দিনেমারের বাংলায় ইতিহাসের খোঁজ, শ্রীরামপুরে উদ্বোধন হল ড্যানিশ মিউজিয়াম

এ শহরের হাতছানি এমনই, যেন এক নিশির গুনগুন গুঞ্জন। এখানে পা দিলেই শুরু হয় টাইম ট্রাভেল। কয়েকশো বছর পেরিয়ে এসে আজও সজাগ শহরের প্রতিটা ইঁট-কাঠ-পাথর। ঐতিহ্যের কোনো এক পিছুটান আজও গ্রাস করে বসে আমাদের, পালাতে চাইলেই পা চেপে ধরে। পিছুটানের রেশ ধরে আমাদের নিয়ে যায় দিনেমারদের আস্তানায়। ছুঁয়ে দেখার সুযোগ করে দেয় সেকেলে ইতিহাসের গম্বুজ- খিলানকে। বাড়ির কাছেই এ আমাদের আরশিনগর, থুড়ি ফ্রেডরিক্সনগর। যদিও এই নামেও বিশেষ পরিচিত লাগছে না শহরটাকে। লাগবেই বা কী করে, সেকেলে নামটা আজ কালের গর্ভে। অনেক ওঠা-পড়া, ভাঙাগড়ার ইতিহাস তাকে গ্রাস করেছে। থাক বরং সেসব কথা, আমরা আজকের সময়ের পরিচিত নামেই নতুন করে চিনি শহরটাকে। জেনে নিই ইতিহাস আর আজকের স্মৃতির পিছুটান নিয়ে শ্রীরামপুর কতটা রঙিন হয়ে উঠলো...
১৭৭৮ সালে শ্রীরামপুর সরাসরি ডেনমার্ক রাজার শাসনে চলে যায়। ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ড্যানিশ গভর্নর আসেন শ্রীরামপুর পরিচালনার দায়িত্বে।
বর্তমানে হুগলি জেলার ব্যস্ততম শহর শ্রীরামপুর। আধুনিকতার সবটুকু পরশ মেখে প্রতিনিয়ত পাল্লা দিচ্ছে তিলোত্তমার সঙ্গে। শপিং মল, নামী-দামী দোকান, আলোর রোশনাই, ভিড়ভাট্টা সবকিছুতে রীতিমতো জমজমাট আজকের শ্রীরামপুর। কিন্তু আধুনিকতা যতই শহরকে গ্রাস করুক, ঐতিহ্য আজও অমলিন। একদিকে মাহেশের বিখ্যাত রথ, অন্যদিকে চটকল, প্রথম ছাপাখানা, গির্জা, কোর্ট, ড্যানিশ ঐতিহ্য ইত্যাদি নানান ইতিহাসের মেলবন্ধন রয়েছে শহরের আনাচে কানাচে।
সালটা ১৭৫৫। তখন বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ। তাঁর কাছ থেকে ড্যানিশরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি তৈরি ও বাণিজ্যের অনুমতি লাভ করে। ওই বছরই ড্যানিশ ব্যবসায়ীরা শ্রীরামপুরে পা রাখেন। ৮ অক্টোবর ৬০ বিঘে জমি অধিগ্রহণ করে গঙ্গাতীরে বাণিজ্য কুঠি তৈরি করে ড্যানিশরা। ১৭৭৮ সালে শ্রীরামপুর সরাসরি ডেনমার্ক রাজার শাসনে চলে যায়। ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ড্যানিশ গভর্নর আসেন শ্রীরামপুর পরিচালনার দায়িত্বে।
সিঁড়ি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই দুইদিকে ঘরের মধ্যে দেওয়াল জুড়ে একের পর এক সেই সময়ের নানান তথ্য ও দুষ্প্রাপ্য ছবি
কলকাতা থেকে বয়সে বড়ো শ্রীরামপুর। কলকাতার সঙ্গে তুলনা করলে আজ যা জেগে আছে তা এক করুণ শহরের ফসিল। কিন্তু সেই ফসিল ছুঁয়েও বোঝা যায় ইতিহাসের কত শুভ-অশুভ মহরতের সাক্ষী থেকেছে এই ছোটো জনপদ। ইতিহাস বলছে কলকাতার সাবালকত্ব প্রাপ্তির অন্তত ৫০০ বছর আগে শ্রীরামপুর সেজে উঠেছিল রানির মতো।
সে রানি আজ বৃদ্ধ হয়েছে, সাজেও ফাটল ধরেছে খানিক। কিন্তু মেজাজে একই রকম রঙিন হয়ে আছে। সেকথা মাথায় রেখেই শ্রীরামপুর শহরের নির্মাণ ও স্থাপত্যে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের নয়া রূপটান দিতে কোমর বেঁধে নেমেছে রাজ্য সরকার (West Bengal Govt)৷ এ সফরেই নয়া পালক যোগ হল শ্রীরামপুর শহরের মুকুটে। ড্যানিশ স্থাপত্যকে এবার নতুন করে মিউজিয়াম রূপে উদ্বোধন করা হল শ্রীরামপুরে (Serampore)। গত ৮ এপ্রিল, শুক্রবার শ্রীরামপুর কোর্ট সংলগ্ন এলাকায় ড্যানিশ মিউজিয়ামের (Danish Museum) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি এবং পর্যটন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারম্যান শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য, ড্যানিশ অ্যাম্বাস্যাডর ফেড্রি স্নাভনে, তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের সচিব শান্তনু বসু-সহ বিশিষ্ট অতিথিরা।
শ্রীরামপুর কোর্ট চত্বরের হলুদ-সাদা ড্যানিশ গভর্নমেন্ট হাউস ভবনের মধ্যে গড়ে উঠেছে শ্রীরামপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর নির্মিত একটি স্থায়ী প্রদর্শশালাও। সিঁড়ি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলেই দুইদিকে ঘরের মধ্যে দেওয়াল জুড়ে একের পর এক সেই সময়ের নানান তথ্য ও দুষ্প্রাপ্য ছবি। রয়েছে যুদ্ধ এবং বাণিজ্যে ব্যবহৃত নানান অস্ত্রশস্ত্রও।
সতেরেশো শতাব্দীর সাতের দশকে দিনেমার প্রশাসনিক প্রধানের কার্যালয় ও বাসস্থান হিসাবে ব্যবহারের জন্য তৈরি হয় ভবনটি। ১৮৪৫ সাল পর্যন্ত দিনেমার শাসনকালে বেশ কয়েকবার ভবনটি পুনর্নির্মিত হয়। কাজের প্রয়োজনে সময়ের সঙ্গে এর আকার বৃদ্ধি পায়। ১৮৪২ সালে দোতলায় ঘর তৈরি হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় মহকুমা শাসকের দপ্তর এবং আদালত ভবন হিসাবে ব্যবহারের জন্য আরও প্রসারিত হয় ভবনটি। সেই সময়কালের স্থাপত্যে কালের নিয়মে ক্ষয় হয়েছে। জীর্ণ হয়েছে বেশ কয়েকটি বাড়ি। ইতিহাসের সাক্ষী সেই সব স্থাপত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে এগিয়ে আসে ওয়েস্টবেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন (West Bengal Heritage Commission) সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় ডেনমার্ক সরকার এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়। পনেরো বছর ধরে শুরু হয়েছে শ্রীরামপুরের ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের প্রয়াস। ২০০৮ সালে ওয়েস্টবেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন এবং শ্রীরামপুর পৌরসভার যৌথ উদ্যোগে ড্যানিশ হাউজের জরাজীর্ণ বাড়িটির সংস্কারের কাজ শুরু হয়।
রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারম্যান শুভাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য এই দিন ঘোষণা করেন, “এই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ঘুরে ঘুরে সার্ভে করে পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন করে সাজানোর কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে শ্রীরামপুর শহরের ট্যাভার্ন, পুরোনো ড্যানিশ সরকারি ভবন, মার্টিনস প্যাগোডা, রাস মঞ্চ-সহ একাধিক ভবন ও স্থাপত্য চিহ্নিত করা হয়েছে প্রকল্পের কাজের জন্য।” শ্রীরামপুর পৌরসভার চেয়ারম্যান গিরিধারী সাহার কথায়, “আমাদের শহরের পুরোনো ঐতিহ্যগুলিকে রাজ্য সরকার সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে, আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে সবরকম ভাবে পাশে থাকছি। ভবিষ্যতেও একাধিক প্রকল্প যেমন, শ্রীরামপুর মিশন গার্লস স্কুলের পাশের জরাজীর্ণ ভবনটি পুনরুদ্ধারের ভাবনা রয়েছে।”
আরও পড়ুন: আজও ধোঁয়াশায় শ্রীরামপুর নামের ইতিহাস
শুক্রবারের অনুষ্ঠানে সরকারিভাবে পথ চলা শুরু হয় শ্রীরামপুরের তৎকালীন ঐতিহ্যশালী ভবনটির। ইতিহাসের জিয়নকাঠির স্পর্শে যেন প্রাণের ছোঁয়া লাগে শহরের ঐতিহ্যে। আনুষ্ঠানিক সমাবেশ, বক্তব্য এবং পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদযাপিত হয় দিনটি। এই দিনই ঐতিহাসিক স্মারক-স্থাপত্য- সংরক্ষণের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া দিনগুলির নতুন করে শিকড়ের খোঁজ পায় শহরবাসী৷ রাজ্য সরকারের তথ্য সংস্কৃতি এবং পর্যটন বিভাগের মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের কথায় মেলে সেই শিকড়ের টানের রেশ। তিনি বলেন, “দুটো জিনিস আমাদের কখনোই হওয়া উচিত নয়, একটা রুথলেস আর একটা রুটলেস”। শুধু তাই নয়, এই অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেই রবি ঠাকুরের “আলোকেরই ঝর্না ধারায়” গানের রেশ ধরে আগামীর কাছে তিনি আলোর বার্তা পৌঁছে দেন। আরও নানান ইতিহাস পুনরুদ্ধারে অঙ্গীকারবদ্ধ হন।
ছবি সৌজন্যে : কঙ্কনা মুখার্জী