No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    “‘স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক’ বললে আপনেরা আমাকে রক্ষা করবেন কিনা?”

    “‘স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক’ বললে আপনেরা আমাকে রক্ষা করবেন কিনা?”

    Story image

    বাংলাদেশের স্বনামধন্য লেখক গোলাম মুরশিদ (Golam Murshid) আর দেবব্রত ‘জর্জ’ বিশ্বাসের (Debabrata Biswas) মধ্যে যে পত্রালাপ হয়ে হয়েছিল, তার কিছু নমুনা আমরা দেখতে পারি দেবব্রত বিশ্বাসের বিখ্যাত ও বিতর্কিত আত্মজীবনী ‘ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত’-এ। গোলাম মুরশিদকে লেখা একটি চিঠির একেবারে শেষ দিকের একটি লাইনে তিনি বলেছেন, “…যুক্তিবাদী সংখ্যালঘু শ্রোতাদের সেলাম জানিয়ে বলি—পঞ্চাশ বছরের পুরোনো আচারের শেকল দিয়ে আমার গান গাওয়াকে বাঁধতে পারব না। আমি জানি—বাদ্যযন্ত্রের ভেজাল ছাড়াও আমার কণ্ঠের আওয়াজের নানা ধরনের প্যাটার্নের সাহায্যে ঐ অগণিত সংখ্যাগরিষ্ঠদের অকুণ্ঠ ভালোবাসা সারাজীবন পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি, সেই কণ্ঠের আওয়াজের মধ্যেও বিদেশের সোনার কাঠির ছোঁওয়া লেগেছিল—যদিও বাঁধা মতের পণ্ডিতেরা ঐ ব্যাপারটিকে “অতি নাটকীয়তা” বলে গাল পাড়েন। নতুনের পথে খুঁড়িয়ে চলব তাও আচ্চা—ভূতকালের ভূতে-পাওয়া মানুষ হতে আমি কিছুতেই রাজী নই।”

    ‘ভূতকালের ভূতে-পাওয়া মানুষ’ যে দেবব্রত বিশ্বাস নন, তা যাঁরা জানার তাঁরা জানেন। যে বিষয়ে নিমরাজী থাকতেন সে কাজ তিনি করতেন না। তাঁর বক্তব্য হিসেবে চিঠির এই অংশটুকু থেকেই কয়েকটি বিষয়ে পরিষ্কার হওয়া যায় – বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি এবং তিনিও বিতর্ককে পাত্তা দেননি, বিবর্তনকে তিনি প্রকৃতির মতোই গ্রহণ করতেন এবং নিজের বৃহত্তর শ্রোতাকূলের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা ছিল।

    রবীন্দ্রনাথের গানের (Rabindra Sangeet) রেকর্ড অনুমোদন করা নিয়ে দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের (Visva bharati Music Board) সংঘাতের কথা সর্বজনবিদিত। সেই কোন কালে ‘তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম’ গানটির একটি শব্দ নিয়ে যার সূচনা। শব্দটি হল ‘সফল স্বপন’ যা গীতবিতানে ছাপা আছে। কিন্তু এই গানটি দেবব্রত শিখেছিলেন ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর কাছে। তিনি সরাসরি রবীন্দ্রনাথের কাছে গানটা কণ্ঠে তুলেছিলেন। ইন্দিরাদেবী জর্জ বিশ্বাসকে শিখিয়েছিলেন ‘সকল স্বপন’ উচ্চারণ করে। দীর্ঘ চিঠি চালাচালি, সামনা-সামনি কথা, ইন্দিরাদেবী চৌধুরানীর জর্জের সমর্থনে চিঠি ইত্যাদির পর তৎকালীন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের প্রধান অনাদি দস্তিদার ‘সকল স্বপন’ কথাটিকে মেনে নেন। দেবব্রত বিশ্বাস তাঁর আত্মজীবনীতে লিখছেন, “তিনি (অনাদিকুমার দস্তিদার, বিশ্বভারতী স্বরলিপি সমিতির সম্পাদক) আমায় ডেকে বললেন, গীতবিতানে গানের কথা লেখা আছে – মম দুঃখ বেদন মম সফল স্বপন, এই সফল কথাটিকে তুমি সকল গাইলে কেন? আমি তখন অনাদিদাকে বললাম ‘বীণাবাদিনী’ পত্রিকায় যে স্বরলিপি প্রকাশিত হয়েছিল তাতে ‘সকল’ আছে। অনাদিদা বললেন, ‘ওটাতে ভুল হয়েছিল’ ; আমি বললাম, “ভুল যদি হয়েই থাকত তাহলে এক বৎসরের মধ্যে নিশ্চয়ই শুদ্ধিপত্র বার করা হত – কিন্তু তা তো করা হয়নি।”

    দেবব্রত বিশ্বাস ও অন্যান্যরা

    ১৯৬১-৬২ সালের আগে পর্যন্ত বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দেবব্রত বিশ্বাসের সম্পর্ক সংঘাতের ছিল না। মিউজিক বোর্ডের তরফে তাদের কোনও গান সম্পর্কে কোনও বক্তব্য থাকলে সরাসরি চিঠি না লিখে শিল্পীকে ডেকে বলা হত। তাঁর যুক্তি শোনার পর সিদ্ধান্তে আসার প্রথা ছিল। ফলে পরিস্থিতি অনেকটা খোলামেলা ছিল। ১৯৬২-র পর শারীরিক কারণে অনাদি দস্তিদারমশাই দায়িত্বভার ছেড়ে দেওয়ার পর বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে শিল্পীদের সম্পর্ক পরীক্ষার্থী আর পরীক্ষকের হয়ে ওঠে। কেবল দেবব্রত বিশ্বাস নন, আরও অনেক শিল্পীর গান তখন অনুমোদন পেত না। সে কথা রেকর্ড কোম্পানির কাছে চিঠিতে জানানো হত। দেবব্রত বিশ্বাস ছাড়া প্রায় সমস্ত শিল্পীই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে আপোস করে চলতেন। দেবব্রত বিশ্বাস গড়ে উঠেছিলেন আইপিটিএ-র (IPTA) যুক্তিবাদী পরিমণ্ডলে, কাজেই তিনি বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের তৎকালীন সিদ্ধান্তগুলোকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন।

    এই পরিস্থিতিতে সত্তর সালের গোড়ার দিক থেকে দেবব্রত বিশ্বাসের একের পর এক রেকর্ড মিউজিক বোর্ডের অনুমোদন পাচ্ছিল না। এই সময়েই জর্জের প্রাণপ্রিয় বড়ো ভাগ্নের মৃত্যু। ঘটনা-পরম্পরায় দেবব্রত বিশ্বাস শারীরিকভাবে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পারিবারিক চরম দুর্যোগের মুহূর্তে গান নিয়ে বাঁচার অবলম্বনটাও মিউজিক বোর্ডের বৈরিতায় চলে যাওয়ার মুখে, তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজে কথা লিখে সুর দিয়ে গান রেকর্ড করবেন।

    ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বরে নিজে দুটো গান লিখে তাতে সুর করে হিন্দুস্থান রেকর্ডিং কোম্পানিতে রেকর্ড করলেন। নাম দিলেন ‘গুরুবন্দনা’। গানদুটি ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্দেশ্যে নিবেদন। কী রহস্যময় উপায়ে এই রেকর্ডের কথাও পৌঁছে গেল বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কানে। এমনকি গানের বাণী অংশটাও। মিউজিক বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা এরপর যা করলেন, তা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। ‘গুরুবন্দনা’ রেকর্ডটিতে দুই পিঠে একটি করে গান ছিল। রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে লেখা গানটিতে ছিল –

    “...প্রহর শেষের ঘণ্টা যখন বাজছে আমার বুকের মাঝে,

    তোমার গানের মন্দির দ্বারীর হুঙ্কারধ্বনি শুনি বাজে।

    আমার প্রবেশ নিষেধ করি দুয়ার ওরা যে দেয় টানি,

    ওদের কঠিন তিরস্কার অর্থহীন তা জানি জানি।

    তাই বাহির দুয়ারে বসে সবারে,

    শুনাই তোমার বাণী...”

    আর দ্বিতীয় পিঠের গানটির এক জায়গায় ছিল –

    “...তোমার জ্ঞানী যত প্রথার দোহাই দিয়ে

    আজ রচিছে বিধান নব নব,

    তোমার গানের রসের ধারা

    দম্ভভরে তারা করে সারা,

    কী আর কব আমি কী আর কব?”

    এই কথা প্রকাশ্যে এলে সাধারণের প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হতে পারে জেনে মিউজিক বোর্ডের কর্তারা কী করেছিলেন তা জানা যাক দেবব্রত বিশ্বাসের লেখা একটি চিঠি থেকে। তিনি চিঠিটা লিখেছিলেন হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানির মালিক শোভন সাহাকে –

    “...১৯৭২ সনে গানদুটি (গুরুবন্দনা) যখন রেকর্ড করেছিলাম, তখন তুমি আমায় বলেছিলে যে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের অফিস থেকে শ্রী পূর্ণেন্দু গাঙ্গুলী (মিউজিক বোর্ডের পদস্থ কর্মচারী) তোমায় টেলিফোন করে ঐ গান দু’টির ডিস্‌ক্‌ রেকর্ড করে প্রকাশ করে নিষেধ করেছিলেন এবং তিনি তোমায় ভয়ও দেখিয়েছিলেন যে, যদি ঐ রেকর্ড প্রকাশ করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে তোমাদের কোম্পানীর রবীন্দ্রসঙ্গীতের রেকর্ডের অনুমোদনের ব্যাপারে নানা গোলমাল এবং অসুবিধা হতে পারে।”

    এই চিঠিটি ৩০. ০৫. ১৯৭৯-তে লেখা। চিঠির শেষে জর্জ বিশ্বাস সাত বছর আগের রেকর্ড করা গান দুটি প্রকাশ করতে অনুরোধ করেন। নানা টালবাহানার পরে ঐ কোম্পানি খুবই দায়সারা ভাবে রেকর্ডটি প্রকাশ করেন। কোনওরকম বিজ্ঞাপন ছাড়া। খুবই সামান্য সংখ্যক ‘গুরুবন্দনা’র কপি বাজারে এসেছিল। লোকের কাছে গানদুটি না পৌঁছনোয় জর্জ বিশ্বাসের মানসিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। শরীরও দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকে।

    এই অবস্থায় ময়মনসিংহের (দেবব্রত বিশ্বাসের জন্মস্থান, যে-দেশের ভাষায় তিনি আমৃত্যু কথা বলেছেন) ভাষায় তিনি দুটি গান লেখেন। বিখ্যাত সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরী গান দুটি রেকর্ড করতে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। জর্জও নিজের দেশের ভাষায় গান রেকর্ড করতে ভিতরে-ভিতরে আগ্রহী ছিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘ক্যারে হেরা আমারে গাইতায় দিল না/ আমি বুঝতাম পারলাম না’ আর ‘চাঁদ সূরজ গ্রহ তারা খোলা আসমান/ বেবাকেই হেরা বাজনা দিয়া ভইরা দেয় পরাণ’ গানদুটি হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশ করবেন। তিনি অমিতাভ চৌধুরীকে বারবার নিষেধ করেছিলেন ‘যুগান্তর’ কাগজে যেন এ-ব্যাপারে কোনও সংবাদ প্রকাশিত না হয়। তবে দেবব্রত বিশ্বাসের স্বভাব ছিল যে তাঁর ঘরে আসা বিভিন্ন মানুষদের নতুন গান, সুর এসব শোনানো। ফল হল দিন পনেরোর মাথায় হিন্দুস্থান রেকর্ডের মালিক বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের নতুন এক প্রস্তাব নিয়ে হাজির। আবার একটা মারাত্মক ঘটনা ঘটাবার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যার ঘুঁটি হিসেবে নিরীহ মানুষ ভি বালসারাকে হয়ত বা ব্যবহার করা হয়েছিল।

    জর্জ পরিকল্পনাটা ধরে ফেলেছিলেন। ভগ্ন শরীরে তাঁকে পুনরায় আঘাত করার সুযোগ না দিয়ে, ময়মনসিংহের ভাষায় তাঁরই লেখা এবং সুর করা গান দুটি হিন্দুস্থান রেকর্ড কোম্পানি থেকে ডিস্‌ক্‌ রেকর্ড করেন। বলা বাহুল্য রেকর্ড কোম্পানির এতে আহ্লাদের কিছু ছিল না। তখনও বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ড প্রবল প্রতাপে বিরাজমান। তারাই রবীন্দ্রসংগীতের প্রথম ও শেষ কথা। আগের হুমকি মতো যদি পর পর ডিস্‌ক্‌ অনুমোদন না করতে থাকে তবেই মহামুশকিল। কোম্পানির তরফে ডিস্‌ক্‌ রেকর্ড করার পর বিলম্ব ঘটতে লাগল। জর্জ স্থির থাকতে পারেন না। তিনি যে অনেক বলার কথা গানদুটিতে বলেছেন! ভেবেছিলেন বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের এই খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ তো নিজের জন্য নয় আগামী প্রজন্মের গায়ক-গায়িকাদের জন্য। এ-কথা বুঝবেন সকলে। তাঁর ‘বৃহত্তর শ্রোতাকূল’ হল এই ‘আগামী প্রজন্ম’। বহু চেষ্টায় গান দু’টির রেকর্ড প্রকাশিত হয় অত্যন্ত দায়সারা ভাবে। বিজ্ঞাপন ছাড়া এই গানটি শ্রোতাদের কাছে সেভাবে পৌঁছায়নি। কিন্তু গানটির পিছনে রয়ে গেছে জর্জ বিশ্বাসের হাহাকার, বিশ্বাস হারানোর কথা আর যন্ত্রণার এক নিঃশব্দ ইতিহাস।

    আর ‘বৃহত্তর শ্রোতাকূলের প্রতি তাঁর গভীর আস্থা’ ঠিক কতটা গভীর ছিল, তার সঠিক মূল্যায়নের জন্য পরিশেষে আর একটি চিঠির কথা বলতেই হয়, যা হেমাঙ্গ বিশ্বাস-কে (Hemanga Biswas) লিখেছিলেন দেবব্রত।

    একটি চিঠিতে হেমাঙ্গ তাঁকে লিখছেনঃ

    “জর্জদা তোমার গান নিয়া কাগজে পত্রে ভীষণ বাদানুবাদ শুরু হইসে। সেই নিয়ে একটু কথা বললে বড়ো ভালো হয়।”

    দেবব্রত’র প্রত্যুত্তরঃ

    ভাই হেমাঙ্গ, তুমি নিশ্চই আনন্দবাজার দেখসো। আর নারায়ণ চৌধুরী বইলা এক ভদ্রলোক তিনি পঁচিশে বৈশাখ, কাগজটার নাম হইল যুগান্তর, যুগান্তরে তিনিও লেখসেন। তা আমারে অনেক চিঠিপত্র দিসে। জিজ্ঞাসা করসে আপনি কিছু বলেন এ বিষয়ে। তা আমি অবশ্যি তাদের বলছি যে আমার এ বিষয়ে কিছুই বলার নাই। তবে একজন-দুজনকে, মানে যারা চিঠি দিস্যা বাইরে থেইক্যা, মানে কলকাতার বাইরে যারা থাকে, অন্য কোন জেলাতে, সেইরকম লোকেদের আমি চিঠি দিসি দু-একটা। তার মধ্যে আমি লেখসি যে, আচার্য নন্দলাল বোস চিত্রশিল্পী শান্তিনিকেতনের, তাঁর নাম আপনারা নিশ্চই শুনেছেন। তিনি একটা চিঠি লিখসিলেন কানাইলাল সামন্ত বইলা এক ভদ্রলোকরে ৩০ মার্চ, ১৯৭৪ সনে। এখন সেই চিঠির শেষ লাইন ছিল- ‘শিল্পীরা সাবধান। মূঢ় জ্ঞানান্ধ ক্রিটিকরা কেবলমাত্র আঙ্গিক এবং দেশকাল নিয়ে বিচার করে। রস একটি অখণ্ড অতুলনীয় বস্তু। তাকে বিশ্লেষণ করা যায় না। শুধু উপভোগ করা যায় মাত্র’।

    রাবীন্দ্রিকতা বিচার করবার জন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেটের আমদানি হইসে। তিনি কি পাশ করসেন আমি জানি না তবে তিনি নানারকম ফতোয়া জারি করতেসেন। আমি যে গান গাই সেই গান যদি তার চিনা পরিচিত না হয়, তাইলে তিনি বলতেসেন যে যে এটা রবীন্দ্রনাথের রচিত কিনা? এবং যদি রচিত হইয়া থাকে প্রমাণপত্র দাখিল করতে হবে। তা আমি তো ছোটবেলায় যাদের কাছে গান শিখছি, তারা আর কেউই আর বাইচ্যা নাই। আর যখন শিখসি তখন তো স্বরলিপি টরলিপির ব্যাপার আছিল না। কানে কানে আমরা শুনসি। তার মধ্যে হয়তো বদলাইয়া যায়। অনেক কিছুই হয়। তা আমরা কোনও প্রমাণপত্র চাইও নাই। আমাদের পকেটেও এখনও কোন প্রমাণপত্রও নাই, দলিলপত্রও নাই। সুতরাং আমি কি করে দেখাবো? তবে এই ব্যাপারে আমার ভয়ের কিছু কারণ নাই। কারণ অনেক গান বা আমি তো নগণ্য গায়ক, বড়ো বড়ো রবীন্দ্রসংগীতের ওস্তাদেরা যা রেকর্ড করসেন সেইগুলি অনেকগুলি আমি দেখছি স্বরলিপির ধারের কাছেও নাই। সেই গানগুলির নাম করলে তোমরা টের পাইয়া যাইবা। সুতরাং কোন শিল্পীর বিরুদ্ধে আমি কইতে চাই না। সেই গানগুলির নাম আমি কমুনা তোমরা নিজেরাই বাইছ্যা লইও, দেখবা মিলাইয়া স্বরলিপির সাথে মেলে না। তা তাদের ভসঙ্গে কোন গান করনের সময় কোন দলিল পত্র চায় নাই সি ম্যাজিস্ট্রেট। আমার বেলা চাইতাসেন। তা শাস্তি যদি পাইতে হয় আমাদের সকলেরই পাইতে হইবে। সুতরাং আমার কোনও ভয়ই নাই। তবে একটা ভয় আমার আছে, সেইটা হইল সেদিন ১৩ এপ্রিল আকাশবাণী কর্মীদের একটা অনুষ্ঠান হইতাছিল, সেই অনুষ্ঠানে আমি যখন গান গাইতাসি সেই ম্যাজিস্ট্রেটরে দেখলাম পিছন ফিরা কিসব কইতাসে কার সঙ্গে যেন। তারপর গানটান শেষ হইয়া গেল বাইর হইয়া আমি জিজ্ঞেস করসিলাম যে কি কইতাসিলেন উনি, ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব? তখন কেউ কইতে চায় না, তবে ফট করে একজন কইল যে উনি বলছিলেন-‘ওকে স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক’। তা আমি বললামতা আমারে হুকুমটা দিলেন না কেন? বলে-‘আপনি তখন গান গাইছেন। কি করে দেওয়া যাবে?’ তা যাই হোক। এইটাই একটা ভয় সেই ম্যাজিস্ট্রেট যদি আইজ আমাদের সামনে আছেন কি না জানিনা, যদি থাকেন আর যদি হুকুম দেন যে ‘স্টেজ থেকে নামিয়ে দেওয়া হোক’ তাহলে আপনেরা আমাকে রক্ষা করবেন কিনা?

    এক ময়মন্সিংহীয়া বন্ধুর (দেবব্রত বিশ্বাস) উদ্দেশে এক সিলেটী বন্ধুর (হেমাঙ্গ বিশ্বাস) লেখা

    তথ্যসূত্রঃ

    ১৯৭৪-এ নেওয়া সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ

    বঙ্গদর্শন আর্কাইভ, বাসব দাশগুপ্ত

    ব্রাত্যজনের রুদ্ধসংগীত

    ছবিঃ

    দেবব্রত বিশ্বাস ফেসবুক পেজ

    People's Media

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @