছু করার। তাই পটচিত্রের উপর থিম করেছিলাম।” মণ্ডপের সামনের দিকে দশ ফুট ব্যাসার্ধের মাটির সরায় আঁকা দুর্গাপট, সারা মণ্ডপ জুড়ে মাটির সরায় আর মোটা কাপড়ে আঁকা বিভিন্ন দেবদেবী আর পৌরাণিক দৃশ্যের চিত্র, প্রতিমার চালচিত্রে পটের ছবির ব্যবহার, সঙ্গে পটুয়াদের গান- শহর কলকাতার বুকে গ্রাম্য সংস্কৃতির একখণ্ড প্রতিফলনে নজর কেড়েছিল হাতিবাগান সার্বজনীন, জিতে নিয়েছিল বহু পুরস্কার। এই পুজোর কথা এবছরেও নির্ঘাত ভোলেননি দর্শনার্থীরা।  

     

    এই প্রসঙ্গে বলতে হয় কালীঘাটের পটচিত্র-এর কথা। কারণ, কালীঘাটের পট একটি মৌলিক শিল্পধারা। সেই শিল্পরীতিকে নাগরিক শিল্পরীতি নামে অভিহিত করেন বিশেষজ্ঞরা। অঞ্জন সেন বলেন, “মোটামুটি ১৮০০ সাল নাগাদ কালীঘাটের পট আঁকা শুরু হয়। প্রথমে তীর্থযাত্রীদের জন্য স্মারক হিসাবে মাটির সরাতে দুর্গার চিত্র আঁকা শুরু হয়েছিল। তারপর তীর্থযাত্রীদের সমাগম বাড়তে থাকার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে চাহিদা। ফলে শিল্পীরা মোটা কাগজে দ্রুত হাতে, দীর্ঘ বলিষ্ঠ রেখায় পটদুর্গা আঁকা শুরু করেন। ১৯৩০ সালের পর থেকে কালীঘাটের পটচিত্র আঁকা বন্ধ হয়ে যায়।” কালীঘাট ছাড়াও এই পট পাওয়া যেত বিভিন্ন গ্রামীণ মেলাতেও। বিভিন্ন রাজবাড়িতেও পুজো করার জন্য কালীঘাটের পট নিয়ে যাওয়া হতো।  

    হাতিবাগান সর্বজনীন দুর্গোৎসব ২০২২ প্রতিমা

    কালীঘাটের পটশিল্পীদের কাছে শিব-পার্বতী এবং গণেশজননী রূপী দুর্গা ছিল খুবই প্রিয় বিষয়। অন্যান্য পটশিল্পীদের কাজেও দুর্গার লোকায়ত রূপটি ধরা পড়ে। এই প্রসঙ্গে গুরুসদয় দত্তের একটি বিশ্লেষণের কিছু অংশ লেখা দরকার, যা অঞ্জন সেন ব্যবহার করেছিলেন বঙ্গদর্শনের পাক্ষিক পত্রিকা শনিবারের কড়চা-র পটচিত্র সম্বন্ধীয় তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধে। গুরুসদয় দত্তের বিশ্লেষণটি নিম্নরূপ-

    “শিবকে তাহারা (পটুয়ারা) চিত্রিত করিয়াছে বাংলার গৃহস্বামী রূপে এবং পার্বতীকে চিত্রিত করিয়াছে বাংলার সাধারণ গৃহিণী রূপে। দুর্গাকে বাগদিনীর রূপে চিত্রিত করিতে তাহারা সাহস করিয়াছে।” 

    দুর্গাপট- হাটসারিন্দি, বাঁকুড়া

    লোকাচারের পাঁক পেরিয়ে এসে সমাজ এখন আধুনিক। নারীশক্তি, নারী স্বাধীনতার বিষয়গুলি অ্যাকাডেমিক পরিসরের বাইরে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে ঘরে। কিন্তু আজ থেকে একশো-দুশো বছর বা তার আগে এই বিষয়গুলি এত সহজ ছিল না। সেই সময়েই এতটা প্রগতিশীল ভাবনায় পটচিত্র হয়ে উঠেছিল সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা শিল্প। শুধু নান্দনিকতাতেই নয়, সমাজ সচেতনতাতেও। আর এখানেই দুর্গা হয়ে ওঠেন বাংলার ঘরের মেয়ে, বা বাংলার ঘরের মেয়েরাই হয়ে ওঠেন দুর্গতিনাশিনী। অন্যান্য অনেক শিল্পের মতনই পটদুর্গার ক্ষেত্রেও রাজা বা জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। জামকুড়ির মলরাজ বংশে দুর্গাপট আঁকতেন কর্মকার বংশের শিল্পীরা। ঝাড়গ্রামের রাজবাড়িতে পুজো করা হতো পটের দুর্গার। আঁকতেন কর্মকার সম্প্রদায়ের শিল্পীরা। বাঁকুড়ার ফৌজদার সম্প্রদায় আঁকতেন বিষ্ণুপুরের রাজবাড়ির পটদুর্গা। তাঁরা এখনও বংশপরম্পরায় করে আসছেন এই কাজ। তবে এই শিল্পে নতুন প্রজন্মের যোগদানের হার কমছে।  

    যদিও কিছু কিছু জায়গায় পটদুর্গার প্রচলন আজও রয়ে গেছে, তবু সেই হার কমে আসছে দ্রুত। বাংলার এই নিজস্ব চিত্ররীতি বাঁচবে কিনা, তার উত্তর দেবে সময়।

    ছবিঋণঃ অঞ্জন সেন এবং শ্বাশ্বত বসু (হাতিবাগান সার্বজনীন)

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @