দিনেমার আমলের গল্প বলে শ্রীরামপুরের এই গির্জা

১৮ শতকের মাঝামাঝি। দিনেমার কোম্পানি সোয়েটম্যান নামের এক প্রতিনিধিকে নবাব আলিবর্দি খাঁর কাছে পাঠিয়েছিল বাংলায় বাণিজ্য করার অনুমতি পাওয়ার জন্য। সোয়েটম্যান ১৭৫৫ সালে শ্রীপুরে তিন বিঘে আর আকনায় সাতান্ন বিঘে জমি কিনে তাঁদের কুঠি বসান। তারপর শেওড়াফুলির জমিদারের থেকেও দিনেমার বণিকরা খাজনার বিনিময়ে অধিগ্রহণ করেন আরও কিছু জমি। ডেনমার্কের রাজা পঞ্চম ফ্রেডরিকের নাম অনুসারে জায়গাটার নাম দেওয়া হয় ফ্রেডরিক্সনগর। দিনেমারদের উদ্যোগে এই ফ্রেডরিক্সনগর গড়ে উঠতে থাকে একটি আধুনিক শহর হিসেবে। পরে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর শহরটার নাম হয় শ্রীরামপুর।
১৭৫৫ থেকে ১৮৪৫ সালের মধ্যে দিনেমারেরা বেশ কিছু স্থাপত্য গড়ে তুলেছিলেন ফ্রেডরিক্সনগর বা শ্রীরামপুরে। সাউথ গেট, ড্যানিশ ট্যাভার্ন ইত্যাদির সঙ্গে সেন্ট ওলাভ’স চার্চও দিনেমার যুগের সাক্ষ্য বহন করছে। ১৭৭৬ সালে ফ্রেডরিক্সনগরের গভর্নর হিসেবে ডেনমার্ক থেকে আসেন কর্নেল ওলাভ বা ওলি বি। খ্রিস্টানদের জন্য নতুন চার্চ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে চাঁদা তোলা শুরু করেন তিনি। চাঁদা এসেছিল ফ্রেডরিক্সনগর থেকে, কলকাতা থেকে, এমনকি সুদূর কোপেনহেগেন থেকেও। ১৮০০ সালে ওলি বি-র উদ্যোগে একটি লুথারান গির্জা তৈরির কাজ শুরু হয়। কিন্তু তিনি সম্পূর্ণ গির্জাটি দেখে যেতে পারেননি। ১৮০৫ সালে যখন তাঁর মৃত্যু হয়, তখন গির্জার টাওয়ার আর সামনের অংশটা গড়ে উঠেছে। ওলি বি-র উত্তরসূরী ক্যাপ্টেন ক্রেফটিং তারপর গির্জা নির্মাণের দায়িত্ব নিলেন। গির্জা তৈরির কাজ শেষ হয় ১৮০৬ সালে। নরওয়ের সেন্ট ওলাভের নামে এই গির্জার নামকরণ হয়, যাঁর সঙ্গে ওলি বি-র নামের সাদৃশ্য ছিল। গির্জার চূড়ায় যে ঘড়ি বসানো আছে, তা গঙ্গার ওপারে ব্যারাকপুর থেকেও দেখে যায়।
১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফ্রেডরিক্সনগর কিনে নেয়। সেন্ট ওলাভ’স চার্চের দায়িত্ব নেন বিশপ অফ ক্যালকাটা। অনেক পরে শ্রীরামপুর কলেজ কর্তৃপক্ষ গির্জাটি তত্ত্বাবধানের ভার নিজের হাতে তুলে নেয়। এদিকে ধীরে ধীরে এই চার্চ জীর্ণ হতে শুরু করেছিল। ছাদের কড়িকাঠ, জানলা-দরজা, দেওয়ালের পলেস্তারা, আসবাব ক্ষয় পেতে থাকে। ২০১১ সালে বিপজ্জনক ঘোষণা করে চার্চটিকে বন্ধ করে দেয় শ্রীরামপুর কলেজ।
এদিকে ন্যাশানাল মিউজিয়াম অফ ডেনমার্কের সহায়তায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার শ্রীরামপুরের দিনেমার স্থাপত্যগুলির মূল কাঠামো বজায় রেখে সংস্কার আরম্ভ করেছিল। তারই অঙ্গ হিসেবে সেন্ট ওলাভ’স চার্চ মেরামতি শুরু হয়। আবার স্বমহিমায় ফিরে আসে এই গির্জা। সংস্কারের পর সেন্ট ওলাভ গির্জা ইউনেস্কোর থেকে এশিয়া-প্যাসিফিক সম্মান অর্জন করে।