জার্মানির কোলনে তিন দশক ধরে দুর্গাপুজোর আনন্দ-উৎসব

বাঙালির পুজোর বাজনা বেজে উঠেছে দুই বাংলা জুড়েই। প্রবাসেও পুজোর আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু জার্মানির রাইন নদীর তীরে মোটেই কাশফুল ফোটে না। অথবা কোলন শহরের কুমোরটুলিতে প্রতিমা গড়াও হয় না। তবু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে এই শহরেও শরৎ এসে পৌঁছয় প্রতি বছর নিয়ম করে। তাই প্রবাসী বাঙালিদের আগ্রহে মা দুর্গাও সদলবলে এসে হাজির হন কোলন শহরে। কোলনের ভারত সমিতি-র দুর্গাপুজোর খ্যাতি আজ সারা জার্মানি জুড়েই।
সে অনেক বছর আগের কথা। ১৯৯২ সাল। ১২ জন প্রবাসী বাঙালি জার্মানির কোলন শহরে হৈহৈ করে দুর্গাপুজোর আয়োজনের কথা ভাবলেন। এর আগে তাঁরা ফ্রাঙ্কফুর্টের দুর্গাপুজোতে যেতেন। কিন্তু সেবারই প্রথম তাঁদের মনে ভাবনা এলো, নিজেরা একটা পুজো করলে কেমন হবে? সেটা একদমই নিজেদের পুজো হবে। সব প্রবাসীদের মনে তখন দেশের পুজো, মানে স্বদেশের স্মৃতি জড়িয়ে। ঠিক হল, পুজোতে কলকাতার মতোই আয়োজন করা হবে।
১৯৯২ সালে জার্মানির ফ্র্যাঙ্কফুর্টের পুজো ছেড়ে জার্মানির বাঙালিরা গড়ে তুললেন ভারত সমিতি। সেই দুর্গাপুজো এবার ৩৩ বছরে।
এক চিলতে ভাবনা ডানা মেলেছিল কোলনের প্রবাসী বাঙালিদের ইচ্ছের আকাশে। তারই ফলশ্রুতিতে ‘ভারত সমিতি’র উদ্যোগে কোলনে শুরু হল দুর্গাপুজো। আজ সেই পুজো জার্মানির অন্যতম বড় পুজো বলে গণ্য হয়। পুজো কমিটির সদস্য সংখ্যা এখন ৫০-এর ওপরে। আশেপাশের নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ থেকে প্রায় হাজার খানেক মানুষ হাজির হন পুজো উপলক্ষে।
এই পুজো এ বছর ৩৩ বছরে পা দিয়েছে। সেই তিন দশক আগের পুজো উদ্যোক্তাদের অন্যতম অশীতিপর সুবীর গোস্বামী আজো এই পুজোর পুরোহিত। কোলনের প্রবাসী বাসিন্দা ঐশ্বর্য পাল বাগ বঙ্গদর্শন.কমকে বলেন, “পুজোর কর্মকান্ড শুরু হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। এবারে মূলত ভাগ হয়েছে সাত ভাগে- সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রান্নাবান্নার আয়োজন ও প্রসাদ বিতরণ, পুজোর প্রস্তুতি, সবশেষে অনুষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও পরিচালনা। এসবই শুরু হয়ে গিয়েছে জোর কদমে। জুলাই মাস থেকেই মহড়া চালু করে দিয়েছি।”
পুজোর বিভিন্ন দশকর্মা কলকাতা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। এখানে দুর্গা প্রতিমা প্রতি বছর বিসর্জন হয় না। পাঁচ বছর অন্তর অন্তর প্রতিমা কলকাতা থেকে গিয়ে পৌঁছয়। এবার নতুন প্রতিমা পুজো হবে। তবে তার বহু আগে থেকেই পুজোর পরিকল্পনা শুরু হয়ে যাচ্ছে। কলকাতা থেকেই হাজির হবে পুজোর সামগ্রী। নির্ঘণ্ট মেনে, অর্থাৎ দেশের মতোই পাঁচ দিন ধরে চলবে পুজোর নানা আয়োজন- কলাবৌ স্নান, বোধন, সন্ধিপুজো, ধুনুচি নাচ, সিঁদুর খেলা ইত্যাদি।
প্রতিবছর ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী- দুই বেলা চলে বাঙালিদের রান্নার মহাভোজ । বাঙালির নানাবিধ সাবেক পদই ভোজের প্রধান আকর্ষণ। পুজো কমিটির সদস্যরা নিজেরাই যাবতীয় রান্নাবান্নার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লুচি, মাংস, খিচুড়ি, ডাল, লাবড়া, পাঁচরকম ভাজা এ সমস্ত বাদ দিয়েও বিশেষ আকর্ষণ থাকে বিরিয়ানি, যা দশমীর বিসর্জনের পর আপ্যায়িত হয়।
আট থেকে আশি সকলের জন্য হাজির করা হয় ‘স্ন্যাকস কাউন্টার’। যার পোশাকি নাম ‘মুখরোচক’। রসনাবিলাসি বাঙালি মানেই স্ট্রিট ফুড বিলাসী। তাই তাদের জন্যে সিঙ্গাড়া, ভেজিটেবল চপ, কচুরি মজুত থাকে কাউন্টারে। মূলত পুজো কমিটির সদস্যরাই এটা পরিচালনা করেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছাড়া পুজো সম্পূর্ণ হয় না। তাই ষষ্ঠীতে থাকছে আগমনী গানের আসর, সপ্তমীতে থাকছে সত্যজিৎ রায়ের বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গান নিয়ে কোলাজ।
ঐশ্বর্য বলেন, “এই বছর নবমী, দশমী উইকএন্ডে পড়ায় প্রচুর লোক সমাগম হবেই। তবে এবছরের পুজো আমাদের কাছে একটু অন্যরকম। কলকাতায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা, প্রায় সাড়ে সাত হাজার কি.মি. দূরে থাকা জার্মানির কোলন শহরকেও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। কোলনের বাঙালিদের মনের অবস্থা একেবারেই ভালো নেই। তাই এই পুজো হোক দ্রােহের। আমাদের কাছে এই পুজো হোক শক্তির, এই পুজো হোক আবেদন ও অনুতাপের। এই পুজো হোক নারীর সমানাধিকারের ও নারীর অধিকার স্থাপনের।”