‘সিপাইটারি’ : সিপাহি বিদ্রোহের সিপাইদের এই ডেরা এখনও রয়ে গেছে

১৮৫৭ সালে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ঘোষিত সিপাহি বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশিয় বাহিনীর সিপাহিরা উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর ঘটনাবহুল বৃত্তান্তের মধ্যে দিয়ে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত সার্বিক হতাশা ও ব্যর্থতায় ডুবে যায়। দেশিয় বাহিনীর সিপাহিরা গোরা সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ার আশঙ্কায় পালাতে শুরু করেন। এই পর্বে অনেকেরই গন্তব্য হয়ে পড়ে দেশিয় রাজ্যগুলি। কারণ সিপাহি বিদ্রোহের পর পরই ১৮৫৮ সালে ভারতবর্ষ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে আসে। স্বভাবতই ব্রিটিশ শাসনাধীন এলাকা অপেক্ষা দেশিয় রাজ্যসমূহ পলায়মান সিপাহিদের কাছে নিরাপদ মনে হয়।
সেই সময় উত্তর ভারত থেকে বেশ কিছু সিপাহি বাংলার উত্তরের কোচবিহারে চলে আসেন। কোচবিহার রাজ্যের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলিতে তাঁরা থাকতে শুরু করেন। সিপাহিদের বসতি যেসব অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সেই সব অঞ্চলগুলির নামকরণ হয় সিপাইপাড়া, সিপাইবাড়ি, সিপাইটারি, সিপাইগ্রাম ইত্যাদি। সাবেক দেশিয় রাজ্য বর্তমানে কোচবিহার জেলার এরকমই একটি গ্রাম সিপাইটারি।সিপাহি থেকে সিপাই আর টারি হলো পাড়ার সমার্থক। ছোটো ছোটো জনবসতিকে টারি বলা হয়। স্থানীয় ভাবে টারিগড়া বা টারিবাড়ি শব্দগুলি কোচবিহার তথা পাশ্ববর্তী ভূ-খণ্ডে খুবই প্রচলিত। এই এলাকার প্রাচীন অধিবাসী রাজবংশীরা নিজের জমি বা জোতের মাঝখানে ঘর বানিয়ে বসবাস করতেন। উত্তর, দক্ষিণ, পশ্চিম ও পূর্বমুখী ঘর বানিয়ে উত্তরদিকে সুপারি বাগান, দক্ষিণে চাষ আবাদের উপযোগী খেত, পশ্চিমে বাঁশবন ও পূর্বদিকে দীঘি বা জলাশয় স্থাপন করতেন। এই ধরণের বেশ কিছু বাড়ির সমষ্টিকে স্থানীয়ভাবে ‘টারি’ বলা হয়, যা গ্রামের অনুরূপ। এক্ষেত্রে সিপাহি বা সিপাইদের টারি থেকে সিপাইটারি গ্রাম নামের উৎপত্তি, এমনটাই ধরে নেওয়া হয়।
আলিপুরদুয়ার জেলার সীমান্ত সংলগ্ন বড়রাংরস গ্রাম পঞ্চায়েতের এই গ্রামটিতে ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পর ৫৪টি পরিবার এসে আশ্রয় গ্রহণ। বংশ পরম্পরায় সেই সমস্ত পরিবারের সদস্যরা আজও সিপাইটারি গ্রামে বসবাস করে চলেছেন।
তথ্যঃ রাজভূমি রাজকথা প্রবন্ধ সংকলন, দেবব্রত চাকী