No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    বাংলায় পটচিত্রের বিষয়ভাবনায় বিপ্লব এনেছিলেন দুখুশ্যাম চিত্রকর

    বাংলায় পটচিত্রের বিষয়ভাবনায় বিপ্লব এনেছিলেন দুখুশ্যাম চিত্রকর

    Story image

    মেদিনীপুর (Medinipur) জেলার পিংলার (Pingla) নয়ার (Nayagram) পটুয়া দুঃখুশ্যাম চিত্রকর (Dukhushyam Chitrakar)। তাঁর কাছেই শিক্ষা নিয়ে আজ বহু শিল্পী দেশ-বিদেশে কাজ করছেন। পটচিত্র ঘরানায় রীতিমতো বিপ্লব এনেছিলেন দুখুশ্যাম। পঞ্চাশ ষাটের দশকের রাজনৈতিক গান বেঁধে বিখ্যাত হয়েছিলেন। অতুল্য ঘোষ, প্রফুল্ল সেন কে তীব্র ব্যঙ্গ করে বেঁধেছিলেন ‘কংগ্রেস বিপ্লবী’ পট। আর সভা সমিতি হলে সেই সব গান মঞ্চে গেয়েও বেড়াতেন। মুসলিম হয়ে হিন্দু দেবদেবীদের পট আঁকার অপরাধে তাঁকে প্রায় একঘরে করে দেয় মোড়ল-মৌলবিরা। তবু, দমিয়ে রাখা যায়নি তাঁর শিল্পী সত্ত্বাকে। রাজনীতি, এইচআইভি বা ডিপ টিউবওয়েল – পটচিত্রের (Patachitra) বিষয়ভাবনায় অভিনবত্ব এসেছিল তাঁর হাত ধরেই। ২০২২-এর ১০ মার্চ ৭৮ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন প্রবীণ এই শিল্পী।

    “দুখুকে আমি ৭০-এর দশক থেকে চিনি। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পট শিল্পের কাজ করে গেছে ও। এখনকার পটশিল্পীদের সব সামগ্রীই তো ‘সিনথেটিক’। কিন্তু দুখুরা তো রং থেকে শুরু করে সবটা নিজে হাতে তৈরি করতো। দুখুর একাধিক পোট্রেট এঁকেছি আমি। একসঙ্গে অনেক কাজও করেছি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। দীপকদা (দীপক মজুমজার), আমি, দুখু... কত কত স্মৃতি। কলকাতায় এলে আমার বাড়িতেই উঠতো বেশির ভাগ। খুব ঘুরে বেড়াতো। পটের সূত্রে বিদেশেও গেছে অনেকবার। ওর হাত ধরেই সব উঠলো। একটা প্রজেক্টে একসঙ্গে কাজ করার কথা চলছিল কিন্তু, তার আগেই চলে গেল ও।” বলছিলেন শিল্পী হিরণ মিত্র (Hiran Mitra)। পটচিত্রও যে মূলধারার আর্ট-এর অংশ তা বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। দুখুশ্যাম তারই ধারক এবং বাহক।

    নয়া গ্রামের প্রবীণ এই শিল্পীর কাছ থেকে জানা যায় গাছ-গাছালি ও মাটি থেকে পটের রং তৈরির প্রাচীন নিয়ম। ২০১৪ সালে ‘বঙ্গদর্শন’-এর করা একটি তথ্যচিত্রতে দুখুশ্যাম নিজেই জানিয়ে ছিলেন সেই প্রক্রিয়া।

    শিল্পী হিরণ মিত্র-র স্কেচে দুখুশ্যাম

    যখন শুরু করেছিলেন তখন তাঁর ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ দশা। রং কিনবেন কোত্থেকে! তাই নিজেই সব বানিয়ে নিতেন। নয়া গ্রামের প্রবীণ এই শিল্পীর কাছ থেকে জানা যায় গাছ-গাছালি ও মাটি থেকে পটের  রং তৈরির প্রাচীন নিয়ম। ২০১৪ সালে ‘বঙ্গদর্শন’-এর করা একটি তথ্যচিত্রতে দুখুশ্যাম নিজেই জানিয়ে ছিলেন সেই প্রক্রিয়া। ছাগলের ঘাড়ের লোম বা কাঠবেড়ালির লোম বাঁশের কঞ্চির ডগায় বেঁধে এককালে তৈরি হত তুলি। আর রং পাওয়া যেত প্রকৃতি থেকে। লাল মিলত সিন্দুর, আলতা আর হিঙ্গুল পাথর থেকে। হালকা লাল পাওয়া যায় পুঁইয়ের বিচি থেকে। হলুদ পাওয়া যায় কাঁচা হলুদের মূল থেকে রস নিয়ে। হরিতাল পাথরেও হলুদ পাওয়া যায়। দুখু বলেন সিমের পাতার রস থেকে সবুজ মেলে। কালো পাওয়া যায় উনুনে পোড়া হাঁড়ির তলার ভূষো থেকে। চাল পুড়িয়েও কালো রং পাওয়া যায়। সাদা আসে শঙ্খ আর খড়িমাটি থেকে। আর সেই রং যাতে আটকে থাকে কাগজে বা কাপড়ে তাই বাবলা গাছের রস থেকে আঠা তৈরি করা হয়। এমনই সব প্রাচীন পদ্ধতি জানার সুযোগ হয় দুখুশ্যামের কাছ থেকে।

    দুখুশ্যাম চিত্রকরের জন্ম ১৯৪৬, কলকাতায় শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে (Shambhunath pandit Hospital)। ছোটোবেলায় বাবা মারা গেলে মা তাঁকে নিয়ে যান মামার বাড়ি, তমলুকের ঠেকুয়াচকে। সেখান থেকে মামার সঙ্গে নয়া গ্রামে। পরে মেদিনীপুরের পটচিত্র ঘরানার কাণ্ডারি ছিলেন তিনিই।  তাঁর আত্মকথায় আছে,

    “নয়ায় বাড়ি পিংলা থানা
    পশ্চিম মেদিনীপুর এই ঠিকানা
    দুখুশ্যামের এই ভাবনা পট দেখিয়ে গান করি।”

    আবার, আত্মকথামূলক পটের গানে লিখেছিলেন,

    “বড় মামা আঁকা শিখাইল
    জামাইবাবু গান শিখাইল।
    জনমদুখি কপালপোড়া আমি এক জন
    আমার দুঃখে দুঃখে জনম গেল।”

    যদিও পরবর্তী সময়ে নিজের পটচিত্রের জোরেই দুখুশ্যামের দুঃখ-দুর্দশা নিবারণ হয়েছিল। এক সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়েছিলেন স্বাচ্ছন্দ্যের কথা। তাঁর স্ত্রী এবং ছয় সাবালক সন্তান সকলেই পট আঁকার কাজে যুক্ত। দুখুশ্যামের কাছে আঁকা শিখেছেন যাঁরা, তাঁদের বেশির ভাগই বিদেশের বাজারের স্বাদ নিতে পেরেছেন – রানি, রাধা, গুরুপদ, স্বর্ণ, মণিমালা। নিরঞ্জন, নুরজাহান, গোলাপ, চম্পা, বাবলু, আবেদরা তাঁর কাছে গান শিখত।  

    নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবনকে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন দুখুশ্যাম। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ প্রাধান্য পায় দুখুশ্যামের এই পট দুটিতে।

    পট এঁকে গান বেঁধেছেন আজব কলকাতা বিষয়ে। সঙ্গে গান বেঁধেছেন ও পটে দেখিয়েছেন গাজন, মাছের বিয়ে, ট্রামের মাহাত্ম্য, তার পাশে গঙ্গা ও টেমস নদী। এইচ আই ভি আর ডিপ টিউবওয়েলের বিষয়ে তাঁর গান ও পট চমকপ্রদ এবং অনিবার্য ভাবে আছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রসঙ্গ।

    দুখুশ্যামকে নিয়ে নির্মিত ‘বঙ্গদর্শন’-এর তথ্যচিত্র

    দুখুশ্যামের করা পটের মধ্যে পুরাণ, ভাগবত, চন্ডীমঙ্গল যেমন আছে তেমনই আছে অন্য অনেক সামাজিক কাহিনি। ২০১৪ সাল নাগাদ নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের জীবন আলেখ্য নিয়ে দুটি পট আঁকেন। তাঁর সঙ্গে দুটি গানও বাঁধেন। জনপ্রিয় পালা গানের সুরকে চয়ন করেন পট দু’টির জন্য। নেতাজি ও রবীন্দ্রনাথের বাল্যজীবনকে চমৎকার ভাবে তুলে ধরেন দুখুশ্যাম। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আর নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের যুদ্ধ প্রাধান্য পায় দুখুশ্যামের এই পট দুটিতে। লম্বা জড়ানো পটে দুখুশ্যাম-এর স্বরচিত এই কাহিনি বেশ মনোরম।

    বাঙালি মুসলিম পটুয়ারা ঠাকুর গড়েন, পুরাণকথার পট আঁকেন আবার নমাজ পড়েন। যাকে নৃতাত্ত্বিক বিনয় ভট্টাচার্য বলেছিলেন ‘কালচারাল অসিলেশন’ বা পটে বিধৃত সাংস্কৃতিক দোলাচল। আশ্চর্য এক জীবনদোলায় দুলে দুলে যুগে যুগে দুখুশ্যামরা বাঙালির সমন্বয় ভাবনার এক বলিষ্ঠ রূপায়ণ করে গেছেন। পটুয়ারা সেই অসামান্য জীবনবাসনার শিল্পী, সামঞ্জস্যই তাঁদের প্রকৃত ধর্ম। বয়স যখন আঁশি ছুঁই ছুঁই, তখনও প্রাণবন্ত এক চিত্র পুরুষ ছিলেন দুখুশ্যাম।

     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @