ডাঃ জ্যাক প্রেগার : জীবনের বেশিরভাগ সময় নীরবে সেবা করে গেছেন কলকাতার ফুটপাতবাসীদের

ডাঃ জ্যাক প্রেগার
১৯৭২। অনেক রক্তক্ষরণ, লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পূর্ব পাকিস্তান সদ্য বাংলাদেশ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে রেডিওতে আবেদন চলছে চিকিৎসক, সেবাকর্মী, স্বেচ্ছাসেবকের জন্য। ডাঃ জ্যাকের কানে এ কথা পৌঁছাতেই তল্পিতল্পা গুছিয়ে সোজা বাংলাদেশ। পৌঁছেই কাজ শুরু করে দেন রিফিউজি ক্যাম্পগুলোয়। সেগুলোর তখন শোচনীয় অবস্থা। উদ্বাস্তু সংকট ও শিশুপাচারে জর্জরিত সে দেশের অবস্থা দেখে ডাঃ জ্যাক তৈরি করেছিলেন ৯০ শয্যার চিকিৎসালয়। মহিলা ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য গড়ে তুলেছিলেন ‘ঢাকা ক্লিনিক’। সর্বহারাদের কথা ভেবে তৈরি করেছিলেন দুটো ফার্ম। কিন্তু, রাষ্ট্রের পছন্দ হয়নি। ১৯৭৯ সালে, একটা আন্তর্জাতিক শিশু-পাচারকারীদের কথা প্রকাশ্যে এনে ফেলায় তাঁকেই নির্বাসন দেওয়া হয় বাংলাদেশ থেকে।
‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’, প্রবাদটি ডাঃ জ্যাকের জন্য আর্দশ। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতায় এসে দেখলেন আর এক কাণ্ড! ৭০-৮০ দশকের উত্তাল কলকাতা। সেই কলকাতা যাকে মৃণাল সেন ‘এলডোরাডো’ বলতেন; রঘু রাইয়ের চোখে স্থির হয়ে আছে যে কলকাতা। আবার সেবার কাজে লেগে পড়লেন ডাঃ জ্যাক। দেখলেন কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় অগুন্তি আশ্রয়হীন, গরিব, দুঃস্থ, অসুস্থ মানুষের বাস। ঝুপড়ি, বস্তি তো আছেই। কেউ এঁদের জন্য ভাবে না, মরলো কি বাঁচলো তা নিয়ে কারোর মাথা ব্যাথা নেই। ডাঃ জ্যাক শহরে তখন একা। নিজেকে বারবার মনে করিয়ে দিতেন কী উদ্দেশ্যে স্বদেশ ছেড়ে এসেছিলেন।
অতঃপর, ১৯৭৯ সালে অল্প পুঁজি নিয়ে মিডলটন রো-এ একটা ফ্লাইওভারের নিচে, ফুটপাতেই রোগীদের চিকিৎসা শুরু করলেন। যাতায়াতের পথে অনেকেই তাঁর এই কর্মকান্ড দেখতেন। আস্তে আস্তে অনেকেই সাহায্য করতে চাইলেন। কেউ কেউ টাকা দিতে চাইতেন, অনেকে আবার যুক্ত হতে চাইতেন তাঁর কাজের সঙ্গে। যেসব জনবসতিতে ভদ্রলোকেরা যান না, এ শহর যাঁদের পাশ কাটিয়ে চলে যায়, ধীরে ধীরে সেসব ডাঃ জ্যাকের আপন হয়ে উঠলো। তিনি হয়ে উঠলেন অবহেলিত, গরিব, দুঃস্থদের ‘জ্যাক দাদু’।
১৪ বছর ফ্লাইওভারের নিচে ডাক্তারি করার পর শহরের কিছু মাতব্বরদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিলো, শহরে এভাবে ক্লিনিক চালানো যাবে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বেশ কিছুদিন আলিপুর জেলে থাকতে হয়েছিল ডাঃ জ্যাককে।
১৯৩০-এ ম্যাঞ্চেস্টারে জন্ম। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনার পরে কার্ডিগানে নিজের খামারে কৃষিকাজ করতেন। সেই সময় হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলেন ডাক্তার হবেন। গরিব, অসহায়দের সেবা করবেন। সেই মতো, ১৯৬৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হলেন ডাবলিনের রয়াল কলেজ অব সার্জেন্স-এ। ডাবলিনে মেডিসিনের ট্রেনিং শেষ করার পরই পৌঁছে গেছিলেন বাংলাদেশ। সেখান থেকে কলকাতা, ফ্লাইওভারের নিচে ক্লিনিক এবং ক্যালকাটা রেসকিউ।
ফুটপাতের ক্লিনিক চালানোর জন্য এক সময় টিনের কৌটো হাতে পথ চলতি মানুষদের কাছে সাহায্যও চেয়েছেন। এভাবে ১৪ বছর ফ্লাইওভারের নিচে ডাক্তারি করার পর শহরের কিছু মাতব্বরদের চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিলেন। অভিযোগ উঠেছিলো, শহরে এভাবে ক্লিনিক চালানো যাবে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। বেশ কিছুদিন আলিপুর জেলে থাকতে হয়েছিল ডাঃ জ্যাককে। জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু মামলা চলতে থাকে। শেষে পর্বতারোহী এডমণ্ড হিলারির হস্তক্ষেপে ন’বছর ধরে চলা মামলা থেকে মুক্তি পান।
ডাঃ জ্যাক বেশ কিছুদিন যুক্ত ছিলেন মিশনারি অফ চ্যারিটির সঙ্গে। তারপরই কলকাতার ঝুপড়িবাসীদের জন্য আলাদা ভাবে কাজ শুরু। তৈরি করেন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ক্যালকাটা রেসকিউ’ (Calcutta Rescue)। ১৯৯১ সালে সংস্থাটি আইনি স্বীকৃতি পায়। সংগঠনটি এখন একাধিক হেল্থ ক্লিনিক, স্কুল, হ্যান্ডিক্রাফ্ট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং কেন্দ্র নিয়ে সারা কলকাতায় ডালপালা ছড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে হাজার হাজার নিরাশ্রয়, নিরন্ন, দরিদ্র মানুষ বিনামূল্যে কুষ্ঠ-যক্ষ্মা-এডস-এর চিকিৎসা পাচ্ছেন। ডাঃ জ্যাকের ‘স্ট্রিট মেডিসিন’ (Street Medicine)-এর ধারণা সারা বিশ্বের চিকিৎসা ভাবনাকে আলোড়িত করেছিল, অনুপ্রাণিত হয়েছেন বহু চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী।
“স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবনযাপন -এই তিনটি বিভাগে কাজ করি আমরা। মূলত স্বাস্থ্য নিয়েই কাজ হয়। তবে, একজন মানুষের সার্বিক উন্নতির কথা ভেবে স্বাস্থ্যের পাশাপাশি জীবনযাপন নিয়েও কাজ করা হয়। যাঁরা দারিদ্রের কারণে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি, তাঁদের জন্য কম্পিউটার, ড্রাইভিং, বিউটিশিয়ান কোর্স ইত্যাদি পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা আছে। দেশ-বিদেশের গবেষকরা আমাদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রান্তিক এলাকায় গিয়ে বিভিন্ন প্রোজেক্টে অংশ নেন। স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর সমীক্ষা করে প্রামাণ্য নথি সরাবরাহ করে আমাদের প্রতিষ্ঠান।” বলছিলেন ক্যালকাটা রেসকিউ-এর স্বাস্থ্য বিভাগের ডেপুটি সিইও ডাঃ অলোকানন্দা ঘোষ।
ক্যালকাটা রেসকিউ-এর পাঠশালা
যেসব জায়গায় জলে আর্সেনিক আছে সেখানে গিয়েও কাজ করে ক্যালকাটা রেসকিউ। যেমন মালদার বাংলাদেশ বর্ডারের কাছে একটি আর্সেনিক প্রবণ এলাকায় ২০০৩ সাল থেকে পরিস্রুত পানীয় জলের বন্দোবস্ত করেছে এই প্রতিষ্ঠান। প্রায় ১২টা গ্রামে আর্সেনিক ফিল্টার বসিয়েছে তারা। ২০১৭ সাল থেকে কলকাতা সহ পশ্চিমবঙ্গের বহু বস্তি এলাকায় গিয়ে সেখানকার মানুষের শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন নিয়ে সমীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে ক্যালকাটা রেসকিউ। এছাড়াও ডাঃ ঘোষ বলছিলেন, “বিশেষ ভাবে সক্ষম শিশুদের জন্য কাজ করি আমরা। আমাদের কাছে প্রায় একশো শিশুর নাম নথিভুক্ত আছে। পুষ্টিকর খাবার, ওষুধ, চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি আমরা ওদের শিক্ষার দিকটাও দেখি। পড়াশোনার সঙ্গে নাচ-গান-আঁকা-খেলাধূলার প্রতি ওদের আগ্রহ তৈরি করার চেষ্টা করি। সম্প্রতি আমরা ডায়াগনোসিস সেন্টার চালু করেছি। আগে রোগী যাবতীয় পরীক্ষানিরীক্ষা করে আমাদের কাছে আসতেন, এখন আমরা চিকিৎসার সুবিদার্থে নিজেরাই করে নিতে চাইছি। ক্যানসার, টিবি, কুষ্ঠ রোগীদের বিশেষ যত্ন নেওয়া হয় এখানে। একাধিক স্লাম এলাকায় নিয়মিত এগুলি পরীক্ষা করা হয়, যার ফলে অনেকেরই প্রাথমিক স্তরে রোগ নির্ণয় সম্ভব হয়েছে এবং এভাবে অনেকেই এখন পুরোপুরি সুস্থ। ভবিষ্যতে কমিউনিটি-বেসড কাজ করার পরিকল্পনা আছে।”
প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে জনসচেতনা গড়ে তুলছেন ক্যালকাটা রেসকিউ-এর সদস্যরা
জীবনের চল্লিশটা বছর কাটিয়ে, প্রিয় শহরকে চিরবিদায় জানিয়ে ২০১৯-এ জন্মভূমি ইংল্যান্ডে ফিরে যান ডাঃ জ্যাক। ইচ্ছে ছিল সেখানেই জীবনের শেষবেলাটুকু কাটাবেন। ডাঃ জ্যাকের জীবনের গল্প নিয়ে ডেভিস রিস-এর প্রযোজনায় পরিচালক বেনোয়া লঞ্জ ‘ডক্টর জ্যাক’ নামে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন। “ডক্টর জ্যাক” (ব্লুমসবারি, লন্ডন, ১৯৯১) নামে একটি বই লিখেছেন জেরেমি জোসেফ। UK থেকে পেয়েছেন MBE (Member of the Order of the British Empire) খেতাব। জন্মসূত্রে ইংরেজ হলেও ২০১৭-তে পেয়েছেন “সেরা এশীয়” সম্মান। এছাড়াও বহু পুরস্কার, সম্মাননা পেয়েছেন।
২০১৯-এ ক্যালকাটা রেসকিউ-এর নতুন পাঠশালার উদ্বোধন করে নিজের দেশে ফিরে যান ডাঃ জ্যাক
টালা পার্কে ক্যালকাটা রেসকিউ-এর মূল ক্লিনিক। এছাড়াও নিমতলা, ট্যাংরাতেও রয়েছে। ধরা যাক, আপনার প্রয়োজন নেই কিন্তু পথ চলতে কখনও অভাবী, ভবঘুরে, অসুস্থ মানুষের মুখোমুখি হলে উদ্যোগ নিয়ে তাঁদেরকে এই প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা তো করতেই পারেন। ডাঃ জ্যাকের কাছে কি আমাদের কিছুই শেখার নেই! কলকাতা এবং জ্যাক কিন্তু একে অপরকে ভোলেনি আজও। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় আজও সেবা পায় এ শহরের আর্তরা। ঝাপসা দৃষ্টি, অসমর্থ শরীর নিয়ে দূর দেশ থেকে ৯৪ বছর বয়সেও জ্যাক খোঁজ নেন, “আমার কলকাতা ভালো আছে তো?”
______________
ক্যালকাটা রেসকিউ-এর ঠিকানা, ফোন নম্বরের জন্য https://calcuttarescue.org/contact/ -এখানে ক্লিক করুন।
কৃতজ্ঞতা:
ক্যালকাটা রেসকিউ-এর চিফ এগজিকিউটিভ জয়দীপ চক্রবর্তী ও ডেপুটি সিইও ডাঃ অলোকানন্দা ঘোষ।