একশোর বেশি পত্রিকার জমায়েত কলেজ স্কোয়ারে

“বড়ো যদি হতে চাও ছোটো হও তবে” – এই প্রজ্ঞা থেকেই একগুচ্ছ পত্রিকা নিজেদের ‘লিটল ম্যাগাজিন’ হিসেবে চিহ্নিত করতে গর্ব অনুভব করে। তারা অবাণিজ্যিক, প্রথাবিরোধী আর সজীব – তাই সবরকম আগ্রাসনের চোখে চোখ রাখার সামর্থ্য রাখে তারা। বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “লিটল কেন? আকারে ছোটো বলে? প্রচারে ক্ষুদ্র বলে? না কি বেশিদিন বাঁচে না বলে? সব কটাই সত্য, কিন্তু এগুলোই সব কথা নয়; ওই ‘ছোটো’ বিশেষণটাতে আরও অনেক অর্থ পোরা আছে। প্রথমত, কথাটা একটা প্রতিবাদ; একজোড়া মলাটের বিরুদ্ধে সবকিছুর আমদানির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; বহুলতম প্রচারের ব্যাপকতম মাধ্যমিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। লিটল ম্যাগাজিন বললেই বোঝা গেল যে জনপ্রিয়তার কলঙ্ক একে কখনও ছোঁবে না, নগদ মূল্যে বড়োবাজারে বিকোবে না কোনোদিন, কিন্তু কোনোও একদিন এর একটি পুরোনো সংখ্যার জন্য গুণীসমাজে উৎসুকতা জেগে উঠবে। সেটা সম্ভব হবে এইজন্যই যে এটি কখনো মন জোগাতে চায়নি, মনকে জাগাতে চেয়েছিল। চেয়েছিল নতুন সুরে কথা বলতে। কোনো এক সন্ধিক্ষণে, যখন গতানুগতিকতার থেকে অব্যাহতির পথ দেখা যাচ্ছে না, তখন সাহিত্যের ক্লান্ত শিরায় তরুণ রক্ত বইয়ে দিয়েছিল – নিন্দা, নির্যাতন কিংবা ধনক্ষয়ে প্রতিহত হয়নি। এই সাহস, নিষ্ঠা, গতির একমুখিতা, সময়ের সেবা না করে সময়কে সৃষ্টি করার চেষ্টা – এটাই লিটল ম্যাগাজিনের কুলধর্ম”।
২০০৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সারা পশ্চিমবঙ্গের ১৮টি লিটল ম্যাগাজিন একসঙ্গে বসে তৈরি করল ‘লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চ’। উদ্দেশ্য ছিল লিটল ম্যাগাজিনগুলির নিজস্ব দাবিদাওয়া, মতামত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। তারপর ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চের সৌজন্যে বসল লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের নিজস্ব উদ্যোগে প্রথম সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা। প্রথম আয়োজনেই বিপুলভাবে সারা দিলেন লেখক এবং পাঠকেরা। দুবছর পর জায়গা পাল্টে মেলা বসল কলেজ স্কোয়ারে। তারপর থেকে প্রত্যেক বছরই জানুয়ারি মাসে বিদ্যাসাগর উদ্যানে ধর্মপালের মূর্তির সামনে সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা আয়োজিত হয়ে আসছে। তার পাশাপাশি প্রত্যেক মাসের দ্বিতীয় শনিবারে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসের সামনে এই লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চের উদ্যোগেই বসে থাকে ‘লিটল ম্যাগাজিন হাট’। সারা বছর ধরে যাতে পাঠকের সঙ্গে লিটল ম্যাগাজিনের সক্রিয় সংযোগ বজায় থাকে, সেই চিন্তাভাবনা থেকেই এই হাটে পশরা সাজিয়ে বসেন বিভিন্ন পত্রিকার কর্মীরা। বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের সঙ্গে মিলিতভাবে দুই বাংলার যৌথ লিটল ম্যাগাজিন মেলা যাতে কয়েক বছরের মধ্যেই শুরু হতে পারে, তার জন্যও নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এই সমন্বয় মঞ্চ।
এই বছর কলেজ স্কোয়ারের সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা ১২ বছরে পা দিল। ১৬ জানুয়ারি বুধবার থেকে ১৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মেলা জমজমাট ছিল প্রচুর মানুষের সমাগমে। এবার সহযোগী উদ্যোক্তা হিসেবে ছিল ‘ফ্যাসিবাদ বিরোধী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ’। মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে গান, কবিতা, নাটকের মধ্য দিয়ে তারা সমবেত মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছিলেন প্রতিরোধের বার্তা। অনুষ্ঠানের মঞ্চে বড়ো অক্ষরে লেখা ছিল ‘নো পাসারন’। যার অর্থ, “তাদের (ফ্যাসিবাদীদের) এই জায়গা দিয়ে আমরা যেতে দেবো না”। স্পেনের গৃহযুদ্ধে জেনারেল ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে উঠে এসেছিল এই স্লোগান। ‘অবক্ষয়’ প্রযোজিত নাটক ‘আশ্রয়’, ‘বিদূষক নাট্যমণ্ডলী’ প্রযোজিত ‘সুখী রাজপুত্র’, ‘ভাণ’ প্রযোজিত ‘টেলুরাম টেররিস্ট’ মঞ্চস্থ হল মেলায়। ছিল কবিদের নিয়ে কবিতা পাঠের আসর। ‘ভূমধ্যসাগর’, ‘একক মাত্রা’, ‘আখরপত্র’, ‘মত মতান্তর’, ‘অধিকার’, ‘নিবিড়’, ‘আঙ্গিক’, ‘জনস্বার্থ বার্তা’, ‘শ্রীময়ী’, ‘পথের সুজন’, ‘চৌরঙ্গী’-র মতো ১২৮টি লিটল ম্যাগাজিন অংশগ্রহণ করেছিল এবারের মেলায়। পাঠকের ভিড়ও ছিল দেখার মতো।