No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায় : বাংলার গৌড়ীয়নৃত্যকে বিশ্বের মঞ্চে হাজির করেছিলেন যিনি

    ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায় : বাংলার গৌড়ীয়নৃত্যকে বিশ্বের মঞ্চে হাজির করেছিলেন যিনি

    Story image

    দুহাজার সালের আশেপাশে নাচের স্কুলে আমার প্রিয় বন্ধু পারমিতা জানাল সে আর ওই স্কুলে আসবে না। এটা সত্যিই যে তখন নাচের আন্টি আমাদের আর কোনও দিশা দেখাতে পারছিলেন না। তাহলে তুই কোথায় শিখতে যাবি? আমি জিজ্ঞেস করি এই মনে করে যে পারমিতা কথক বা ওডিসিরই কোনও শিক্ষকের কাছে এবার থেকে শেখা শুরু করবে। হাসিখুশি চরিত্রের পারমিতা মুখটা আরও হাসিহাসি করে আমায় জবাব দিয়েছিল, ‘এক নতুন আন্টির কাছে’। এই নতুন আন্টির রহস্যটা পারমিতা সেদিন ভাঙল না। তারপর আমাদেরও আর মনে রইল না। এর মধ্যে নতুন নতুন মোবাইল এসেছে আমাদের সকলের হাতে আর মাঝে মাঝে পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে কথাও চালু হয়েছে। পারমিতা ফোনে জানাল ওই নতুন নাচের আন্টির সঙ্গে সে সদ্য রাশিয়া ঘুরে এসেছে। ওখানে বহু জায়গায় পারমিতা নতুন নাচের স্কুলের সঙ্গে পারফর্ম করেছে। আমরা তখন ক্লাস ইলেভেন-টুয়েলভে পড়ি। কম্যুনিস্ট সরকার। আমাদেরই এক সমবয়সীর রাশিয়া ভ্রমণ হয়ে গেল- এ আমাদের বড্ড ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স দিল। অবশ্য তখনও পরিষ্কার নয় পারমিতা কী নাচ শিখছে বা চর্চা করছে।

    কাট টু আশুতোষ কলেজের ইংলিশ অনার্সের ফ্রেশার্স ওয়েলকাম-এর দিন। শতাব্দী তার আগেই আমার বন্ধু হয়ে গেছে। আমরা একে একে কেউ গান, কেউ আবৃত্তি, কেউ নাটক করছি। শতাব্দী একটা সুন্দর নাচের কস্টিউম পরে, একটা আলপনা-খচিত বড় হাঁড়ি আর একটা চামর নিয়ে মঞ্চে প্রবেশ করলো। এর পর যে-নাচ শতাব্দী করলো তেমন সুন্দর নাচ আমি আগে দেখিওনি আর সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় যে এমন গভীর ও শাস্ত্রীয় ধরনের নৃত্য আছে তা কখনওই আমার জানা ছিল না। শতাব্দী সে-বার আমাদের ইংরেজি বিভাগের ‘মিস ফ্রেশার’ পুরস্কার পেল। আমি মুগ্ধ হয়ে ওর নাচ দেখছিলাম। নাচ শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে আমায় শতাব্দী জিজ্ঞেস করেছিল,

    — তুই পারমিতাকে চিনিস?
    — কোন পারমিতা?
    —কেন পারমিতা বলেছিল যে তুই ওর ছোটোবেলার বন্ধু।
    ও আচ্ছা। পারমিতা ব্যানার্জি। ও আর আমি একসঙ্গে নাচ শিখতাম।
    — আর এখন পারমিতা আমার সঙ্গে নাচ শেখে।
    — কী নাচ?
    — এই যে এখন যেটা করলাম- গৌড়ীয়নৃত্য।

    বাংলার যে নিজস্ব একটি শাস্ত্রীয়নৃত্য আছে তা আমার জানা হয়েছিল সেদিন। গৌড়ীয়নৃত্য। অনেক সময় মনে করা হয় অন্যান্য ভারতীয় প্রদেশ যথা দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলি, ওড়িশা, উত্তর প্রদেশ এমনকি আসাম বা মণিপুরের শাস্ত্রীয়নৃত্য বাংলায় চর্চা হয় কেবল, কিন্তু বাংলার নিজের কোনও নৃত্য নেই। ছৌ বা অন্যান্য লোকনৃত্যকে শাস্ত্রীয়নৃত্যের আওতায় আনতে আমাদের বড্ড দ্বিধা। কিংবা রবীন্দ্রনাথের যে নৃত্য যা রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে চর্চা করা হয় তার বয়সও তো একশো পেরিয়েছে কিন্তু বাংলার বলার মতো শাস্ত্রীয়নৃত্য যেন নেই। এত উচ্চমানের বাংলার যে সংস্কৃতি তা কি কখনও নৃত্যগীত রহিত হতে পারে? নাকি আমাদের কোথাও ভুল রয়ে যায়? এটা কি কখনও ভাবা যেত না? যেত হয়তো কিন্তু ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায়-এর আগে কেউ ভাবেননি। এই মহীয়সী বৃহৎ বঙ্গ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ডের মতো বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে, মন্দিরের পর মন্দির প্রাঙ্গণ নিরীক্ষা করে সেইসব মন্দিরগাত্র পর্যালোচনা করে প্রায় আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয়নৃত্য গৌড়ীয়কে। মহুয়াদি গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির সুযোগ্য ছাত্রী, কলকাতা থেকে মোহিনীআট্যমের প্রখ্যাত মুখ- দীর্ঘদিন আইসিসিআর-এর তালিকায় তাঁর নাম কিন্তু তাতে তিনি সন্তুষ্ট হননি। নিজেকে, নিজের বাংলাকে খুঁজতে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন।

    মহুয়া মুখোপাধ্যায় বৃহৎ বঙ্গ অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ডের মতো বিভিন্ন প্রদেশ ঘুরে, মন্দিরের পর মন্দির প্রাঙ্গণ নিরীক্ষা করে সেইসব মন্দিরগাত্র পর্যালোচনা করে প্রায় আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার নিজস্ব শাস্ত্রীয়নৃত্য গৌড়ীয়কে। মহুয়াদি গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির সুযোগ্য ছাত্রী, কলকাতা থেকে মোহিনীআট্যমের প্রখ্যাত মুখ- দীর্ঘদিন আইসিসিআর-এর তালিকায় তাঁর নাম কিন্তু তাতে তিনি সন্তুষ্ট হননি। নিজেকে, নিজের বাংলাকে খুঁজতে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন।

    প্রয়াত কথাকলি শিল্পী শ্রী গৌতম ঘোষাল অর্থাৎ কলামণ্ডলম্ গৌতম আমাকে জানিয়েছিলেন উনি যখন কেরালা কলামণ্ডলমের ছাত্র সে-সময় মহুয়াদি একবার সেখানে গিয়েছিলেন পারফর্ম করতে। লাল পাড়ের সাদা শাড়িতে, সোনার গয়নায় তিনি খুব সম্ভবত লেকচার-ডেমন্সস্ট্রেশন দিয়েছিলেন সেখানে গৌড়ীয়নৃত্যের। গৌতমদা বলেছিলেন মহুয়াদির সেই নাচ ছিল নিষ্পলক নয়নে দেখার জিনিস। একটা স্পেক্ট্যাকেল! শুধু যে গৌড়ীয়নৃত্যকে আবিষ্কার করে তিনি থেমে থেকেছেন তাও নয়। সারা পৃথিবীময় ছড়িয়ে দিয়েছেন সেই নৃত্যকে। কিন্তু বাংলাদেশ যেভাবে গৌড়ীয়নৃত্যকে আপন করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ এখনও তা পারেনি। সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়ও। এ-কারণেই তো বাংলার প্রবাদ আছে ‘গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না’। গৌড়ীয়নৃত্য কেন শাস্ত্রীয়নৃত্য মহুয়াদি যেমন সারা জীবন গবেষণা করেছেন, তেমনই বাঙালিদেরই একটি গোষ্ঠী সর্বক্ষণ সজাগ থেকেছে গৌড়ীয়নৃত্য কেন শাস্ত্রীয়নৃত্য নয়, তা অন্যদের বোঝানোর জন্য! তবে মহুয়াদিকে সেসব বিচলিত করেনি। তিনি তাঁর গবেষণা, তাঁর চর্চা এবং তাঁর অধ্যাপনা আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল নাচে নয়, গুরু ডঃ মহুয়া মুখোপাধ্যায় পাণ্ডিত্যে এবং বাগ্মিতায়ও শ্রেষ্ঠ বাঙালিদের একজন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম গৌড়ীয়নৃত্যশিল্পী তৈরি করতে তিনি আজও নিরলস।

    আমি নৃত্যবিশারদ নই। নাচের ভালো-খারাপের কোনও জ্ঞান আমার নেই। কিন্তু আমি একজন দর্শক। যখনই গৌড়ীয়নৃত্য কোথাও অনুষ্ঠিত হয় আমি চোখ ভরে দেখি এবং বাঙালি হিসেবে গর্ববোধ করি। মহুয়াদির প্রতি আমার শ্রদ্ধা সব সময়ই জাগরুক। বহু বছর আগে পারমিতার ‘নতুন আন্টি’ আসলে কিন্তু মহুয়া মুখোপাধ্যায়ই!

    __ 
    কলকাতাকেন্দ্রিক শাস্ত্রীয় নৃত্যের চাপা-ইতিহাস ও শিল্পীদের বর্ণময় জীবন নিয়ে ভাস্কর মজুমদারের কলামে চলছে বঙ্গদর্শন.কম-এর ধারাবাহিক – নাচে জন্ম নাচে মৃত্যু। প্রতি শুক্রবার।
     

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @