No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    রবীন্দ্র সরোবরের দুর্গা মিউজিয়াম, যেখানে সারাবছরই দুর্গাপুজো

    রবীন্দ্র সরোবরের দুর্গা মিউজিয়াম, যেখানে সারাবছরই দুর্গাপুজো

    Story image

    চেতলা অগ্রণী-র ২০১৭ সালের প্রতিমা

    পুজো শেষ। স্বাভাবিকভাবেই ভারাক্রান্ত আপামর বাঙালির মন। আরও কি কয়েকটা দিন চলতে পারত না পুজোটা? এইসব প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় না জেনেও, প্রত্যেক বছর পুজোর সমাপ্তিতে এই অবাঞ্ছিত প্রশ্নগুলিই উঁকি দেয় আমাদের মনে। বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো। গত বছর ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পেয়েছে বাংলার পুজো। ফলত এবারেও দুর্গাপুজো জমকালো এবং জমজমাট করেছেন উদ্যোক্তারা। আলোয় আলোয় সেজে উঠেছিল কল্লোলিনী তিলোত্তমা। মহালয়া থেকেই ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়েছিলেন সাধারণ মানুষ। শহরের রাজপথে তিল ধারণের জায়গা ছিল না কয়েকদিন আগেও। স্বাভাবিকভাবেই পুজোর সমাপ্তিতে সেই জনজোয়ারে ভাটা পরেছে। আবার নিজেদের রুটিনমাফিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছেন সাধারণ মানুষ এবং দেখছেন ক্যালেন্ডার, কেননা আবার শুরু হয়েছে এক বছরের সুদীর্ঘ প্রতীক্ষা।

    দুর্গা মিউজিয়ামের অন্দরসজ্জা

    কলকাতায় প্রতিবছর ছোটো-বড়ো মিলিয়ে প্রায় ৬,০০০ পুজো হয়। স্বাভাবিকভাবেই কোনো মানুষের পক্ষে সব পুজো দেখা সম্ভব নয়। দুঃখের বিষয় হল পুজো শেষে বিসর্জন দিয়ে দেওয়া হয় এই সুন্দর প্রতিমাগুলি। একে একে খুলে নেওয়া হয় মণ্ডপ এবং থিমের কাজে ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিসপত্র। ফলতঃ পুজো পরবর্তী সময়ে একপ্রকার নষ্টই হয় অপরূপ শিল্পকর্মগুলি। তবে গত কয়েক বছরে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে। বর্তমানে সুন্দর প্রতিমাগুলি অনেক সময় কোনো হোটেল কিংবা রিসোর্ট-এর প্রাঙ্গনে রাখা হয় যা সেখানকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। এছাড়াও বেশ কিছু মূর্তি পার্ক, মেট্রো স্টেশন প্রভৃতি জায়গায় স্থাপন করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের জন্য। তবে এর সংখ্যা খুবই নগণ্য। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আর যাই হোক সব পুজো কিংবা প্রতিমাগুলি সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

    এই কারণেই ২০১২ সালে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের উদ্যোগে ঢাকুরিয়া লেক বা রবীন্দ্র সরোবরে তৈরি হয় একটি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের বিশেষ বিশেষ কিছু দুর্গা প্রতিমা সংরক্ষণ করা। প্রত্যেক বছর সারা বাংলা থেকে সবচেয়ে সুন্দর কয়েকটি প্রতিমা এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত করা হয়। মিউজিয়ামে আপনি বারো মাস দুর্গার দর্শন পাবেন। সেহেতু মিউজিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে – মা ফিরে এলো। রবীন্দ্র সরোবরের দক্ষিণ প্রান্তে বাঙালির সবচেয়ে বড়ো উৎসবের ধারক এবং বাহক হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই মিউজিয়াম। তবে রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনের ২ নম্বর গেটের কাছে অবস্থিত এই মিউজিয়ামটি স্থানীয় মানুষদের মধ্যে জনপ্রিয় হলেও শহর জুড়ে ততটা পরিচিতি পায়নি এখনও। অনেকের মতে এটি শহর কলকাতার একটি ‘হিডেন জেম’। এখানে রয়েছে চেতলা অগ্রণী (২০২০/প্রতিমা শিল্পী অনির্বাণ দাস), বকুলবাগান সর্বজনীন (২০১৭/প্রতিমা শিল্পী বিমান সামন্ত), আলিপুর ৭৮ পল্লি (২০১৯/প্রতিমা শিল্পী অভিজিৎ ঘটক), ভবানীপুর ৭৫ পল্লি (২০১৭/প্রতিমা শিল্পী বিমান সাহা), ৭৪ পল্লি খিদিরপুর (২০২০/প্রতিমা শিল্পী নির্মল মল্লিক)-সহ আরও অনেক ক্লাবের দুর্গা প্রতিমা।

    ২০১২ সালে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের উদ্যোগে ঢাকুরিয়া লেক বা রবীন্দ্র সরোবরে তৈরি হয় একটি মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজ্যের বিশেষ বিশেষ কিছু দুর্গা প্রতিমা সংরক্ষণ করা।

    মা ফিরে এলো - প্রধান গেট

    প্রত্যেকদিন সকাল ৭টা থেকে ৯টা এবং দুপুর ৩টে থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মিউজিয়ামটি। এখানে ঢোকার জন্য কোনো টিকিট কাটতে হয় না, ছবি তোলার ক্ষেত্রেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। মিউজিয়ামে ঢুকতেই আপনার চোখে পড়বে গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা টেরাকোটার দুটি বিশালাকার প্রদীপ এবং সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সুসজ্জিত টাওয়ার। সেই টাওয়ারে আলো দিয়ে লেখা মিউজিয়ামের নাম মা ফিরে এলো। এরপর একটু এগোলেই আপনি পরপর তিনটে দুর্গা প্রতিমা দেখতে পাবেন। প্রতিমাগুলির মধ্যে সবচেয়ে নজর কাড়ে ২০১৭ সালের চেতলা অগ্রণীর দুর্গা প্রতিমাটি। এছাড়াও তার আশেপাশে রয়েছে আরও অনেক অপূর্ব সুন্দর দুর্গা প্রতিমা। তবে কয়েকটি প্রতিমার নিচে সাল এবং শিল্পীর নাম উল্লেখ থাকলেও অধিকাংশ প্রতিমার ক্ষেত্রেই তার দেখা মেলে না।

    এই মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ রঙিন চক দিয়ে তৈরি দুর্গা প্রতিমা। ২০২২ সালে জিতেন্দ্র স্মৃতি সংঘের দুর্গাপুজোয় বানানো হয়েছিল প্রতিমাটি। এই অপরূপ শিল্পকার্যের স্রষ্টা হলেন শিল্পী স্বপন সরকার। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানান, “এটি আসলে এক বিশেষ ধরনের চক দিয়ে তৈরি। এই রঙিন চক আমি মুম্বাই থেকে আনিয়েছি। তবে দুর্গা প্রতিমাই আমার প্রথম চক দিয়ে বানানো প্রতিমা নয়। আজ থেকে বছর ১৫ আগে চক দিয়ে একটি সরস্বতী মূর্তি বানিয়েছিলাম। এই পুজোর উদ্যোক্তারা যখন বললেন একদম অভিনব কিছু বানাতে তখন আমার মাথায় এলো চক দিয়ে মূর্তি বানানোর কথা। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখি, মূর্তিটি ৯ জন মহিলা এবং আমি নিজে, অর্থাৎ আমরা মোট ১০ জন মিলে তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে বানিয়েছি।” স্বপনবাবু জানান এই পুজোর থিম ছিল ‘লক্ষ্য’। তাঁর মতে জীবনে লক্ষ্য অর্জন করার মূল চাবিকাঠি হল পড়াশোনা এবং এর শুরুই হয় চক দিয়ে। এই জন্যেই চক দিয়ে দুর্গা প্রতিমা বানানোর পরিকল্পনা মাথায় আসে তাঁর।

    দেওয়ালে টেরাকোটার কাজ

    রাজ্য সরকারের এই মিউজিয়াম বানানোর সিদ্ধান্তের ফলে শিল্পীদের সুন্দর সৃষ্টিগুলি দীর্ঘদিন সংরক্ষিত হতে পারে বলে মনে করেন স্বপনবাবু। তাঁর কথায়, “রাজ্য সরকারের এই মিউজিয়াম বানানোর সিদ্ধান্তকে আমি সাধুবাদ জানাই। গত বছর আমি একটা পরীক্ষামূলক কাজ করেছিলাম যা সকলের পছন্দ হয়েছে। এই মিউজিয়ামের সুবাদে সেটি সংরক্ষিত হয়েছে। আশা করি অন্তত ১৫-২০ বছর পরেও মানুষ এই প্রতিমাটি দেখবেন। বিসর্জন দিয়ে দিয়ে দিলে তো আর তা হতো না। এখনও অনেক মানুষ এই ঠাকুরটি মিউজিয়ামে দেখে আমায় ফোন করেন। আমার খুব ভালো লাগে।” একই সঙ্গে স্বপনবাবু জানান, রাজ্য সরকারের কাছে তাঁর অনুরোধ এই মিউজিয়ামটি আরও বড়ো করার, যাতে আরও বেশি সংখ্যক প্রতিমা এখানে রাখা যায়।

    রঙিন চক দিয়ে নির্মিত দুর্গা প্রতিমা

    একই সুর শোনা গেল শিল্পী নির্মল দাসের গলায়। দুর্গা মিউজিয়াম নিয়ে তিনি বলেন, “নিঃসন্দেহে রাজ্য সরকারের দারুণ একটি উদ্যোগ ছিল এটি। দুর্গাপুজো কীভাবে হয়, পুজোর ইতিহাস-সংস্কৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই মিউজিয়াম।” সম্প্রতি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পেয়েছে বাংলার দুর্গাপুজো। নির্মলবাবুর মতে এর ফলে আরও বেশি মানুষ আসবেন এই মিউজিয়ামে। তিনি বলেন, “বাংলার দুর্গাপুজোর সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া। তবে এই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তকমা পাওয়ার পর তার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বিশ্বব্যাপী। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসছেন কলকাতা তথা বাংলার পুজো দেখতে। এই মিউজিয়ামের সুবাদে, বছরের যে কোনো সময়েই সুন্দর প্রতিমাগুলি মানুষ দেখতে পারবেন।”

    টেরাকোটার প্রদীপ - আরেকটি গেট

    প্রতিদিনই নিয়মিতভাবে ঢাকুরিয়া লেক-এ হাঁটতে আসেন জনৈক বৃদ্ধ সমরেশ ভাদুড়ি। সমরেশবাবু জানান তিনি সময় পেলেই এসে ঘুরে যান এই মিউজিয়াম থেকে। তাঁর কথায়, “এই মিউজিয়ামটি হওয়ায় দুটি ভালো জিনিস হয়েছে। প্রথমত, এই বয়সে আর ভিড় ঠেলে ঠাকুর দেখা হয়ে ওঠে না। আশেপাশের ঠাকুর দেখি আর প্রত্যেকবার পুজোর সময় গিন্নিকে নিয়ে এখান থেকে একবার ঘুরে যাই। মনে হয় প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে এসেছি। দ্বিতীয়ত, যারা পুজোর সময় কলকাতায় আসতে পারেন না তারাও চাইলে এখানে এসে ঠাকুর দেখতে পারেন। আমার ছেলে স্ত্রী-সন্তান সহ কোপেনহেগেনে থাকে। দুর্গাপুজোর চল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ব্রিটেনে থাকলেও ডেনমার্কে এখনও সেভাবে নেই বললেই চলে। আমার নাতনি শুধু দুর্গাপুজোর কথা আমাদের মুখেই শুনেছে আর ফেসবুকে ছবি দেখেছে। এই এপ্রিলে যখন ওরা এলো আমি ওকে এখানে ঠাকুর দেখাতে নিয়ে এসেছিলাম। খুশি হয়েছিল খুব।” সমরেশবাবু জানান, “মিউজিয়ামটি আছে প্রায় ১০-১১ বছর হয়ে গেল। তবে গত দু-বছর ধরে দেখছি এখানে মানুষের সমাগম বেড়েছে। বাঙালির দুর্গাপুজা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই এই মিউজিয়ামকে নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহ বেড়েছে। তবে এখানে খোলা রাখার সময়টা আরেকটু বাড়ালে আমার মনে হয় সকলের পক্ষেই ভালো হবে।”

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @