No Image

   

00:00
00:00
Volume

 0 Songs

    মৃত্যুর অন্ধকার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ড্রাগন বোট বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধি অপূর্ব সামন্ত

    মৃত্যুর অন্ধকার থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ড্রাগন বোট বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের প্রতিনিধি অপূর্ব সামন্ত

    Story image

    “তোমার কাছে এ বর মাগি, মরণ হতে যেন জাগি”
     ---রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

    মৃত্যুকে ছুঁয়ে দেখেছেন তিনি। একবার নয়, দু-তিনবার। আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন দুবার। এখন তিনিই জীবনের পাঠ দেন অন্যদের। জীবনের ওঠাপড়ার রাস্তায় গড়িয়ে চলেছে তাঁর হুইলচেয়ারের চাকা। গড়াতে গড়াতে এবার পৌঁছে গিয়েছে থাইল্যান্ডে। তিনি অপূর্ব সামন্ত। ৫-১৩ অগাস্ট, থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ওয়ার্ল্ড ড্রাগন বোট রেসিং চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩ (World Dragon Boat Racing Championships 2023)। সেখানে অংশগ্রহণ করেছে ভারতের ড্রাগন বোট দল এবং ভারতের প্যারা ড্রাগন বোট দল। প্যারা ড্রাগন বোটের ভারতীয় দলে রয়েছেন এই বঙ্গসন্তান। হেরে যাওয়ার কাছে একদিন নিজে থেকেই আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছিলেন যিনি, তিনি এবার প্রতিযোগিতায় নামবেন নিজেকে আর নিজের দেশকে, নিজের দলকে জেতানোর জন্য।

    মোতিহারিতে রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতা জেতার পর

    “আমি নেপালে কাজ করতাম। ২০১৭ সালে কিছুদিনের ছুটিতে বাড়ি ফিরেছিলাম। সেখানেই একটা বাইক দুর্ঘটনায় আমার মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে। মেরুদণ্ড ভেঙে যায়”, বঙ্গদর্শন.কম-কে নিজের অন্ধকার সময়ের কাহিনি বলতে গিয়ে এভাবেই শুরু করলেন পূর্ব মেদিনীপুরের ঘাটালের বাসিন্দা অপূর্ব। তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল ভুবনেশ্বরের অ্যাপোলো হাসপাতালে। সেখান থেকে বাড়ি ফেরার পরেই পিঠে ঘা হয়। ‘বেডসোর’-এর কারণে হাঁটাচলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন তিনি। অপূর্ব বলেন, “প্রথমে আমি ভেবেছিলাম মেরুদণ্ড ভাঙা হাত-পা ভাঙার মতোই ব্যাপার। কয়েক মাসে ঠিক হয়ে যাবে। তারপর বুঝতে পারলাম এটা কতটা সিরিয়াস একটা ব্যাপার। আমি যে হাঁটতে পারছি না, সেটা বিশ্বাসই করতে পারিনি বেশ কিছুদিন।” ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দেন। “আপনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না, ছোটোখাটো যা ইচ্ছা আছে সেসব মিটিয়ে নিন, এমন কথাও শুনেছি আমি,” যোগ করলেন অপূর্ব সামন্ত। একে এতবড়ো চোট, তার উপর প্রতিবেশী-আত্মীয়দের একাংশের দুর্ব্যবহার, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া। তাঁর কথায়, “অনেকেই ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছিল। অনেকে সরাসরি বলতো, আমি না কি বড়ো পাপ করেছি, তাই এই আঘাত পেয়েছি। কষ্ট হতো। ঘরের মধ্যে নিজেকে আটকে রাখতাম।” জীবন সমুদ্দুরের সব উচ্ছ্বসিত ঢেউ যেন তখন তীরের কাছে এসে শুকিয়ে গিয়েছিলো। চারদিক বড়ো নিস্তব্ধ। অন্ধকারের শান্তি আর নিষ্ফল যন্ত্রনার গাম্ভীর্য- তাদের কষাঘাতে বিধ্বস্ত অপূর্ব তখন চেষ্টা করছেন আত্মহত্যা করে সব ল্যাঠা চুকিয়ে ফেলবার। একবার, দুবার। এভাবে কেটে গেলো দুই বছর। এরপর ফেসবুকে তাঁর আলাপ হয় একজন হুইলচেয়ার ট্রেনার (Wheelchair Trainer)-এর সঙ্গে। তিনি অপূর্বকে খোঁজ দেন ওড়িশার SVNIRTAR রিহ্যাব সেন্টার-এর। 

    ভারতের ড্রাগন বোট দল

     

    সেখানে গিয়ে জীবনের বাঁক বদলে যায় অপূর্বের। সেখানে তাঁর মতোই চোটগ্রস্ত অনেক মানুষ, যাঁরা বাঁচার আশা ছাড়েননি। তাঁরা রিহ্যাব করেন, বিভিন্ন হুইলচেয়ার স্পোর্টস-এ অংশগ্রহণ করেন, বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের জড়িয়ে রাখেন, আর বেঁচে থাকেন একটা পরিবারের মতো। তাঁদের সঙ্গে মিশে গেলেন অপূর্ব। শিখলেন হুইলচেয়ারে বাস্কেটবল খেলা, শিখলেন প্যারা ড্রাগন বোট স্পোর্টস। অংশগ্রহণ করতে শুরু করলেন হুইলচেয়ার ম্যারাথনে। সারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হওয়া হুইলচেয়ার ম্যারাথনে অংশ নিয়েছেন তিনি, পেয়েছেন পুরস্কারও। তাঁর সেরা পারফরম্যান্স ২০২১ সালে পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিত হওয়া কার্গিল হুইলচেয়ার ম্যারাথনে। সেখানে তিনি দৌড়েছিলেন ৪২ কিলোমিটার। রিহ্যাব সেন্টারে থাকার সময়ে শিখেছেন টেলারিং-এর কাজ। এরপর ২০২১ সালে গঙ্গা ফাউন্ডেশন নামক একটি এনজিও সংস্থার পক্ষ থেকে চণ্ডীগড়ের স্পাইনাল রিহ্যাব সেন্টার-এ যান। সেখানে হুইলচেয়ার ট্রেনার হওয়ার পাঠ নেন। “আমি হুইলচেয়ারেই সব কাজ করি। হুইলচেয়ারে বসেই ট্রেনে-বাসে উঠি, দৈনন্দিন কাজ করি, এমনকি সারা ভারতে ঘুরে বেড়াই। এইসব কাজ করার জন্য মোট ৬১-৬২টি হুইলচেয়ার স্কিল আছে। একজন ট্রেনার হিসাবে আমার প্রাথমিক দায়িত্ব হলো অন্যদের এই স্কিলগুলি শেখানোর। আমি যখন পারছি, তখন বাকিরাই বা পারবে না কেন? এই আত্মবিশ্বাসটাই আমি ছড়িয়ে দিতে চাই বাকিদের মধ্যে,” বললেন বর্তমানে শিলিগুড়ির একটি হাসপাতালে হুইলচেয়ার ট্রেনার হিসাবে কর্মরত অপূর্ব। সঙ্গে চালান নিজের ইউটিউব চ্যানেল মাই লাইফ অপূর্ব। সেখানে আছে বিভিন্ন ভ্লগ, হুইলচেয়ার স্কিল, রিহ্যাবিলিটেশন পদ্ধতির উপর ২০০-এর উপর ভিডিও।   

    আর ড্রাগন বোটের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে জায়গা করে নেওয়া? অপূর্বর উত্তর, “চণ্ডীগড়ে থাকার সময়ে প্যারা ড্রাগন বোটের একটা ইভেন্টে আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। সেখানে আমাদের দল প্রথম হয়েছিল। তখন থেকেই এই খেলাটার প্রতি একটা প্যাশন জন্মে গিয়েছিলো”। এরপর বিহারের মোতিহারিতে অনুষ্ঠিত রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় তাঁদের দল পেয়েছিল দুটি সোনার মেডেল। তারপরে ভারতীয় দলে জায়গা পাওয়া। ২০২১ সালে কলকাতায় একটি হুইলচেয়ার ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করতে এসে আলাপ হয় সেই ম্যারাথন প্রতিযোগিতার অন্যতম আয়োজক এবং ইন্সটিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস কলকাতার চিকিৎসক সুপর্ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, “অপূর্বের মধ্যে একটা অদম্য জেতার ইচ্ছে আছে। চ্যাম্পিয়ানশিপে যাওয়ার আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল আর্থিক সাহায্য চেয়ে। আমাদের একটা ফান্ড আছে দুস্থ, অসুস্থ মানুষদের সাহায্য করার জন্য। সেখান থেকেই কিছু সাহায্য করেছি ওকে। আশা করি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে পদক পাবে।” আর অপূর্ব যোগ করেন, “এই ধরনের প্রতিযোগিতা খুব একটা জনপ্রিয় নয়। আমরাও দারুণ কিছু সাপোর্ট পাইনি। নিজেদের খরচাতেই আসতে হয়েছে এখানে। সুপর্ণ স্যার আমাকে আর্থিক সহায়তা করেছেন। আরও অনেকেই আর্থিক সহায়তা করেছেন। তাঁদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।” কথোপকথনের শেষভাগে তিনি জানান, “আমার স্বপ্ন ছিলো দেশের হয়ে এই খেলাটা খেলবো। সেই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। খুব গর্ব হচ্ছে, আনন্দ হচ্ছে। এখন মূল লক্ষ্য চ্যাম্পিয়ন হওয়া”। যখন নিজের হোটেলের ঘরে বসে এই কথা বলছিলেন অপূর্ব, তখন হোটেলের জানালা দিয়ে দূরে দেখা যাচ্ছে থাইল্যান্ডের পাটায়ার মনোরম সৈকত আর ‘জীবনের সমুদ্র সফেন’।  

    ________________

    ছবি সৌজন্যে- অপূর্ব সামন্ত    

    Tags:

    বঙ্গদর্শনের সপ্তাহের বাছাই করা ফিচার আপনার ইনবক্সে পেতে

    @