‘হিজিবিজি পাঁচালি’ : করোনাকালীন পরিস্থিতিতে একটুকরো হাসি

লকডাউন, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টিন এই শব্দগুলোর সঙ্গে আমাদের পরিচিতি ছিল না কয়েকমাস আগেই। অথচ করোনাকালীন পরিস্থিতিতে এগুলোই হয়ে গেছে ভালোভাবে বেঁচে থাকার একমাত্র ঠিকানা। সারাক্ষণ দুশ্চিন্তা, মৃত্যুভয়, কাছের মানুষদের দেখতে না পাওয়ার তীব্র মনখারাপ ক্রমাগত অস্থির করে তুলছে চারপাশ। মানুষ হাসতে ভুলে যাচ্ছে। ঠিক এমন সময়েই প্রকাশ পেল প্রবাসী বাঙালি দয়িতা রায়ের একগুচ্ছ পাঁচালি। শুধু পাঁচালি বললে ভুল হবে। বলা ভালো ‘হিজিবিজি পাঁচালি’। যার ছত্রে ছত্রে শুধু হাসির মোড়ক।
দয়িতা রায়ের জন্ম জামশেদপুরে হলেও উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন জাপানে। বর্তমানে সংসার ও চাকরিসূত্রে থাকেন নেদারল্যান্ডসে। ভালোবাসেন দৈনন্দিন নানান ঘটনাকে কেন্দ্র করে অল্প ব্যঙ্গ, কৌতুক আর কল্পনার জগতে বিচরণ করতে। হিজিবিজি তাঁর অর্জিত যাপন। সম্প্রতি কলকাতার সৃষ্টিসুখ থেকে প্রকাশিত হয়েছে দয়িতা রায়ের পাঁচালির সুরে বাঁধা বই ‘হিজিবিজি পাঁচালি’। যার ভূমিকা অংশে লেখক লিখছেন, “পাঁচালি বলতেই মনে পড়ে বৃহস্পতিবার। ঠাকুরঘরে মা দুলে দুলে একটা বই পড়ছে। একটা কেমন জানি ঘুমপাড়ানি সুর। ...বইটা মাথায় ঠেকিয়ে পুজোর ইতি। হাতে নকুলদানা প্রসাদ।”
আরও পড়ুন: হিম্মৎরামের পথ চলা আর পথ খোঁজার টানটান গল্প
এভাবেই লক্ষ্মীর পাঁচালি কেমন ভাবে যেন নিজের ঘরের মেয়ে বা মায়ের প্রতি ‘আদর’ হয়ে দাঁড়ায়। “কাঁদিতে কাঁদিতে বৃদ্ধা অতি দুঃখভরে/ তাহার ভাগ্যের কথা বলিল লক্ষ্মীরে” – তারপর যেন সন্তানের দুঃখে মা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন। দয়িতা রায়ের এই পাঁচালির সুর চিরাচরিত। কিন্তু ভাব এবং তার মাধুর্য আপনাকে মনে করাবে একালের অবস্থা। পরিবার, খেলা, প্রেম, রাজনীতি সবকিছুর মধ্যেই একধরনের কৌতুক ভাব আর তার মধ্যে হাসি আর হাসি। এটাই এই বইয়ের মূল উপজীব্য।
বইটি শুরু হয়েছে ‘ম্যাগি পাঁচালি’ দিয়ে। আমরা সকলেই জানি ২০১৫ সালে একবার ম্যাগিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ম্যাগিপ্রেমীদের দুঃখের আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। দয়িতা রায় এই ঘটনার উপর ভিত্তি করেই লিখছেন, “দৈবযোগে করিল টেস্ট কোনও সুধীজনে/ দুঃখী হল মর্ত্যবাসী ম্যাগি-র পতনে/ ম্যাগি-তে যে ঠেসে ভরা ক্ষতিকর সিসা/ শুনি সব গুণীজনে হারাইল দিশা।” এভাবে বই এগিয়েছে নানা বাঁক বদল, ঘটনা পরম্পরার মধ্যে দিয়ে। ‘ভোট পাঁচালি’-তে যেমন ভোট ব্যাঙ্কের কথার পাশাপাশি সংসারে ভোট আর সিরিয়ালের নিত্ত নৈমিত্তিক কড়চা নিয়ে লিখছেন, “নাওয়া-খাওয়া কিছুতেই মন নেই তাঁর/ পার্বতী পাশে বসে করে মুখ ভার/ কী যে তুমি সারাদিন নিউজ চ্যানেলে/ নির্বাচন দেখিতেছ সব কাজ ফেলে/ দিদি নম্বর ওয়ান আর রানি রাসমণি/ দুইখান দেখি আমি সোম থেকে শনি/ স্মিত হেসে মহাদেব গিন্নিরে কন/ দুইদিন বাকি প্রিয়ে, শেষ নির্বাচন।”
এছাড়াও এই বইয়ে আছে ২০১৯-এর সাধারণ নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতে লেখা ‘ভোট পাঁচালি রিটার্নস’, ‘পুজোর শাড়ি পাঁচালি’, সিরিয়াল কর্মীদের ধর্মঘটের প্রেক্ষিতে ‘সিরি-পাঁচালি’, ২০১৮-র ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে ‘মেসি পাঁচালি’, দিল্লির ভয়াবহ দূষণ নিয়ে ‘দূষণ পাঁচালি’।
তবে এ বইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেখাটি বোধহয় লকডাউনকে ঘিরেই। ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ লকডাউন’। দাম্পত্য মানে শুধুমাত্র ঝগড়াঝাটিই নয়, এর মধ্যে একটা প্রেমও আছে। যেটা লকডাউনের সময় নানারূপে প্রকাশ পেয়েছে ঘরে ঘরে। পাতা ওল্টালে পাওয়া যাবে আরও বিচিত্র সব ‘হিজিবিজি’।
বইটিতে নজরকাড়া প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন সুমিত রায়। প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে কবি সুকুমার রায়কে।
হিজিবিজি পাঁচালি – দয়িতা রায় | সৃষ্টিসুখ | প্রথম প্রকাশ- সেপ্টেম্বর, ২০২০ | মুদ্রিত মূল্য- ১৪৯ টাকা