No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মঙ্গলকাব্যের স্মৃতি ঘেরা ইছাই ঘোষের দেউল

    মঙ্গলকাব্যের স্মৃতি ঘেরা ইছাই ঘোষের দেউল

    Story image

    ধর্মমঙ্গল। মধ্যযুগের কাহিনিকাব্যগুলোর ভেতরে মনসামঙ্গল কিংবা চণ্ডীমঙ্গলের মতো অতটা জনপ্রিয়তা না পেলেও ধর্মমঙ্গল নিজের গুণে অনেক লোকের মনেই জায়গা করে নিয়েছে। বিশেষ করে রাঢ় অঞ্চলের সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূপ্রকৃতির খোঁজ পেতেও গবেষকরা আলাদা গুরুত্ব দেন মঙ্গলকাব্যের এই ধারাকে। সেই ধর্মমঙ্গলেই রয়েছে ইছাই ঘোষের গল্প। ইছাই ঘোষ ঐতিহাসিক চরিত্র ছিলেন কিনা, সেটা এখনও পরিষ্কার হয়নি, তবে, পশ্চিম বর্ধমানের কাঁকসা থানা এলাকাতে একটা খুব পুরোনো মন্দির দেখা যায়, স্থানীয় অঞ্চলে সেটা পরিচিত ‘ইছাই ঘোষের দেউল’ নামে। মন্দির স্থাপত্যের একটা বিশেষ রীতিকে বলা হয় দেউল। এই ধরনের মন্দিরগুলো অনেকটা লম্বা উঠে গিয়ে ওপরের ছাদটা খিলানের মতো বেঁকে যায়।  

    ‘রাঢ়ের জাতীয় মহাকাব্য’ থেকে জানা যায়, স্বর্গের নর্তকী জাম্ববতী শাপগ্রস্থ হয়ে বমতি নগরে বেণুরায়ের মেয়ে রঞ্জাবতী হয়ে জন্মান। রঞ্জাবতীর দিদি ছিলেন গৌড়েশ্বরের রানি এবং তাঁর দাদা মহামদ ছিলেন গৌড়েশ্বরের মন্ত্রী। বিদ্রোহী সামন্ত ইছাই ঘোষ ছিলেন দেবী চণ্ডীর আশীর্বাদে বলীয়ান। তাঁর সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে গৌড়েশ্বরের আরেক সামন্ত ঢেকুরগড়ের কর্ণসেনের ছয় ছেলে মারা যায় যুদ্ধে। কর্ণসেন নিজেও পরাজিত হন। তখন সান্ত্বনা হিসেবে গৌড়েশ্বর কর্ণসেনের বিয়ে দেন নিজের শ্যালিকা রঞ্জাবতীর সঙ্গে। বিয়ের পর রঞ্জাবতীকে নিয়ে কর্ণসেন ময়নাগড়ে নতুন সামন্তের পদে বসেন। এদিকে বুড়ো কর্ণসেনের সঙ্গে বোনের বিয়ে হলে রেগে যান মহামদ। গৌড়েশ্বরের কাজের প্রতিবাদ করতে না পেরে কর্ণসেনের সঙ্গেই শত্রুতা করেন তিনি। কর্ণসেনকে বারবার 'পুত্রহীন' বলে গালি দিতে থাকেন। এতে কষ্ট পেয়ে রঞ্জাবতী ছেলের আশায় ধর্মঠাকুরের পুজো করতে থাকেন। তারপর রঞ্জাবতীর গর্ভে জন্ম নেন এক স্বর্গভ্রষ্ট দেবতা। নাম রাখা হয় লাউসেন। রেগে গিয়ে মহামদ লাউসেনকে অপহরণ করলেন। আর ধর্মঠাকুর কর্পূর থেকে আর একটি ছেলে সৃষ্টি করে দিলেন রঞ্জাবতীকে। তার নাম হল কর্পূর ধবল। আর ধর্মঠাকুরের আদেশে হনুমান লাউসেনকে উদ্ধার করে রঞ্জাবতীর কোলে ফিরিয়ে দিলেন। এইভাবে রঞ্জাবতী হলেন দুই ছেলের মা। 

    এরপর লাউসেন বড়ো হয়ে উঠল ধীরে ধীরে। ভাই কর্পূর ধবলকে নিয়ে যাত্রা করল গৌড়ের দিকে। কিন্তু গৌড়ে পৌঁছেই লাউসেন বন্দি হল মহামদের চক্রান্তে। যদিও গৌড়েশ্বরকে খুশি করে সে মুক্তি পেল সহজেই। গৌড়েশ্বর তাঁকে প্রচুর পুরস্কার ও ময়নাগড়ের ইজারা দিলেন। ফেরার পথেলাউসেনের বন্ধুত্ব হল কালু ডোম ও তার বউ লখ্যার সঙ্গে। লাউসেন এদেরও ময়নাগড়ে নিয়ে এল। কালুকে করল সেনাপতি। এরপর মহামদের চক্রান্তে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে পাঠালেন কামরূপরাজকে দমন করতে। মহামদ ভেবেছিলেন অপরাজেয় কামরূপরাজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে লাউসেনের মৃত্যু হবেই। কিন্তু ধর্মঠাকুরের কৃপায় লাউসেন কামরূপরাজকে পরাজিত করে তাঁর কন্যা কলিঙ্গাকে বিয়ে করে দেশে ফিরল। এতে মহামদ ঈর্ষায় জ্বলতে লাগলেন। আবার মহামদের ষড়যন্ত্রে গৌড়েশ্বর লাউসেনকে শিমূল রাজ্য আক্রমণ করতে পাঠালেন। লাউসেনও লোহার গণ্ডার কেটে শিমূল রাজকন্যা কানাড়াকে বিবাহ করে নিয়ে এল। এতে বেড়ে গেল মহামদের রাগ। তাঁরই চক্রান্তে অজয় নদের তীরে ইছাই ঘোষের সঙ্গে লাউসেনের প্রবল যুদ্ধ হল। যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হল ইছাই।

    এ তো গেল গল্পকথা। তবে গবেষকরা মনে করেন ইছাই ঘোষের মন্দিরটি ১৬-১৭ শতাব্দীর বেশি পুরোনো কখনই নয়। কলকাতা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে পানাগড়ে যাওয়ার পথে দার্জিলিং মোড় থেকে ঘুরতে হবে ডান দিকে। ইলামবাজারের দিকে যেতেই মাঝপথে শুরু হবে লাল মাটির পায়ে হাঁটা রাস্তা। এই পথে যেতে যেতেই অজয় নদীর তীরে দেখা মিলবে ‘ইছাই ঘোষের দেউল’-এর। ট্রেনে যেতে হলে নামতে হবে দুর্গাপুর স্টেশনে। তারপর মিনিবাসে নামতে হবে মুচিপাড়ায়। সেখান থেকে অটো কিংবা ট্রেকারে চড়ে পৌঁছে যাবেন দেউলে।

    তথ্যসূত্র – ই-ট্রাভেল গুরু, বইপোকা গ্রন্থাগার। 

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @