No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    দোতারা বাজাই : লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানো শুধু নয়, নিরন্তর গবেষণায় ব্রতী এই দল

    দোতারা বাজাই : লোকবাদ্যযন্ত্র বাজানো শুধু নয়, নিরন্তর গবেষণায় ব্রতী এই দল

    Story image

    “ভালো কইরা বাজান গো দোতারা/ সুন্দরী কমলা নাচে...” – দোতারার সুরে কমলারা আজকাল নাচে না। অভিযোগ ওঠে, সময় ও পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলার মাটির সুর নাকি হারিয়ে যাচ্ছে! তার জায়গা নিচ্ছে নানা আধুনিক বাদ্যযন্ত্র আর প্রযুক্তি। তাই শেকড়ের সুর ফেরাতে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছেন কয়েকজন তরুণ। যে প্রযুক্তির ঠেলায় আজ দোতারা, সারিন্দার মতো লোকবাদ্য প্রান্তিক হতে চলেছে, সেই প্রযুক্তিকেই হাতিয়ার করে সামাজিক মাধ্যমে ‘দোতারা বাজাই’ নামে লোকগান চর্চার এক অভিমুখ খুলেছেন একদল বাঙালি।

    সামাজিক মাধ্যমে দোতারা বাজাই গ্রুপ এখন দারুণ জনপ্রিয়। ২০১৬ থেকে শুরু করে সাত বছরের জার্নিতে পা দিয়েছে দোতারা বাজাই। এখন ১০-১২ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে এই অনলাইন গ্রুপ শুধু এপার নয়, ওপার বাংলা-সহ প্রবাসকেও সুরে সুরে জুড়ছে। তবে শুধু দোতারা বাজিয়েই এঁরা ক্ষান্ত হন না। বরং প্রায় হারিয়ে যেতে বসা, যেমন- একতারা, দোতারা, সারিন্দা, ডুবকি, খমক ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে রীতিমতো চর্চা এবং দস্তুরমতো গবেষণাও করেন তাঁরা। পাশাপাশি আমজনতার মাঝে এই লোকবাদ্যগুলো আবার জনপ্রিয় করার ব্রতও তাঁরা নিয়েছেন।

    প্রযুক্তির যুগে লোকবাদ্য বাঁচিয়ে রাখার এই প্রয়াস কতটা কঠিন? দলের তরফে কৌশিক রায় পাউ বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “কঠিন। তবে একেবারে অসম্ভব নয়। মানুষকে খাঁটি সুর শোনাতে হবে। মানুষ সেই সুর শোনেনি বলেই লোকগানে আধুনিক সুরারোপ শোনেন। লোকগান আর লোকসুর বা লোকবাদ্য একে অন্যের পরিপূরক। তাই আমরা মানুষকে খাঁটি গান শোনানোয় বিশ্বাসী।”

    বেলঘরিয়ার কৌশিক রায় পাউ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। লোকসংগীতের প্রতি আকর্ষণের জন্যই তিনি দোতারা বাজাই-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। বঙ্গদর্শন.কমকে কৌশিক বলেন, “অনলাইনে প্রথম দোতারা বাজাই-এর যাত্রা শুরু হয়। তারপর আমাদের প্ল্যাটফর্ম বাস্তবেও বহু জায়গায় কর্মশালা, আলোচনা করেছে। মানুষ ভালোবেসেই আসেন। আমাদের ব্যবসায়িক লাভ নেই। শুধুমাত্র লোকসংগীতের প্রতি ভালোবাসা থেকেই দুই বাংলায় নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করি।”

    মাঝে মাঝে হাতেকলমে লোকবাদ্য শেখানোর কর্মশালার আয়োজন করে এই গ্রুপ। যেমন, গত ১২ মার্চ কলকাতার আড়িয়াদহ অঞ্চলে দোতারা বাজাই-এর একটি অনুষ্ঠান হয়েছে। এখানে উপস্থিত ছিলেন দলের কার্যনির্বাহী সদস্য ফয়সাল রূপম। কী অভিজ্ঞতা তাঁর? বাংলাদেশের ফয়সাল রূপম ফোনে বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমি এই অনুষ্ঠানে তরুণ প্রজন্মের উপস্থিতি দেখে বেশ অবাকই হয়েছি। কলকাতার বাইরে দূরদূরান্ত থেকে যেমন, বাঁকুড়া, উত্তর দিনাজপুর থেকে আগ্রহীরা এসেছিলেন। এমন অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে যাঁরা কলকারখানায় কাজ করেন, হাতে সময় নেই। অথচ তারই ফাঁকে লোকবাদ্য চর্চা করেন। এটা আমাকে আপ্লুত করেছে।”

    দোতারা বাজাই-এর সঙ্গে তিনি যুক্ত হলেন কীভাবে? ঢাকা শহরে চাকরি করেন রূপম। গাজীপুরে পৈতৃক বাড়ি হলেও তাঁর বেড়ে ওঠা ঢাকা শহরে। তিনি বলেন, “আমরা শহরে বড়ো হয়েছি। গ্রামের সংস্কৃতি আমরা পাইনি। তাই লোকগান শুনতে শুরু করেছি ইন্টারনেটের দৌলতে। লোকবাদ্য শেখার ইচ্ছে থাকলেও আমরা শহরে সবসময় হাতের কাছে ঠিক জিনিসটা পাই না। গিটারের শিক্ষক পাড়ার গলিতে পাওয়া যায়। কিন্তু লোকবাদ্য শেখানোর শিক্ষক মেলে না। তখনই অনলাইনের সাহায্য নিতে বাধ্য হয়েছি। তরুণ প্রজন্ম এই অনলাইন কাজকর্মে আগ্রহ পাচ্ছে।”

    বিশ্বায়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেখানে আমবাঙালির কাছে সংগীতচর্চার মাধ্যম অনেকটাই পাশ্চাত্যঘেঁষা, সেখানে দোতারা বাজাই দলের সাফল্য কতটা? পেশায় চাকুরিজীবি এবং আকাশবাণী কলকাতার যন্ত্রশিল্পী সৌমেন্দু দাস দলের পক্ষে বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “যখন সাত বছর আগে আমরা শুরু করেছিলাম, তখন লোকবাদ্য নিয়ে এত চেতনাও মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠেনি। শহুরে মানুষদের শেখার মধ্যেও অনেকটা ফাঁক ছিল। এখন শহুরে ছেলেপুলের কাছে লোকবাদ্য হিসেবে দোতারা যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছে। গিটারের পাশাপাশি তাঁরা অন্তত দোতারা কিনছেন বলতে পারি। এতে লোকবাদ্যশিল্পী ও কারিগররা উৎসাহিত হচ্ছেন।”

    শুধু বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি নয়, অনলাইনে দোতারার সুরের খুঁটিনাটি শিখছেন অস্ট্রেলিয়াবাসী তারিক আহমেদ এবং আমিন রহমানও। ফেসবুকে দোতারা বাজাই সন্ধান করলেই পাবেন সব তথ্য। আপনি চাইলে ঘরে বসে বাদ্যযন্ত্র শিখে যাবেন অনায়াসে। নানারকম দোতারা শেখার ভিডিও দেখে পুরো পরিষ্কার হয়ে যাবে যে কোনও আনাড়ি লোকেরও। এ ব্যাপারে ভরসা দিলেন সৌমেন্দু। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্যে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। প্রথমদিকে দোতারা শেখা এতটা সহজ ছিল না, যতটা আজ হয়েছে। আনকোরা কেউ শিখতে চাইলে অভিজ্ঞ শিক্ষক থেকে বাদ্যযন্ত্র সবই হাতের নাগালে পাবেন। পৃথিবীর বড়ো বড়ো শহরেও এভাবে অনেকেই শিখছেন লোকবাদ্য।”

    লোকবাদ্য বা দোতারা, একতারার চর্চা সত্যিই কি দরকার? বাংলাদেশের লোকসংগীত শিল্পী বাউল গরিব মোক্তার বলেন, “লোকবাদ্য ছাড়া লোকসংগীত হয় না। সাধারণ মানুষের প্রাণে দোতারা যে আঁচড় কাটে, তা অন্য কিছু পারবে না। এই গ্রুপের উদ্দেশ্যই ছিল, লোকবাদ্য বা দোতারাকে বাংলা ভাষাভাষীর মধ্যে প্রসারিত করা। পাশ্চাত্য প্রভাব থেকে মুক্ত করে বাঙালি আবার একতারা, দোতারার হাতে তুলে নেবে। আমরা এই লক্ষ্যে কাজ করে যাব ভবিষ্যতে।”

    নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক ইন্তাজ আলি, নেপালে বাংলাদেশ উপদূতাবাসে কর্মরত মাসুদ আলম, বাংলাদেশের গায়ক বিপুল শীল থেকে রানাঘাটের দোতারা প্রস্তুতকারক বাবলু বিশ্বাস সকলেই এখানকার সদস্য। নকশালবাড়ির নির্মল রায় দোতারা তৈরি করেন। ওখানকার কারও দোতারা কেনার ইচ্ছে থাকলে অনায়াসে ফোনে যোগাযোগ করতেই পারেন। সবটাই ফেসবুকে দেওয়া আছে। আবার দোতারা শেখাবার গুরুর সন্ধানও মেলে। একবার খুঁজে দেখুন। পেয়ে যাবেন সুভাষ বর্মণ বা দেবব্রত দের মতো দোতারা বাদককেও।

    অনলাইন গ্রুপ হিসেবে প্রাণ পেলেও এখন কৌশিক, সৌমেন্দুরা এই একই নামে একটি লোকগানের দল তৈরি করেছে। যার মূল উদ্দেশ্যই হল, লোকসংস্কৃতি চর্চা। এই লোকগানের দলকে আপাতত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়াই এখন তাঁদের মূল লক্ষ্য।

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @